Follow us

সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান গুমের এক বছর

প্রাপ্তি রহমান
ঢাকা
2018-12-20
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান।
[সৌজন্যে: মারুফ জামানের পরিবার]

সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে। তাঁর সন্তানেরা বাবার খোঁজে সম্ভব সব জায়গায় গেছেন। জবাব খুঁজেছেন একটি প্রশ্নের, বাবা কেন গুম হলেন?

গত বছরের ৪ ডিসেম্বর মারুফ জামান গুম হন। সম্প্রতি মারুফ জামানের বেলজিয়ামে অবস্থানরত মেয়ে শবনম জামান ইমেইল বার্তায় কথা বলেছেন বেনারনিউজের সঙ্গে। তিনি বলেন, সরকারের নীরবতা-দেশের মানুষের নীরবতায় তিনি বিপন্ন বোধ করছেন।

ওই দিন কী ঘটেছিল তার একটি বর্ণনা দিয়েছেন শবনম। ৪ ডিসেম্বর বিকেলে মারুফ জামান তাঁর ধানমন্ডির বাসা থেকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ছোট মেয়ে সামিহা জামান বেলজিয়ামে তাঁর বড়বোন শবনম জামানের কাছে বেড়াতে গিয়েছিলেন। ওই দিন ছিল তাঁর ফেরার কথা।

শবনম বলেন, বাড়ি থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণ পরই বাসার ফোনে অপরিচিত একটা নম্বর থেকে ফোন আসে। গৃহকর্মী ফোনটি ধরতেই ওপাশ থেকে মারুফ জামানের গলা। তিনি জানান, কয়েকজন লোক তাঁদের বাসায় যাবেন। তাঁরা বাসার ইলেকট্রনিকস যন্ত্রপাতি নেবেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই একই রকম পোশাকের সুঠামদেহী তিন ব্যক্তি তাঁদের বাসায় ঢোকেন। তাঁরা ল্যাপটপ, ডেস্ক কম্পিউটার, বাসায় থাকা স্মার্টফোন ঝটপট গুছিয়ে নেন। বাসাও তল্লাশি করেন। বাসায় সিসি ক্যামেরা থাকলেও তাঁদের শনাক্ত করা যায়নি।

“অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকেরা যে মাস্ক পরেন, তাঁরাও তেমন মাস্ক পরেছিলেন। টুপি টানা ছিল নাক পর্যন্ত। তাই তাঁদের কাউকে চেনা যায়নি,” শবনম জামান বলেন।

পরিবারের পক্ষ থেকে ওইদিন রাতেই ধানমন্ডি থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। খোঁজা হয় সম্ভাব্য সব জায়গায়। যে গাড়িতে করে মেয়েকে আনতে গিয়েছিলেন তিনি সেটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়, ঢাকার ৩০০ ফিট এলাকায়।

মারুফ জামানের অপরাধ কী? তিনি কি রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কাজে যুক্ত ছিলেন? অপরাধ থাকলে তাঁকে আদালতে উপস্থাপন করা হোক এমন হাজারটা প্রশ্ন সে সময় সংবাদমাধ্যমগুলোয় উপস্থাপিত হয়। শবনম এক বছর পর আবারও সেসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।

শবনম জামান জানান, তাঁর বাবা কখনই রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন না। কাতার ও ভিয়েতনামে কর্মরত ছিলেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাঁকে ভিয়েতনাম থেকে প্রত্যাহার করা হয়। এরপর বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। এর বেশি তাঁরা আর কিছু জানেন না। বিপত্নীক মারুফ জামান ধানমন্ডির বাসায় তাঁর ভাইবোন ও মেয়ের সঙ্গে থাকতেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর ঘরের বাইরেও বেরোতেন না খুব একটা।

গুম হওয়ার পর সরকার ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর নিষ্ক্রিয়তায় শবনম অবাক।

“আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকার আমার বাবার সন্দেহজনকভাবে নিখোঁজ থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেনি, কারণ তারা বিষয়টি স্বীকারই করেনি,” শবনম বলেন। তিনি আরও বলেন, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যারই সামান্যতম প্রভাব রাখার ক্ষমতা আছে বলে ধারণা ছিল তার সঙ্গেই শবনম যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন। তাদের কারও কাছ থেকেই অর্থপূর্ণ সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।

তবে মারুফ জামানের এই গুম হয়ে থাকা প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সরব হয়েছে। শবনম জানান, গত ১৫ নভেম্বর ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে একটি যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ওই সিদ্ধান্তে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগের বিষয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানানো হয় কর্তৃপক্ষের কাছে। বলা হয়, যারা এসব ঘটনায় জড়িত, তাদের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বিচারের আওতায় আনতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আলাদাভাবে মারুফ জামানের বিষয়টি উত্থাপিত হয় ওখানে।

শবনম পুঙ্খানুপুঙ্খ ও পক্ষপাতহীন তদন্ত এবং দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি চান। তিনি চান, সংবাদমাধ্যম ও সুশীল সমাজ বিচারহীনতার এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হোক।

পুলিশ যা বলছে

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া ও জনসংযোগ) মাসুদুর রহমান বেনারকে বলেন, “কেউ নিখোঁজ হয়েছেন এমন খবর পেলে পুলিশ আন্তরিকভাবে খুঁজে দেখার চেষ্টা করে।” এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।

অন্যদিকে মারুফ জামানের পরিবারের সদস্যরা যে ধানমন্ডি থানায় নিখোঁজ জিডি করেছিলেন, সেই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল লতিফের কাছ থেকেও মিলেছে গৎবাঁধা উত্তর।

“পুলিশ ঘটনার পরপরই সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। কিন্তু মারুফ জামানের বাসায় যারা এসেছিলেন তাদের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। আমরা দেখছি,” আবদুল লতিফ বেনারনিউজকে বলেন।

অভিযোগের তির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক নূর খান লিটন বেনারকে বলেন, নারায়ণগঞ্জে সাতখুনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পৃক্ততা মানুষের মনে এই ধারণার জন্ম দেয় যে, তারাই হয়তো বা গুমের মতো ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে। তিনি বলছিলেন, গুমের শিকার সব মানুষের স্বজনদের ব্যথা একই। তবে মারুফ জামানের বিষয়টি আলাদাভাবে গুরুত্ববহ।

“মারুফ জামান সেনাবাহিনীতে ছিলেন, তিনি বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাঁর গুম হয়ে থাকার একটা সুদূরপ্রসারী প্রভাব আছে। গুরুত্বপূর্ণ মানুষ নিখোঁজ হয়ে থাকার মানে, যে কেউ গুমের শিকার হতে পারেন। এর মাধ্যমে ভীতি ছড়িয়ে দেওয়া সহজ হয়,” নূর খান বলেন।

রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে গুমের শিকার মানুষগুলোকে দ্রুত খুঁজে বের করা দরকার বলে মনে করেন তিনি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন