এবার অপরিশোধিত তেল বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া

কামরান রেজা চৌধুরী
2022.05.24
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
এবার অপরিশোধিত তেল বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া ট্রেনের ওয়েল টেঙ্কারে করে আমদানি করা জ্বালানি তেল চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আনা হচ্ছে। ১২ জানুয়ারি ২০২২।
[বেনারনিউজ]

বাংলাদেশের কাছে রাশিয়া এবার অপরিশোধিত তেল বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে বলে সোমবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু পরপরই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পদ্মা অয়েলের কাছে লুব্রিকেটিং অয়েল বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিল রাশিয়ার লুকঅয়েল। এবার অপরিশোধিত তেল বিক্রির প্রস্তাব আসলো দেশটির কাছ থেকে।

সোমবার বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত ‘বিদ্যুৎ খাতে সাইবার নিরাপত্তা-নীতি এবং অপারেশনাল দৃষ্টিকোণ’ শীর্ষক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী রাশিয়ার এই প্রস্তাবের কথা জানান।

তিনি বলেন, কীভাবে রাশিয়া থেকে তেল বাংলাদেশে আনা হবে সে বিষয়টি পর্যালোচনা করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান এবিএম আজাদ সোমবার রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল বিক্রির প্রস্তাবের বিষয়টি বেনারের কাছে নিশ্চিত করেছেন।

“রাশিয়ার পক্ষ থেকে বাংলাদেশে অপরিশোধিত তেল বিক্রির প্রস্তাবটির ভালো-মন্দ পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে কিছু সময় লাগবে,” জানান এ বি এম আজাদ।

তিনি বলেন, “আমরা রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল ক্রয় করি না। বাংলাদেশ মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ক্র‍ুড অয়েল ক্রয় করে থাকে।”

এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ঢাকাস্থ রাশিয়া দূতাবাসে নানাভাবে চেষ্টা করা হয়। বেশ কয়েকবার টেলিফোন করা হলেও কেউ ফোন রিসিভ করেননি। সোমবার ই-মেইল পাঠানো হলেও মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

আইন অনুযায়ী, দেশের জন্য বাৎসরিক অপরিশোধিত তেল আমদানি করে থাকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন। এই অপরিশোধিত তেল দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি শোধনাগারে পরিশোধন করা হয়। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০২১-২২ অর্থবছরে ১২ লাখ মেট্রিকটন অপরিশোধিত তেল ও ৪০ লাখ মেট্রিকটন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছে।

রাশিয়ার লুকঅয়েলের প্রস্তাব

পদ্মা অয়েলের মহাপরিচালক (বিপণন) নুমান আহমেদ তাপাদার সোমবার বেনারকে বলেন, “রাশিয়ার লুকঅয়েলের পক্ষ থেকে পদ্মা অয়েলের কাছে লুব্রিকেটিং অয়েল বিক্রির যে প্রস্তাব এসেছে, সেটির সক্রিয় বিবেচনা করা হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “আমরা রাশিয়ার লুকঅয়েল থেকে লুব্রিকেটিং অয়েল কিনতে পারি কি না, সে বিষয়ে মতামতের জন্য বিশেষজ্ঞ আইনজীবীদের কাছ থেকে আইনি মতামত নেওয়া হয়েছে। আইনি মতামতে বলা হয়েছে, লুকঅয়েলের কাছ থেকে লুব্রিকেটিং অয়েল কেনার বিষয়ে আইনি বাধা নেই।”

নুমান তপাদার বলেন, “লুকঅয়েলের স্থানীয় প্রতিনিধিদের সাথে সভা করে শীঘ্রই লুব্রিকেটিং অয়েল কেনার বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

তিনি বলেন, “পদ্মা অয়েলের বোর্ড যদি চুক্তির খসড়া অনুমোদন করে তাহলে চুক্তি স্বাক্ষরের তারিখ নির্ধারণ করা হবে। চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য লুকঅয়েলের কর্মকর্তারা বাংলাদেশ সফর করবেন।”

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাণ্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সাবেক চেয়ারম্যান মুন্সি ফায়েজ আহমেদ সোমবার বেনারকে বলেন, পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে আমেরিকা ও ব্রিটেন জানিয়েছে, তারা রাশিয়ার তেল-গ্যাস ক্রয় করবে না। তবে তাদের অবরোধের কারণে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশগুলোর জন্য রাশিয়ার তেল-গ্যাস কেনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাধা নেই।

রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফায়েজ বলেন, “ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে বর্তমানে রাশিয়া স্বল্পমূল্যে বাংলাদেশের কাছে তেল বিক্রি করবে। আমরা সেই সুযোগ নিতে পারি।”

“তবে বাংলাদেশের উচিত হবে, রাশিয়া যেন এই তেল বাংলাদেশের বন্দরে পৌঁছে দেয়। অন্যথায় আমাদের জাহাজ পথিমধ্যে সমস্যায় পড়তে পারে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের একটি জাহাজ ইউক্রেনের বন্দরে আক্রমণের শিকার হয়েছে।”

মুন্সি ফায়েজ বলেন, “তবে আমি মনে করি না যে রাশিয়ার তেল কেনার কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কে সমস্যা সৃষ্টি হবে।”

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন সোমবার বেনারকে বলেন, “রাশিয়া থেকে তেল কেনার প্রস্তাবের দুটি দিক রয়েছে। প্রথমটি হলো, ইউরোপীয় দেশগুলো কিন্তু রাশিয়া থেকে তেল-গ্যাস কেনা অব্যাহত রেখেছে। সুতরাং, যেখানে ইউরোপীয় দেশগুলো তেল-গ্যাস কিনছে, সেখানে আমরা কিনতে পারবো না কেন?”

তিনি বলেন, “তবে, আরেকটি দিক হলো ইউরোপীয় দেশগুলো তেল-গ্যাস কিনলেও তারা জানিয়েছে, ২০২৯ সালের মধ্যে রাশিয়া থেকে তেল-গ্যাস কেনা বন্ধ করে দেবে। অর্থাৎ তাদের নীতি হলো, রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা।”

তৌহিদ হোসেন বলেন, “অন্যদিকে আমরা রাশিয়া থেকে কখনও তেল-গ্যাস ক্রয় করি না। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আমরা রাশিয়ার তেল-গ্যাসের বাজারে প্রবেশ করছি। ইউরোপ বের হয়ে যাচ্ছে, আর আমরা রাশিয়ার বাজারে প্রবেশ করছি।”

তিনি বলেন, “রাশিয়া থেকে চীন ও ভারত তেল-গ্যাস কিনছে। তারা আগে থেকেই কেনে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর তারা বেশি করে তেল-গ্যাস কেনার ঘোষণা দিয়েছে। বৈশ্বিক রাজনীতির অবস্থানের কারণে ভারতকে পশ্চিমাদের যতোটা প্রয়োজন, আমাদের ততোটা প্রয়োজন হয়তো নেই। আবার আমাদের পুরো ব্যবস্থা ভারতের মতো নয়।”
তৌহিদ হোসেন বলেন, “২০২৯ সালের পর ইউরোপ গ্যাস কেনা বন্ধ করে দিলে রাশিয়া যে আন্তর্জাতিক বাজার হারাবে সেই বাজারকে রক্ষা করতেই রাশিয়া সরকার বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে তেল-গ্যাস বিক্রির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।”

তিনি বলেন, “পশ্চিমারা চাচ্ছে রাশিয়ার তেল-গ্যাসের বাজার নষ্ট হোক। আর আমরা যদি রাশিয়ার নতুন বাজার হিসাবে আবির্ভূত হই, তাহলে পশ্চিমা দেশগুলো আমাদের ওপর নাখোশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন