Follow us

প্রথম আলোর সম্পাদকসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2020-01-16
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকায় প্রথম আলোর বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন পত্রিকাটির সম্পাদক মতিউর রহমান। ৭ নভেম্বর ২০১৪।
ঢাকায় প্রথম আলোর বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন পত্রিকাটির সম্পাদক মতিউর রহমান। ৭ নভেম্বর ২০১৪।
[বেনারনিউজ]

বাংলাদেশের জনপ্রিয় দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান ও পত্রিকাটির সহযোগী প্রকাশনা কিশোর আলোর সম্পাদক আনিসুল হকসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত।

ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র নাইমুল আবরারের (১৪) দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর মামলায় বৃহস্পতিবার ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম মো. কায়সারুল ইসলাম এই আদেশ দেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. ওমর ফারুক আসিফ বেনারকে বলেন, “আদালতের আদেশের পর যে কোনো সময় পুলিশ তাঁদের গ্রেফতার করতে পারে। তবে তাঁরা চাইলে উচ্চ আদালতে আগাম জামিনের জন্য যেতে পারেন অথবা সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজির হয়ে আত্মসমর্পণও করতে পারেন।”

গণমাধ্যম বিশ্লেষক আলী আর রাজি বেনারকে বলেন, “যদিও বিচারাধীন বিষয়, তবে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার দিক থেকে এটি ভয়ানক একটি ঘটনা। এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠতেই পারে।”

বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এই শিক্ষক বলেন, “যে ঘটনার প্রেক্ষিতে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে, তার সঙ্গে মতিউর রহমানের সম্পর্ক নেই বললেই চলে। এক্ষেত্রে ঘটনার সাথে তাঁর সম্পৃক্ততা বিবেচনায় তিনি দূরবর্তী একজন মানুষ।”

“অনেক দিন ধরেই সরকারের শীর্ষপর্যায়ের কথা বা কাজে মতিউর রহমান ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের ব্যাপারে এক ধরনের নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পাচ্ছে। এই ঘটনায় সেই মনোভাবের এক ধরনের বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা যায়,” যোগ করেন তিনি।

গত বুধবার জাতীয় সংসদে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাও বলেন, “বর্তমানে এ দেশে আইনের শাসন তার নিজ গতিতে চলে না, চলে সরকারের গতিতে। সরকারের চাওয়া ও ইচ্ছে অনুযায়ীই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”

অন্যদিকে প্রথম আলোর সম্পাদকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির বিষয়ে “এখনই মন্তব্য করা অসুবিধাজনক,” উল্লেখ করে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাবেক নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বেনারকে বলেন, “আমরা বুঝতেই পারছি এখানে কী হচ্ছে। কিন্তু আপাতত কিছুই বলার নেই।”

বাদীপক্ষের আবেদনে পরোয়ানা

মোহাম্মাদপুর থানা পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর বাদীপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রথম আলোর সম্পাদকসহ ১০ অভিযুক্তের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেয় আদালত।

বাদীপক্ষের আইনজীবী আসিফ বেনারকে বলেন, “পুলিশ তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে। যে কারণে আমরা দণ্ডবিধির ধারা ৩০৪ (এ) অনুযায়ী অভিযোগ আমলে নিয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেছি।”

তিনি জানান, গত পহেলা নভেম্বর ঢাকার রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজে প্রথম আলোর কিশোর ম্যাগাজিন ‘কিশোর আলো'র বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে ‘নিরপত্তামূলক ব্যবস্থায় অবহেলার অভিযোগ’ আনা হয়েছে মামলায়।

ওই অনুষ্ঠানে গিয়ে বিদ্যুতায়িত হয়ে মারা যায় প্রতিষ্ঠানটির নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবরার। ঘটনার পাঁচদিন পর ৬ নভেম্বর তার বাবা মজিবুর রহমান মহানগর হাকিম আদালতে প্রথম আলো সম্পাদকসহ আয়োজন সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

আদালত তখন আবরারের মরদেহ কবর থে‌কে তু‌লে পুণঃময়নাতদ‌ন্তের পাশাপাশি মোহাম্মদপুর থানার পুলিশকে অভিযোগ তদন্ত করে প্র‌তি‌বেদন দাখি‌লের নির্দেশ দেন।

“এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার আদালতে প্রতিবেদনটি জমা দেওয়া হয়,” বেনারকে বলেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুল আলীম।

“শুনানির সময় আবরারের বাবা আদালতে হাজির ছিলেন। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির ঘটনায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন,” জানান তাঁর আইনজীবী।

পরোয়ানাভুক্ত বাকি অভিযুক্তরা হলেন; প্রথম আলোর হেড অব ইভেন্ট অ্যান্ড অ্যাকটিভেশন কবির বকুল, নির্বাহী শুভাশীষ প্রামাণিক ও শাহপরাণ তুষার, কিশোর আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক মহিতুল আলম, ডেকোরেশন ও জেনারেটর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের জসীম উদ্দিন, মোশাররফ হোসেন, সুজন ও কামরুল হাওলাদার।

উল্লেখ্য, ৫ নভেম্বর প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক লেখায় কিশোর আলো সম্পাদক আনিসুল হক দাবি করেন, ওই অনুষ্ঠানে প্রত্যেক দর্শনার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা ছিল আয়োজকদের। তিনি ওই দুর্ঘটনার জন্য দুঃখপ্রকাশ করে জীবনভর আবরারের পরিবারের সাথে থাকারও প্রতিশ্রুতি দেন।

যা বলছেন সাংবাদিক নেতারা

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) একাংশের মহাসচিব শাবান মাহমুদ বেনারকে বলেন, “প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান একজন বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। প্রতিষ্ঠানের একটি অনুষ্ঠানের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে ঘিরে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা যৌক্তিক হবে কিনা, সে বিষয়টি বিবেচনার দাবি রাখে।”

“একজন প্রতিথযশা সাংবাদিককে গ্রেফতারের নির্দেশ শতভাগ স্বচ্ছতার আলোকেই হওয়া উচিত। আমরা বিশ্বাস করি, এই ঘটনার নেপথ্যে আর যাই হোক, মতিউর রহমানের সংশ্লিষ্টতা নেই,” বলেন তিনি।

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) একাংশের সভাপতি কাদের গনি চৌধুরী বেনারকে বলেন, “মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি অত্যন্ত দুঃখজনক। এটা প্রথম আলোকে চাপে রাখার একটি কৌশল, যা গণমাধ্যমের কন্ঠরোধ করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।”

তাঁর দাবি, “মতিউর রহমান একজন উঁচুমাপের মানুষ। তিনি এ দেশের সৎ সাংবাদিকতার একজন পথিকৃৎ এবং সবচেয়ে বড় পত্রিকার সম্পাদক। তাঁকে দমাতে পারলে অন্য কোনো পত্রিকা মুক্তভাবে লেখার সাহস পাবে না।”

“এতে স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ হবে, গণমাধ্যম কর্মীদের ভীতি বাড়বে,” মনে করেন কাদের গনি।

ঢাকা থেকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন পুলক ঘটক

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন