Follow us

রিজার্ভ পাচার ঘটনায় ব্যাংক কর্মকর্তার শাস্তিতে সন্তুষ্ট নয় বাংলাদেশ

ডেনিস জয় সানন্তোস ও কামরান রেজা চৌধুরী
দাভাও, ফিলিপাইন ও ঢাকা
2019-01-11
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ম্যানিলায় ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় সিনেট তদন্ত কমিটিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ পাচার সংক্রান্ত শুনানিতে রিজাল কমার্শিয়াল অ্যান্ড ব্যাংকিং করপোরেশনের সাবেক শাখা প্রধান মায়া সান্তোস দেগুইতো। ৫ এপ্রিল ২০১৬।
ম্যানিলায় ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় সিনেট তদন্ত কমিটিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ পাচার সংক্রান্ত শুনানিতে রিজাল কমার্শিয়াল অ্যান্ড ব্যাংকিং করপোরেশনের সাবেক শাখা প্রধান মায়া সান্তোস দেগুইতো। ৫ এপ্রিল ২০১৬।
[এপি]

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে সংরক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন বা আট কোটি দশ লাখ মার্কিন ডলার অর্থ পাচারের সাথে যুক্ত সবাইকে আইনের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ।

বৃহস্পতিবার এই অর্থ পাচার সংক্রান্ত মামলায় ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল অ্যান্ড ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) সাবেক শাখা প্রধান মায়া সান্তোস দেগুইতোর সাজা ঘোষণার পর ফিলিপাইনে বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত আসাদ আলম সিয়াম আনুষ্ঠানিকভাবে এই অনুরোধ জানিয়েছেন।

মায়াকে অর্থ পাচারের আটটি মামলার প্রতিটিতে আলাদাভাবে চার থেকে সাত বছরের সাজা দেওয়া হয়। এর ফলে তাঁর ৩২ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৫৬ বছর সাজা হতে পারে।

পাশাপাশি এক কোটি নয় লাখ মার্কিন ডলারের জরিমানাও করা হয় তাঁকে।

“ডিওজে এখন আরসিবিসির আরও ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অন্য একটি মামলা চালাচ্ছে। আমরা আশা করি এই মামলাটির তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ হবে,” বিবৃতিতে বলেন রাষ্ট্রদূত সিয়াম।

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের দশ কোটি দশ লাখ ডলার ফিলিপাইনে সরিয়ে নেওয়া হয়। এর মধ্যে আট কোটি দশ লাখ ডলার ফিলিপাইনের আরবিসি ব্যাংকে পাঠানো হয়। বাকি দুই কোটি ডলার যায় শ্রীলংকার একটি ব্যাংকে।

ওই অর্থের দেড় কোটি ডলার দেশটির একটি জুয়ার আসর পর্যন্ত পৌঁছে। পরে সংশ্লিষ্ট ক্যাসিনো মালিক ওই অর্থ দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেন। একই প্রক্রিয়ায় শ্রীলঙ্কার একটি এনজিওর নামে দুই কোটি ডলার জমা করার চেষ্টা হলেও ওই অ্যাকাউন্টে অর্থ পাচারের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আটকানো যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, সাইবার সিস্টেম হ্যাক করে চোরেরা নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে টাকা ছাড়ের জন্য ৩৫টি পে অর্ডার পাঠায়। তারা এ জন্য যে অতি গোপনীয় সুইফট কোডটি ব্যবহার করে সেটি শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করে থাকে।

অর্থ পাচারের প্রায় তিন সপ্তাহ পরে ফিলিপাইনের একটি দৈনিকে এ সম্পর্কিত প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি সবার নজরে আসে।

আন্তর্জাতিক তদন্ত

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশের এক পুলিশ কর্মকর্তা শুক্রবার বেনারকে বলেন, অর্থ পাচার সংক্রান্ত বাংলাদেশের তদন্তকারী দল ১১টি দেশের কাছে অনলাইনে টাকা খোয়া যাওয়ার বিষয়ে তথ্য চেয়েছে। এই ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি না তাও খতিয়ে দেখছেন তাঁরা।

তাছাড়া হ্যাকিং এ যে আইপি অ্যাড্রেস ব্যবহার হয়েছে সেটি মিশরের বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

“আমরা ইন্টারপোলের মাধ্যমে মিশরকে কয়েকবার এ নিয়ে চিঠি দিয়েছি। মিশর সরকার জানিয়েছে ঠিকানাটি একটি বাণিজ্যিক কম্পিউটারের। ওই কম্পিউটারটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় যথেষ্ট তথ্য আমাদের হাতে নেই,” বলেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা।

মামলার প্রস্তুতি

“আমরা আমাদের টাকা ফেরত আনার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি,” মন্তব্য করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সেরাজুল ইসলাম বেনারকে বলেন, রায় ঘোষণা ও সাজার মাধ্যমেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়েছে তা কিন্তু নয়।”

“আদালত আরবিসি ম্যানেজারকে শাস্তি দিয়েছে, শাস্তি বিষয়ে আমাদের কিছু বলার নেই। তবে কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়াই এক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়।”

বাংলাদেশ ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, “তারিখটা আমি বলতে পারব না, তবে ৫ ফেব্রুয়ারির আগেই মামলা দায়ের হওয়ার কথা রয়েছে।”

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দীন অর্থ পাচারের জন্য আরসিবিসিকে দায়ী করেছেন। তিনি অর্থ পাচার ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান।

তিনি বেনারকে বলেন, “ফিলিপাইনের আদালত আরসিবিসি ব্যবস্থাপককে কারাদণ্ড দিয়েছে এবং জরিমানা করেছে। এই ঘটনায় আরসিবিসির প্রধান নির্বাহী পদত্যাগ করেছেন। তাই বলা যায় এতে আরসিবিসির সম্পৃক্ততা জলের মতো পরিষ্কার।”

তিনি যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন সেটিতে আরসিবিসিকে দায়ী করেছেন বলে জানান ফরাসউদ্দীন।

“আমাদের উচিত আরসিবিসির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া,” যোগ করেন তিনি।

তিনি এই ঘটনার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকারও সমালোচনা করেন।

“ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকেরও ত্রুটি ছিল। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তবে তার চেয়ে ভালো হবে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সহযোগিতা নিয়ে যদি আমরা আরসিবিসির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারি,” ফরাশউদ্দীন বেনারনিউজকে বলেন।

এদিকে পুরো ঘটনাটিতে দেগুইতোকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে মন্তব্য করে রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী দেমেত্রিয় কাস্তোদিও।

“তাঁর একার পক্ষে এই কাজটি করা সম্ভব নয়,” জানিয়ে কাস্তোদিও বলেন, “আমরা মনে করি, এ ঘটনায় আরও অনেকে সম্পৃক্ত আছে।”

তিনি আরও জানান তাঁর মক্কেল আপিল করবেন এবং আপিল শুনানি না হওয়া পর্যন্ত দেগুইতোকে কারাগারে যেতে হবে না।

অন্যদিকে আরসিবিসির মুখপাত্র থিয়া দ্যায়েপ বলেছেন, রায় এটাই প্রমাণ করল যে ব্যাংক এই কাজে জড়িত ছিল না।

“এক্ষেত্রে ব্যাংক নিজেই ঘটনার শিকার এবং মিজ দেগুইতো একজন অবাধ্য কর্মকর্তা,” এক বিবৃতিতে বলেন দায়েপ।

প্রতিবেদন তৈরিতে ফিলিপাইনের কোটাবাটো সিটি থেকে সহায়তা করেছেন জিওফ্রে মাইতেম।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন