Follow us

মন্ত্রীর বিরুদ্ধে খবর প্রকাশ করায় নেত্র নিউজ বন্ধ

পুলক ঘটক
ঢাকা
2020-01-09
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকায় জাতীয় পার্টির একটি সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ২৮ ডিসেম্বর ২০১৯।
ঢাকায় জাতীয় পার্টির একটি সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ২৮ ডিসেম্বর ২০১৯।
[বেনারনিউজ]

সুইডেন-ভিত্তিক একটি অনুসন্ধানী ওয়েব পোর্টালে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের দুর্নীতির বিষয়ে একটি সংবাদ প্রকাশের পর থেকে বাংলাদেশের পাঠকেরা এটি দেখতে পাচ্ছেন না।

মোটা অঙ্কের ঠিকাদারি দেবার বিনিময়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের উৎকোচ হিসেবে বিলাসবহুল হাতঘড়ি পেতে পছন্দ করেন বলে অভিযোগ করা হয় ওই প্রতিবেদনে।

নিউজ পোর্টালটির সম্পাদক তাসনীম খলিল বেনারকে বলেছেন, “দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের দুর্নীতির বিষয়ে আমরা একটি নিউজ করেছিলাম। ২৭ ডিসেম্বর নিউজটি আপলোড করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আমাদের পোর্টালটি বিটিআরসি ব্লক করে দেয়।”

তবে ঘড়ির পেছনে দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে তাঁর সব ঘড়িই বিভিন্ন জনের দেওয়া উপহার বলে বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন ওবায়দুল কাদের। একই সাথে কোনো ঠিকাদারের সাথে তাঁর কোনো বৈঠক হয় না বলেও জানান তিনি।

এদিকে নিউজ পোর্টালটি ব্লক করে দেবার অভিযোগ সত্য নয় বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি অথরিটি-বিটিআরসি’র মুখপাত্র জাকির হোসেন। তিনি বেনারকে বলেন, “নেত্র নিউজ ব্লক করে দেওয়া হয়েছে— এমন কোনো তথ্য আমার জানা নেই।”

“এই ওয়েবসাইটটির কথা আমরা আগে জানতাম না। আপনাদের (সাংবাদিকদের) মুখ থেকেই এর কথা শুনছি,” বলেন বিটিআরসি’র এই সিনিয়র সহকারী পরিচালক।

সরকারের পক্ষ থেকে এ রকম কথা বলা হলেও ওয়েবসাইটটি যে বাংলাদেশ থেকে খোলা যাচ্ছে না তা পরীক্ষা করে দেখেছে বেনারনিউজ। তবে ভিপিএন বা প্রক্সি সার্ভার ব্যবহার করে ভিন্ন দেশের আইপি থেকে ওয়েব পোর্টালটি দেখা যাচ্ছে।

অনলাইনটির প্রধান সম্পাদক তাসনীম খলিল জানান, তাদের নিউজ পোর্টালটি গত ২৬ ডিসেম্বর চালু হয়েছে। ওয়েবসাইটটি চালু হওয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই এটিকে ব্লক করে দেওয়া হয়েছে।

নেত্র নিউজ সুইডেনে রেজিস্ট্রেশনকৃত এবং সুইডেন থেকেই পরিচালিত। তাসনীম খলিল একজন প্রবাসী বাংলাদেশি। তিনি ২০০৭ সালে সুইডেনে চলে যান বলে বেনারকে জানিয়েছেন। মূলত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করার জন্যই তাদের এই ওয়েবসাইট, বলেন তিনি।

এদিকে নেত্র নিউজসহ অনলাইন মিডিয়া ব্লক করার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, বাংলাদেশ সরকার ‘কর্তৃত্ববাদিতার দিকে হাঁটছে।”

কী লিখেছিল নেত্র

একটি গোপন সূত্রের বরাত দিয়ে নেত্র লিখেছে, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের “উৎকোচ হিসেবে বিশ্ব-বিখ্যাত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দামি হাতঘড়ি উপহার পেতে পছন্দ করেন।” খবরের শিরোনাম ছিল—‘মন্ত্রী কাদেরের ঘড়ির গোলমাল।’

ওয়েব পোর্টালটির ভাষায়, “মোটা অঙ্কের একটি কন্ট্রাক্ট পাশ করে দেয়ার বিনিময়ে মন্ত্রী কাদের বিলাসবহুল একটি ব্র্যান্ডের খুবই দামি একটি হাতঘড়ি উৎকোচ হিসেবে নিয়েছেন এমন একটি লেনদেন খুবই কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন এই অভিযোগকারী।”

নেত্র ওবায়দুল কাদেরের ব্যবহৃত বেশ কিছু দামি হাতঘড়ির বিবরণ তুলে ধরেছে।

“রোলেক্স, উলিস নাদা আর লুই ভিতন ব্র্যান্ডের এই ঘড়িগুলোর সর্বমোট মূল্য কোটি টাকারও বেশি” এই দাবি করে নিউজ পোর্টালটি বলেছে, কাদেরের ব্যবহৃত এসব ঘড়ি তাঁর ঘোষিত আয় ও নির্বাচনের সময় জমা দেওয়া হলফনামার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

সব ঘড়ি উপহার: ওবায়দুল কাদের

তাঁর ব্যবহৃত ঘড়ির পেছনে কোনো ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওবায়দুল কাদের। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমার যত ঘড়ি আছে একটাও আমার নিজের কেনা না, সব উপহার। ধরেন আপনি বিদেশে গেলেন, এসে আমাকে একটা ঘড়ি দিলেন, আমি নিলাম।”

নিজের পোশাক দেখিয়ে মন্ত্রী বলেন, “ফর গডস সেক, আমি বলছি এগুলো আমার দামি পোশাক, এগুলো আমার কেনা না। আমি পাই, হয়তো আমাকে অনেকে ভালোবাসে, আমার অনেক কর্মী আছে, তারা বিদেশে আছে, আসার সময় স্যুট নিয়ে আসে।”

“এখন আপনি যদি এ রকম নিয়ে আসেন, আমাকে উপহার দেন, আমি কী করব? এটা গিফট আইটেম,” বলেন তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে কাদের বলেন, “আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারব, আমার সঙ্গে কোনো কন্ট্রাক্টরের বৈঠক হয় না।”

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগ

যুক্তরাজ্য ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অনলাইন মিডিয়া ব্লক করার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বৃহস্পতিবার বিবৃতি দিয়েছে।

আগের কয়েকটি ঘটনার ধারাবাহিকতায় নেত্র’র ওয়েবসাইট ব্লক করার বিষয়টি তুলে ধরে সংস্থাটির এশিয়া মহাদেশীয় পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বিবৃতিতে বলেছেন, “সরকার কর্তৃত্ববাদিতার দিকেই হাঁটছে। তারা শুধু প্রশংসা করার সুযোগ দিতে এবং সমালোচনা বন্ধ করতে আগ্রহী।”

তিনি বলেন, “এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ মত প্রকাশের স্বাধীনতার মৌলিক নীতিকেই অবজ্ঞা করে যাতে মনে হচ্ছে সরকারের অনেক কিছুই গোপন করার আছে।”

সংস্থাটি বলেছে ২০১৮’ শেষ দিকে বাংলাদেশ সরকার দেশি এবং বিদেশিসহ ৫৪টি ওয়েবসাইট ব্লক করে দিয়েছিল।

নিউজ পোর্টাল বন্ধের ব্যাপারে বক্তব্য জানতে চাইলে বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এবং বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল বেনারকে বলেন, “কোনো মিডিয়া ভুল তথ্য পরিবেশন করলে সেটি ব্লক করে দেওয়া সমাধান হতে পারে না। ভুল তথ্যের জবাব দিতে হয় সত্য তথ্য তুলে ধরার মাধ্যমে।”

তিনি বলেন, “সরকার যদি কোনো ওয়েবসাইট ব্লক করে দেয় তাহলে সেটি বাংলাদেশে দেখা না গেলেও অন্যান্য দেশে ঠিকই দেখা যাবে। এমনকি বাংলাদেশেও ভিপিএন ব্যবহার করে দেখার সুযোগ থাকে।”

“ভুল নিউজ করেছে বলে বন্ধ করে দিলাম- এটা যুক্তির কথা হতে পারে না,” বলেন বুলবুল।

বাক স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান আইন ও সালিস কেন্দ্রের মহাসচিব তাহমিনা রহমান বেনারকে বলেন, “কী কারণে পোর্টালটি ব্লক হয়েছে এটা ক্লিয়ার না। তবে কোনো সংবাদ পোর্টাল ব্লক করতে হলে আন্তর্জাতিক কিছু নিয়ম আছে। শিশু পর্নোগ্রাফি, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস অথবা ঘৃণা ছড়ানোর অভিযোগ থাকলে সরকার ওয়েবসাইট ব্লক করতে পারে। নচেৎ নয়।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন