Follow us

বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি সরকারের শীর্ষ মহলে

ঢাকা থেকে প্রাপ্তি রহমান
2017-02-13
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণাধীন পদ্মাসেতু। জানুয়ারি ২০১৭।
নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণাধীন পদ্মাসেতু। জানুয়ারি ২০১৭।
নিউজরুম ফটো

কানাডার আদালত পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতর অভিযোগ নাকচ করে দেবার পর এখন সরকারের শীর্ষমহল থেকে দাবি উঠেছে বিশ্বব্যাংক ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার।

প্রায় অর্ধযুগ আগে পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে পদত্যাগ করেন যোগাযোগ মন্ত্রী আবুল হোসেন, করারুদ্ধ হন সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন এবং তিন প্রকৌশলী। তারপরও সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে বিশ্বব্যাংক এবং অন্য দাতারা অর্থায়ন প্রত্যাহার করে নেয়।

দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে সরকার নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি চালিয়ে গেলেও কানাডায় চলছিল দুর্নীতি ষড়যন্ত্রের বিচার। গত শুক্রবার কানাডার আদালত এই বিচারের রায় ঘোষণা করে।

কানাডার আদালতে রায়ের পরপরই দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে পদত্যাগ করা সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন এক বিবৃতিতে বিশ্বব্যাংক ও দেশীয় একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাঁর সম্মান ক্ষুণ্ন করেছে অভিযোগ করে এর বিচার দাবি করেন।

গত রোববার জাতীয় সংসদেও বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। আলোচনার প্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

অন্যদিকে সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দুর্নীতির অভিযোগের বিরুদ্ধে দৃঢ়তা প্রদর্শন এবং নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অভিনন্দন জানান মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা।

বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, দুর্নীতি হয়নি এটি প্রমাণ হওয়ায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে।

“যথাসময়ে পদ্মা সেতু নির্মিত হলে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি আরও ১ দশমিক ২ শতাংশ অর্জিত হতো। এর ফলে জিডিপি হতো ৮ শতাংশ। সেতু নির্মাণে বিলম্বের কারণে দেশ এই অগ্রগতি থেকে বঞ্চিত হয়েছে,” সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান শফিউল আলম।

বিশ্বব্যাংকের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি

দুর্নীতি বিরোধী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ (টিআইবি) শুরু থেকেই পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ সুষ্ঠু তদন্তের দাবি করে আসছিল। গত রোববার জাতীয় সংসদে টিআইবির ভূমিকারও সমালোচনা করা হয়।

“দেখুন, আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। আমরা জানতে চাই বিশ্বব্যাংক কোন যুক্তিতে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে প্রকল্প থেকে সরে গেলো,” বেনারকে জানান টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি আরও বলেন, যে কোনো অভিযোগই টিআইবি খতিয়ে দেখতে বলে। টিআইবির মূল সুরটি সমালোচনাকারীরা হয়ত ধরতে পারছেন না।

“এভাবে বিশ্বব্যাংককে ছাড় দেওয়া ঠিক হবে না। আমাদের আন্তর্জাতিক আদালতে যেতে হবে। এক, আমাদের সম্মানহানি হয়েছে। দুই, প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হয়ে যাওয়ায় খরচ বেড়েছে। ক্ষতিপূরণ আদায় করা দরকার,” সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না বেনারকে বলেন।

সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বেনারকে বলেন, “বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে সাধ্যমতো সব চেষ্টা করা উচিত। তবে এটা চাওয়া হবে কিনা, সেটি সরকারের সিদ্ধান্তের ব্যাপার।”

বিশ্বব্যাংকের বক্তব্য

এদিকে বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগের পর ব্যাংকের অন্যতম পরিচালক কিমিআও ফ্যান বিবৃতি দিয়েছেন।

“বিশ্বব্যাংক যেসব প্রকল্পে অর্থায়ন করে থাকে, সেখানে জালিয়াতি ও দুর্নীতির যে কোনো অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হয়। বিশ্বব্যাংক তদন্ত করে যেসব তথ্য পায় সেগুলো সরকারকে জানায়। আইনের ব্যত্যয় ঘটেছে কি না সে সম্পর্কেও অবহিত করে,” বিবৃতিতে জানান কিমিআও।

যেসব অভিযোগ উঠেছিল

২০১১ সালের পর থেকে আলোচনায় ছিল দেশের দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ সৃষ্টি করা পদ্মা সেতু নির্মাণের এই মেগা প্রকল্পটি। মোট ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার আয়তনের পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকসহ কয়েকটি দাতা সংস্থা ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউএস ডলার ঋণ সহায়তা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হচ্ছে মর্মে অভিযোগ ওঠার পর ২০১২ সালের জুন মাসে ঋণ সুবিধা প্রত্যাহার করে নেয় বিশ্বব্যাংক। এরপর সরে যায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ অন্য দাতারাও।

বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ ছিল, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএনসি লাভালিন ও সেতু প্রকল্পে যুক্ত সরকারের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের মধ্যে ঘুষ লেনদেনের কথা বার্তা হয়েছে।

এসএনসি লাভালিন পদ্মা সেতু প্রকল্পে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ তত্ত্বাবধানের জন্য দরপত্রে অংশ নিয়েছিল। দুর্নীতির ষড়যন্ত্রে অভিযুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছিল এসএনসি লাভালিনের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়েরে দুরহেইম, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মহাব্যবস্থাপক কেভিন ওয়ালেস, ইন্টারন্যাশনাল প্রজেক্ট ডিভিশনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রমেশ শাহ, ইন্টারন্যাশনাল প্রজেক্ট ডিভিশনের পরিচালক মো. ইসমাইল ও কর্মকর্তা জুলফিকারের বিরুদ্ধে।

অভিযুক্তদের মধ্যে পিয়েরে দুরহেইম পদ্মা সেতু প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার আগেই ২০১২ সালের মার্চে পদত্যাগ করেন।

অভিযোগে বলা হয়, ২০১১ সালের শুরুর দিকে মো. ইসমাইল ও কেভিন ওয়ালেস বাংলাদেশে আসেন। তাঁরা সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁরা দুজনেই প্রতিদিনের খবর রমেশ শাহকে জানাতেন।

গত শুক্রবার দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ থেকে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএনসি লাভালিনের কর্মকর্তারা দায় মুক্তি পান।

উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ চলছে। এই প্রকল্পের পেছনে খরচ হবে ২৮ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা (তিন দশমিক ৬৯২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। ২০১৮ সালে সেতুটি খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন