Follow us

আলোচিত একরামুল হত্যা মামলায় ৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2018-03-13
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
একরামুল হত্যা মামলার আসামিদের কড়া নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করা হয়। ১৩ মার্চ ২০১৮।
একরামুল হত্যা মামলার আসামিদের কড়া নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করা হয়। ১৩ মার্চ ২০১৮।
নিউজরুম ফটো

দেশব্যাপী আলোচিত ফেনীর ফুলগাজীর উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হককে হত্যা মামলায় ৩৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে বাংলাদেশের একটি আদালত। এ রায়ে খালাস পেয়েছেন বিএনপি নেতা মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী ওরফে মিনার চৌধুরীসহ ১৬ জন।

মঙ্গলবার ফেনীর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক আমিনুল হক এ রায় ঘোষণা করেন। দণ্ডপ্রাপ্তরা ফেনী আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। নিহত একরামুল হকও ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি ছিলেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, “রাজনৈতিক কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, পেশি শক্তির জোরে এই ঘটনা ঘটেছে। যা অনভিপ্রেত।”

“২০১৪ সালে এই বিভৎস হত্যাকাণ্ডটি সারা দেশের মানুষকে হতবাক করেছিল। আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল ফেনীর মানুষের মধ্যে। এই ধরনের ঘটনা যাতে দেশে পুনরাবৃত্তি না ঘটে,” বলেন বিচারক।

আইনজীবীরা বলছেন, কোনো একটি মামলায় একসঙ্গে এত আসামির ফাঁসির রায় এটাই প্রথম।

“শুধু ফেনী কোর্টে নয়, একক কোনো হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশের এটা রেকর্ড,” বেনারকে বলেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) হাফেজ আহম্মদ।

এ প্রসঙ্গে মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সালমা আলী বেনারকে বলেন, “সারা বিশ্বে যখন মৃত্যুদণ্ড কমে আসছে তখন আমাদের দেশে একক কোনো হত্যাকাণ্ডে ৩৯ কে ফাঁসির রায় দেওয়ার ঘটনায় বিস্মিত হচ্ছি। একক কোনো হত্যাকাণ্ডে এতজন সরাসরি জড়িত থাকতে পারে কিনা প্রশ্ন থেকেই যায়।”

“তবে উচ্চ আদালেতে আশা করি অপরাধ অনুযায়ী শাস্তিটা হবে,” বলেন তিনি।

এর আগে ২০০৪ সালে নাটোরে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের ভূমি উপমন্ত্রী রুহুল কদ্দুস তালুকদার দুলুর ভাতিজা গামা হত্যা মামলায় ২০০৬ সালে ২১ জনের ফাঁসির আদেশ দেয় ঢাকার দ্রুত বিচার আদালত।

পিপি হাফেজ আহম্মদ বলেন, “একরামুল হত্যায় দণ্ডাদেশ পাওয়া আসামিদের মধ্যে শুরু থেকেই ১০ জন পলাতক, ৯ জন জামিনে গিয়ে পালিয়ে যায়। এদের মধ্যে সোহেল নামের একজন র‌্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হয়।”

বাকি আসামিদের রায়ের আগে কড়া নিরাপত্তায় আদালতে উপস্থিত করা হয়। আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালতপাড়াসহ ফেনী শহরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।

নিহত একরামুল হকের ফাইল ছবি।
নিহত একরামুল হকের ফাইল ছবি। নিউজরুম ফটো
২০১৪ সালের ২০ মে ফেনীর বিলাসী সিনেমা হলের সামনে ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি একরামুল হককে প্রকাশ্যে গুলি করে, কুপিয়ে ও গাড়িসহ পুড়িয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

ওই হত্যার ঘটনায় বিএনপি নেতা মাহাতাব উদ্দিনসহ অজ্ঞাত আরও ৩০-৩৫ জনকে আসামি করে ফেনী মডেল থানায় মামলা করেন একরামুলের ভাই রেজাউল হক জসিম। পরে পুলিশ দুই দফায় অভিযোগপত্র দিলেও আদালত তা গ্রহণ করেনি। ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল তৃতীয়বার সম্পূরক অভিযোগপত্র দেন তৎকালীন ফেনীর গোয়েন্দা পুলিশ পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ।

২০১৬ সালের ১৫ মার্চ, হত্যার প্রায় দুই বছর পর ৫৬ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে এই মামলার বিচার করে আদালত। বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীদের হাতে আটক আসামিদের মধ্যে ১৫ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দেন। রাজ সাক্ষী দেন মো. হেলাল নামের এক আসামি।

চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি এ মামলার যুক্তিতর্ক শুরু হয়। ৫৯ সাক্ষীর মধ্যে ৫০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেন আদালত।

“সমস্ত সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত একরামুল হত্যার দায়ে ৩৯ জনকে ফাঁসির আদেশ, প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা এবং ১৬ জনকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন,” বলেন পিপি হাফেজ আহম্মদ।

এই রায়ে ন্যায় বিচার নিশ্চিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রায় ঘোষণার সময় আদালত প্রাঙ্গণে নিহত একরামুলের কোনো স্বজনই উপস্থিত ছিলেন না। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাঁর বড়ভাই মোজাম্মেল হক রায়ে মোটামুটি সন্তুষ্টের কথা জানান। পাশাপাশি উচ্চ আদালতেও যেন এই সাজা বহাল থাকে সে দাবিও করেন তিনি।

তবে ন্যায় বিচার না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছে আসামিপক্ষ।

“আমারা ন্যায় বিচার পাইনি, আমরা সংক্ষুব্ধ। আসামিদের বিষয়ে কোনো সাক্ষীই সমর্থন দেয়নি। প্রত্যেক আসামি খালাস পাওয়ার যোগ্য,” বেনারকে বলেন দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামিপক্ষের এক আইনজীবী আহসান কবির বেঙ্গল।

তিনি বলেন, “এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদলতে আপিল করব। সেখানে তাঁরা ন্যায় বিচার পাবেন আশা করি।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন