Follow us

নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু আইনের সংশোধন চায় পুলিশ

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2018-01-10
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার পান্থপথে রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের ওপর পুলিশের হামলা। ১৩ মার্চ ২০০৬।
ঢাকার পান্থপথে রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের ওপর পুলিশের হামলা। ১৩ মার্চ ২০০৬।
মনিরুল আলম/বেনারনিউজ

‘মিথ্যা মামলা ও হয়রানি’ থেকে বাঁচতে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। আইনটি পুলিশি দায়িত্ব পালনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে বলে দাবি তাঁদের।

গত ৮ জানুয়ারি ঢাকায় শুরু হওয়া পুলিশ সপ্তাহে গত তিন দিন ধরে পুলিশের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা মন্ত্রী ও পদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে আইনটির সমস্যা চিহ্নিত করে এমন দাবি জানান।

“চলমান পুলিশ সপ্তাহে আমাদের সিনিয়র-জুনিয়র অনেকেই নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন সংশোধনের দাবি করেছেন। এই আইনের কারণে আমরা অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করতে পারি না,” বেনারকে বলেন পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী পুলিশ (মিডিয়া) পরিদর্শক সোহেলি ফেরদৌস।

তবে পুলিশের এই দাবির বিরোধিতা করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা। তাঁরা বলছেন, আইনটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা সংগঠিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর দায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার একটি সুযোগ সৃষ্টি করে।

২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে আওয়ামী লীগ সরকারের সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী প্রস্তাবিত নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনটি পাশ হয়।

এই আইন অনুযায়ী, কোনো ভিকটিম আদালতে পুলিশের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করতে পারে। আদালত মনে করলে ওই অভিযোগের সত্যতা নিরূপণ করতে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ পর্যন্ত দিতে পারেন।

এ ছাড়া হেফাজতে মৃত্যুর দায়ে দোষী প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে, আবার কোনো ব্যক্তিকে নির্যাতনের জন্য পাঁচ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।

এই আইন পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, সিআইডি, এসবি, গোয়েন্দা শাখা, আনসার-ভিডিপি ও কোস্টগার্ডসহ সকল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হবে।

দায়িত্ব পালনের অসুবিধা সম্পর্কে সোহেলী ফেরদৌস বলেন, “ধরুন, একজন মাদকসেবী যদি গ্রেপ্তারের পর অসুস্থ হয়ে থানায় মারা গেলো, আর এর দায়ে আমাকে শাস্তি দেওয়া হয় তাহলে কি বিচার হবে?”

মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবাদ

আইন ও সালিশ কেন্দ্র এক বিবৃতিতে বলেছে, প্রতিটি মানুষের জীবনের অধিকার আছে এবং যে কোনো ধরনের নিষ্ঠুর, অমানবিক অথবা অমর্যাদাকর আচরণ ও বিচারবহির্ভূত শাস্তির প্রতিকার পাওয়ার অধিকার পেতে পারে।”

বিবৃতিতে বলা হয়, “আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক নির্যাতন অথবা এমনকি মৃত্যুর মতো ভয়াবহ ঘটনার নজির রয়েছে।”

এই প্রেক্ষাপটে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনটি হেফাজতে আটক ব্যক্তিদের সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। নাগরিক সমাজের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফলে প্রতিষ্ঠিত এই আইনের সংশোধন দাবি হেফাজতে আটক ব্যক্তিদের মানবাধিকার সুরক্ষায় অন্তরায় সৃষ্টি করবে বলে ধারণা করছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র।

“বাংলাদেশে এমনিতেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি রয়েছে,” বলে মন্তব্য করেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান।

তিনি বেনারকে বলেন, “মানবাধিকার কর্মীদের দাবির মুখে জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদের সঙ্গে সংগতি রেখে সরকার ২০১৩ সালে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনটি সংসদে পাশ করে। এর ফলে নিরাপদ হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতনের ঘটনার দায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে জনগণ আদালতে অভিযোগ দায়ের করতে পারে।”

নূর খানের মতে, “এর মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার জন্য জবাবদিহি করার একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এই আইনটি জনগণের জন্য একটি ‘রক্ষা কবচের মতো’।”

“নিরাপদ হেফাজতে মৃত্যু, নিখোঁজ, বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ঘটনায় গত পাঁচ বছরে কমপক্ষে এক হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। আর পুলিশি হেফাজতে প্রাণ হারিয়েছেন শতাধিক মানুষ,” বলেন এই মানবাধিকার কর্মী।

এই আইন বাতিল অথবা সংশোধন করে নিরাপদ হেফাজতে মৃত্যু অথবা নির্যাতন জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়-দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলে জনগণের ন্যায় বিচার পাওয়া দুরূহ হবে বলে মনে করেন নূর খান।

ঢাকার শাহবাগে পুলিশি হামলার প্রতিবাদে মানব বন্ধন। ২৮ জানুয়ারি ২০১৭। [মনিরুল আলম/বেনারনিউজ]
ঢাকার শাহবাগে পুলিশি হামলার প্রতিবাদে মানব বন্ধন। ২৮ জানুয়ারি ২০১৭। মনিরুল আলম/বেনারনিউজ

 

পুলিশের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা?

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সিরাজুল হুদা বেনারকে বলেন, এই আইনে এমন কিছু বিধান আছে যা মানলে আমাদের দেশে কোনো তদন্ত করা সম্ভব হবে না। যেমন, আইনানুযায়ী আসামিকে কাচের ঘরে আত্মীয়-স্বজনদের উপস্থিতিতে জেরা করতে হবে।

“একজন দাগি ক্রিমিনালকে যদি আত্মীয়-স্বজনদের সামনে এভাবে জেরা হয় তাহলে কি আমরা ঘটনার তদন্ত করে তার দোষ বের করতে পারব? এই ধরনের বিধান উন্নত দেশে বাস্তবায়ন করা সম্ভব, আমাদের দেশে নয়,” বলেন মৌলভীবাজার জেলার এই পুলিশ সুপার।

মৌলভীবাজার জেলার উদাহরণ টেনে তিনি জানান, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু আইনটির কারণে পুলিশের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করে সেখানকার একজন অপরাধী।

“একজন ভিকটিম মহিলা পেশায় কাঠ ব্যবসায়ী এক অপরাধীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। পুলিশ ব্যবস্থা নিতে গেলে তিনি অভিযুক্ত থানায় এসে আমার উপস্থিতিতে আমার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে হুমকি দেন। পুলিশ তার বিরুদ্ধে মামলা করে। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়,” বলেন হুদা।

“ওই ব্যক্তি জামিনে ছাড়া পেয়ে আদালতে অভিযোগ করে যে পুলিশ তাকে হেফাজতে নিয়ে নির্যাতন করেছে। অথচ আমরা তাঁকে কোনো প্রকার নির্যাতন করিনি। আর এই মামলার কারণে আলমগীর নামক অফিসারটি অনেক ভুগেছেন,” বলছিলেন সিরাজুল হুদা।

তাঁর প্রশ্ন, পুলিশ পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মামলার শিকার হবেন?

ঢাকার বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরমান আলী বেনারকে বলেন পুলিশ সপ্তাহে প্রথম তিনি নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনের সংশোধন দাবি করে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন সিলেটের কোতোয়ালি থানার ওসির বিরুদ্ধে একটি ‘মিথ্যা মামলা’ দায়ের করে এক ব্যক্তি।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি আব্দুল ওয়াহাব বেনারকে বলেন, ২০১৪ সালের দিকে কোতোয়ালি থানার ওসি একজন রাজনীতিবিদের আত্মীয়কে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে আসে। ওই ব্যক্তি আদালতে ওসির বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করেন এবং মামলা হয়। এরপর তিনি জেল খেটেছেন। পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় অভিযোগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আদালতে ওই মামলা এখনো চলমান।

তবে পুলিশের এসব অভিযোগের বিপরীত চিত্রও রয়েছে সমাজে। পুলিশের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠছে। পুলিশ সপ্তাহ চলাকালে পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমানকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশে অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

ব্যাংক কর্মকর্তা মরিয়ম আক্তারকে গত বছরের জুলাই মাসে বিয়ে করেন মিজানুর রহমান। ২০১৯ সাল পর্যন্ত সেই কথা গোপন রাখার শর্ত দিয়েছিলেন স্ত্রীকে। মরিয়ম রাজি হননি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি গত ১২ ডিসেম্বর পুলিশ পাঠিয়ে মরিয়মকে গ্রেপ্তার করান।

ঢাকায় রাজারবাগে পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গত বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, অভিযোগ সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাঁকে ডিএমপি থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন