Follow us

ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগে এবার বাউল গানের আসর বন্ধ

শাহরিয়ার শরীফ
ঢাকা থেকে
2016-12-14
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় লালন উৎসবে সঙ্গীত পরিবেশন করেন বাউল শিল্পীরা। মার্চ ১৭, ২০১৬।
কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় লালন উৎসবে সঙ্গীত পরিবেশন করেন বাউল শিল্পীরা। মার্চ ১৭, ২০১৬।
স্টার মেইল

নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার চিথোলিয়া গ্রামে ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগ তুলে লালন শাহ স্মরণে আয়োজিত একটি গানের আসর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় একটি মহলের আপত্তি এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসন এই সিদ্ধান্ত নেয়।

ঘটনার দুই সপ্তাহ পরও ওই এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। সেখানে ১৬৫ জন লালন অনুসারীকে ‘মুরতাদ’ আখ‌্যায়িত করে প্রচারপত্র (লিফলেট) বিলি করা হয়েছে।

‘হেফাজতে ঈমান’ নামে একটি সংগঠন ওই লিফলেট বিলি করার পর আতঙ্কে রয়েছেন লালন অনুসারীরা। সরকার–সমর্থিত ওলামা লীগের কিছু নেতা–কর্মী হেফাজতে ইমান নামে ওই সংগঠনের সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে এর আগেও বাউল ও লালনভক্তদের ওপর জঙ্গি ও উগ্রপন্থিদের হামলা ও হুমকির ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের ডিসেম্বরে চুয়াডাঙ্গায় বাউল উৎসবের এক আয়োজককে হত‌্যা করে জঙ্গিরা। আর চলতি বছর জুলাই মাসে চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে এক বাউল আস্তানায় হামলা চালিয়ে তিন ভক্তকে পিটিয়ে জখম করা হয়।

গতকাল মঙ্গলবার বিকালে কেন্দুয়া উপজেলা প্রেসক্লাব মিলনায়তনে বাউল ভক্তদের সংগঠন তরিকতে আহলে বাইত বাংলাদেশের কেন্দুয়া উপজেলা শাখা সংবাদ সম্মেলন করে আতঙ্কের কথা জানায়।

সংগঠনের উপজেলা শাখার সভাপতি আব্দুল লতিফ আকন্দ এসময় বলেন, গত ৩০ নভেম্বর উপজেলার চিথোলিয়া গ্রামের আব্দুল হালিমের বাড়িতে লালন শাহ স্মরণে গানের আসর বসার কথা ছিল। কিন্তু একটি মহল ধর্মীয় ও সামাজিক বিধিনিষেধের কথা বলে অনুষ্ঠানটি বানচাল করে দিয়েছে।

“এরপর মিথ্যা অভিযোগ এনে উপজেলার লালন অনুসারীদের মুরতাদ ঘোষণা করে ঈমান হেফাজতের নামে এলাকায় লিফলেট ছড়ানো হয়েছে,” জানান আব্দুল লতিফ।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, উপজেলার চিরাংবাজারে লালন অনুসারী নূর আলমের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ১৩ দিন ধরে বন্ধ রাখতে বাধ্য করাসহ তালিকায় নাম আসা সবাইকে বিভিন্নভাবে হুমকি ধমকি দেওয়া হচ্ছে।

সকালে ওই সংবাদ সম্মেলনের পর বিকেলে পুলিশের মধ্যস্থতায় স্বর্ণের দোকানটি খুলে দেওয়া হয়। রাতে যোগাযোগ করা হলে একাধিক বাউল অনুসারী বেনারকে জানান, নতুন কোনও ঝামেলা হয়নি।

তাঁরা জানান, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে তরিকতে আহলে বাইয়িনাত নামে একটি সংগঠন বাউল অনুষ্ঠান আয়োজন করে আসছে। এবারও ৩০ নভেম্বর থেকে তিনদিনব্যাপি ওই অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল।

“আমার বাড়িতে আলোচনা ও বাউল সঙ্গীত আয়োজন করা হয়েছিল। কিছু লোক পুলিশ ও প্রশাসনের ​কাছে আমাদের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগ করে। প্রশাসনের নির্দেশে ও সামগ্রিক পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে আমরা অনুষ্ঠান বন্ধ করেছি,” বেনারকে জানান আব্দুল হালিম, যিনি তরিকতে আহলে বাইয়িনাতের কেন্দুয়া শাখা কমিটির সম্পাদক।

ওই লালনভক্ত বলেন, অনুষ্ঠান বন্ধ করার পরও একটি মহল অপতৎ​পরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রকাশিত লিফলেটে লালন অনুসারীদের ‘কাফের ও মুরতাদ’ আখ‌্যায়িত করে তাদের ‘জমিন থেকে উৎখাতের’ জন‌্য ‘তৌহিদী জনতার’ প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

ওই লিফলেটের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সিরাজুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “লালন অনুসারীরা বিষয়টি আগে জানায়নি। এখন বিষয়টি জানার পর পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে।”

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় বাউল গানের অনুষ্ঠানটি স্থগিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

কেন্দুয়া উপজেলা ওলামা লীগের সভাপতি এবং স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ বেনারকে বলেন, লালন বা বাউল গান নিয়ে এলাকার মানুষের কোনও আপত্তি নেই। লালন মানবতার জন্য কাজ করেছেন, এ জন্য সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করে। কিন্তু বাউল উৎ​সবের আড়ালে সেখানে ‘জয়গুরু পীর সাহেব’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তিকে বক্তা হিসেবে আনার পরিকল্পনা করা হয়।

ওই শিক্ষক জানান, লালন গানের আড়ালে সেখানে নামাজ, রোজা ও কোরআন শরীফকে অবমাননা করার আভাস পায় এলাকাবাসী। বিশেষ করে জয়গুরু পীর ওই এলাকায় এসে বক্তৃতা করবেন, এটা এলাকার মানুষ ভালোভাবে নেননি।

আবুল কালাম বলেন, সাধারণত একে অপরের সঙ্গে দেখা হলে সালাম ও কুশল বিনিময় হয়। কিন্তু সেখানকার লালনভক্তরা, একে অপরকে ‘জয়গুরু’ বলে। এটা নিয়েও মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আছে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন