Follow us

খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে বিতর্কে সরকার ও বিরোধী দল

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2018-03-30
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকায় আদালতে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ২৮ ডিসেম্বর ২০১৭।
ঢাকায় আদালতে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ২৮ ডিসেম্বর ২০১৭।
AP

কারাগারে থাকা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে সরকার ও দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে। তিনি অসুস্থ কিনা, অসুস্থ হলে কতটা বা কী ধরনের অসুস্থ—এসব বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলছে না।

তবে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিত​র্ক চলছে জোরেসোরে। সরকারি দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শুক্রবার পৃথক ব্রিফিংয়ে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে কথা বলেন। তবে তাঁদের বক্তব্যে তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ৭৩ বছর বয়সী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা মেলেনি।

জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শুক্রবার বিকেলে বেনারকে বলেন, “বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আগে থেকেই নানা ধরনের রোগে ভুগছিলেন। নতুন করে তাঁর অসুস্থতার খবরে আমরা উদ্বিগ্ন। এ অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য অবিলম্বে তাঁর মুক্তি দাবি করছি।”

তিনি বলেন, “আমরা চাই ম্যাডামের ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষার অনুমতি দেওয়া হোক। তাঁরা যে পরামর্শ দেবেন, সে অনুযায়ী তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।”

“এর আগে দেশের বাইরে ম্যাডাম চিকিৎসা করিয়েছেন, সেসব চিকিৎসার ফলোআপ করাও প্রয়োজন। মুক্তি পেলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে,” জানান মির্জা ফখরুল।

এর আগে গতকাল সকালে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল অভিযোগ করেন, কারাগারে খালেদা জিয়াকে যে পরিবেশে রাখা হয়েছে, সেটা তাঁর প্রাপ্য নয়। বরং এই পরিবেশে রাখার কারণেই তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থা আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে।

মির্জা ফখরুল সংবাদ সম্মেলন করার পর আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিলে তাঁকে বিদেশে পাঠানো হবে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, “বেগম জিয়া অসুস্থ—এ কথা বিএনপি মহাসচিব জোর গলায় বলছেন। এটা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে তাঁর যে ধরনের অসুস্থতা সে অনুযায়ী সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে।”

কাদের আরও বলেন, সরকার অমানবিক নয়। এ দেশে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। নিয়ম অনুযায়ী খালেদা জিয়ার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে।

খালেদা জিয়াকে সরকার বিদেশে পাঠিয়ে দেবে—এমন গুঞ্জনের বিষয়ে সাংবাদিকেরা ওবায়দুল কাদেরের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, “গুজবে কান দেবেন না।”

যেভাবে অসুস্থতার খবর ছড়ায়

গত বুধবার একটি মামলায় খালেদা জিয়ার আদালতে হাজির হওয়ার কথা ছিল। সব প্রস্তুতি থাকলেও তাঁকে আদালতে নেওয়া হয়নি। এরপর গত বৃহস্পতিবার দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুলের সঙ্গে খালেদা জিয়ার দেখা হওয়ার কথা ছিল। ফখরুল ওইদিন কারাগারের কাছাকাছি যাওয়ার পর জানতে পারেন, সাক্ষাৎকার স্থগিত করা হয়েছে। কারাগার থেকে বিএনপির চেয়ারপারসনের একান্ত সচিব এবিএম আবদুস সাত্তারকে ফোন করে সাক্ষাৎ​কার স্থগিতের কথা জানানো হয়।

এ প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, “অসুস্থ হওয়ায় আমার সঙ্গে নেত্রীর সাক্ষাৎ​কার স্থগিত করা হলো। আমরা জানতে চাইলাম তিনি কী ধরনের অসুস্থ হয়েছেন? জবাব পেলাম না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা তাঁর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য পাইনি।”

সাংবাদিকদের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, “এভাবে কারারুদ্ধ অবস্থায় তাঁর অসুস্থ হওয়াটাও কোনও মতেই আমরা স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারি না। আমরা আশঙ্কা করছি, অন্যান্য স্বৈরাচাররা যেভাবে প্রতিপক্ষ অপসারণ করার চেষ্টা করে, সেই ধরনের অপসারণের চেষ্টা এখানে হতে পারে।”

বেনারের পক্ষ থেকে কারাগারে খালেদা জিয়ার চিকিৎ​সক মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে গতকাল যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাঁকে ফোনে পাওয়া যায়নি। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারকে বলেন, বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর। তাই এ বিষয়ে তাঁরা মন্তব্য করতে চান না।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট্র দুর্নীতির মামলার রায়ে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ৫ বছর সাজা হয় গত ৮ ফেব্রুয়ারি। ওইদিন বিকাল থেকে নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন তিনি। বিএনপির পক্ষ থেকে একদিকে তাঁর জামিনের চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন তাঁর পাঁচ বছরের সাজা আরও বাড়ানোর জন্য আদালতে আবেদন করেছে।

রাজনৈতিক এই পরিস্থিতির মধ্যে আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় নির্বাচন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বৃহস্পতিবার দেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে এক জনসভায় বলেছেন, আগামী ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে, সেই নির্বাচনের জন্য তিনি দলীয় প্রতীক নৌকা মার্কায় ভোট চান।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আল মজুমদার বেনারকে বলেন, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোটেও সুখকর নয়। তিনি বলেন, “খালেদা জিয়া যদি অসুস্থ্ হন, আর সরকার যদি তাঁর চিকিৎসার জন্য আগ্রহ দেখিয়ে থাকে তাহলে সেটা ইতিবাচক। তবে প্রকৃত অবস্থা এখন পর্যন্ত জানা যায়নি।”

ড. মজুমদার বলেন, “এখন আমরা এ দেশের নাগরিক হিসেবে আশা করি, রাজনীতিবিদদের পরস্পরের প্রতি সহনশীলতা, সহমর্মিতা এবং শিষ্টাচারবোধ যেন বজায় থাকে। একইসঙ্গে যেন সঠিক বিচার নিশ্চিত হয় এবং অন্যায় করে কেউ যাতে পার না পায়।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন