Follow us

এবার বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে আরসিবিসি’র মানহানি মামলা!

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-03-12
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ম্যানিলায় ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় সিনেট তদন্ত কমিটিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ পাচার সংক্রান্ত শুনানির সময় রিজাল কমার্শিয়াল অ্যান্ড ব্যাংকিং করপোরেশনের সাবেক শাখা প্রধান মায়া সান্তোস দেগুইতো। ১৯ এপ্রিল ২০১৬।
ম্যানিলায় ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় সিনেট তদন্ত কমিটিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ পাচার সংক্রান্ত শুনানির সময় রিজাল কমার্শিয়াল অ্যান্ড ব্যাংকিং করপোরেশনের সাবেক শাখা প্রধান মায়া সান্তোস দেগুইতো। ১৯ এপ্রিল ২০১৬।
[এপি]

হ্যাকারদের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশের রাজকোষ চুরির ঘটনায় এবার আক্রান্ত দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিরুদ্ধেই মানহানি মামলা করেছে ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি)।

ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় অবস্থানকারী বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিদলকে মঙ্গলবার এ তথ্য দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

বেনারকে তিনি বলেন, “আমরা আরসিবিসির বিরুদ্ধে নিউ ইয়র্কের আদালতে মামলা করেছি। তাতে সংক্ষুদ্ধ হয়ে তারা আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করতেই পারে।”

তিন বছর আগের ওই চুরির ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ ব্যাংক গত পহেলা ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্কের আদালতে আরসিবির বিরুদ্ধে মামলা করে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে নিজেদের দেশের একটি আদালতে ৬ মার্চ এই পাল্টা মামলা করে আরসিবিসি।

“আমাদের প্রতিনিধিদলটি এখনো ম্যানিলায় রয়েছে। তারা ফিরলে আমরা বিস্তারিত জানাব,” বলেন সিরাজুল। তিনি জানান, প্রতিনিধিরা আরসিবিসি ও ফিলিপাইনের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের সাথে খোয়া যাওয়া অর্থ আদায় সম্পর্কে সভা করেছেন।

চুরি যাওয়া অর্থ ‘আলোচনার মাধ্যমে’ উদ্ধারের আশায় শনিবার ফিলিপাইন যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্ণর ও বাংলাদেশ ফাইন্যানশিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসানের নেতৃত্বাধীন ওই প্রতিনিধিদল।

আরসিবিসির অভিযোগ

ফিলিপাইনের আদালতে মানহানি মামলার আবেদনে আরসিবিসি বলেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের সুনাম ‘ক্ষুণ্ণ করে ও হয়রানির মাধ্যমে’ অর্থ আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছে। এর আগে চুরি যাওয়া ৮১ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে হদিস না থাকা ৬৫ মিলিয়ন ডলার উদ্ধারের জন্য মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আরসিবিসি এক বিবৃতিতে বলেছে, “আরসিবিসির সুনাম, ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন করার কৌশল স্বরূপ হয়রানি ও হুমকির মাধ্যমে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যে অর্থ আরসিবিসির কাছে নেই বা বাংলাদেশ ব্যাংক আরসিবিসির কাছে পাবে না।”

তবে রাজকোষ চুরির ঘটনায় গঠন করা বাংলাদেশ সরকারের তদন্ত কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ বেনারকে বলেন, “আমাদের তদন্তে আমরা দেখেছি আরসিবিসি জড়িত, তাদের দোষ আছে। তারা দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না।”

তদন্ত কমিটির প্রধান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনও বেনারকে বলেন, “ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই অর্থ চুরির কারণে আরসিবিসি-কে জরিমানা করেছে। তারা যদি জড়িত না থাকে তাহলে জরিমানা হলো কেন?”

“ব্যাংকটির শাখা ব্যবস্থাপককেও ইতোমধ্যে আদালত জেল-জরিমানা করেছে। সুতরাং আরসিবিসি কোনোভাবে তার ভূমিকা অস্বীকার করতে পারে না,” বলেন তিনি।

যা ভাবছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “আমরা যেহেতু আন্তর্জাতিকভাবে মামলা করেছি সেহেতু সেটা আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ায় শেষ হবে।”

ব্যাংকের অপর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারকে জানান, অর্থ আদায়ের ব্যাপারে আরসিবিসি কর্মকর্তাদের সাথে আমাদের বৈঠক খুব ফলপ্রসু হয়নি। নিউ ইয়র্ক আদালতে মামলা করায় তারা খুব অখুশি।

“সুতরাং, আমার মনে হয় না আলোচনার মাধ্যমে আমরা আরসিবিসি’র কাছ থেকে অর্থ আদায় করতে পারব,” বলেন তিনি।

এই কর্মকর্তা মনে করেন, “মানহানি মামলা করা তাদের একটি কৌশল। যেহেতু বাংলাদেশ ব্যাংক মামলা করেছে সেহেতু তারা পাল্টা মামলা করে নিজেদের রক্ষা করতে চাইছে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের অনলাইন ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে সুইফট কোড ব্যবস্থাকে অপব্যবহার করে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভুয়া আদেশ প্রেরণের মাধ্যমে হ্যাকাররা ১০১ মিলিয়ন ডলার চুরি করে নেয়।

যখন ওই অর্থ প্রদান আদেশ দেয়া হয় তখন বাংলাদেশ ব্যাংক বন্ধ ছিল।

কেন দায়ী আরবিসি?

লুট করা ১০১ ডলারের মধ্যে ২০ মিলিয়র ডলার পাঠানো হয় শ্রীলঙ্কার একটি বেসরকারি সংস্থাকে। আর বাকি ৮১ মিলিয়ন পাঠানো হয় ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের (আরসিবিসি) চারটি ভুয়া হিসাবে।

ওই হিসাবগুলো অর্থ চুরি হওয়ার কয়েকমাস আগে খোলা হয় এবং এগুলোতে চুরি করে পাঠানো ডলার ছাড়া আর কোনো লেনদেন হয়নি বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও ফেড রিজার্ভের পক্ষ থেকে ওই অর্থ পরিশোধ না করার আদেশ পাঠানোর পরও ব্যাংক ব্যবস্থাপক মায়া দেগুইতো টাকাগুলো দ্রুত দিয়ে দেন।

বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে ফিলিপাইন সরকার তৎপর হয় এবং তাদের তৎপরতার ফলে মোট ১৫ মিলিয়ন ডলার ফেরত আসে। কিন্তু বাকি ডলারের কোনো হদিস নেই।

চুরি যাওয়া অর্থ দিয়ে দেয়ায় শাখা ব্যবস্থাপককে জেল জরিমানা করেছে ফিলিপাইনের একটি আদালত। একইসাথে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরসিবিসি কর্তৃপক্ষকে জরিমানা করেছে।

অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায় পাঠানো ২০ মিলিয়ন ডলারও বাংলাদেশ ব্যাংককে ফেরত দিয়েছে সেদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ম্যানিলা থেকে কার্ল রোমানো।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন