Follow us

কোটা আন্দোলন: গ্রেপ্তার ১২ ছাত্রের চারজন এখন পুলিশের রিমান্ডে

প্রাপ্তি রহমান ও শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2018-07-10
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
শুনানি শেষে পুলিশ পাহারায় ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালত ত্যাগ করছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা ফারুক হোসেন ও মশিউর রহমান। ১০ জুলাই ২০১৮।
শুনানি শেষে পুলিশ পাহারায় ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালত ত্যাগ করছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা ফারুক হোসেন ও মশিউর রহমান। ১০ জুলাই ২০১৮।
বেনারনিউজ

কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় নাশকতা, পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ১২ ছাত্রের মধ্যে চারজন এখন পুলিশের রিমান্ডে আছেন।

মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের দশজন আইনজীবী মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে তিন ছাত্রের জামিন আবেদন করেন। আদালত আবেদন না মঞ্জুর করে তাঁদের দুই দিনের রিমান্ডে পাঠান। অবশ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) পরিদর্শক বাহাউদ্দীন ফারুকী দুটি মামলায় ওই তিন ছাত্রের ১৪ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান বেনারকে জানান, তাঁরা ১ জুলাই থেকে গতকাল পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছেন।

মঙ্গলবার যাঁদের জামিন আবেদন না মঞ্জুর হয় তাঁরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্র ফারুক হোসেন, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র মশিউর রহমান ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জসীমউদ্দীন। তাঁরা তিনজনই সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক।

অপর যুগ্ম আহ্বায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের ছাত্র রাশেদ খানকে গত রোববার ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

অপর একটি মামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র তারিকুল ইসলাম আদনানকে পুলিশ রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানায়। পরীক্ষা থাকায় গতকাল তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়নি। আগামী ১৭ জুলাই তাঁর জামিন আবেদনের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।

মঙ্গলবার শিক্ষার্থীদের পক্ষে জামিন আবেদনের শুনানিতে অংশ নেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন, জ্যোতির্ময় বড়ুয়াসহ ১০/১২ জন আইনজীবী। রাষ্ট্রপক্ষ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে দেশকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগ আনেন।

শিক্ষার্থীদের পক্ষে আইনজীবীরা বলেন, মামলায় যাঁদের আসামি করা হয়েছে তাঁরা সাধারণ ছাত্র। তাঁরা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। অথচ তাঁদের অপরাধ রাজনৈতিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে শাহবাগ থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা (জিআরও) মাহমুদুর রহমান বেনারকে বলেন, “রিমান্ডের পক্ষে আমি আদালতে দাঁড়িয়েছিলাম, সেখানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি।”

“কারা এই ঘটনার উসকানিদাতা ও অর্থদাতা তা বের করতেই তাদের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে,” যোগ করেন তিনি ।

জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বেনারকে বলেন, শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার এবং পরবর্তী পর্যায়ে যে যে আইনগত নিয়ম অনুসরণের কথা সেগুলো অনুসৃত হয়নি।

“উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী যে যে বিষয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুসরণের কথা সেটার যে ব্যত্যয় হয়েছে সে ব্যাপারে আমরা আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। আদালত সব শুনে দুদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। জামিন দেননি,” বলেন জ্যোতির্ময়।

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা আছে ৫৬ শতাংশ। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা ৩০ শতাংশ (ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনি), নারী ১০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ।

এই ৫৫ শতাংশ কোটায় পূরণযোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে ১ শতাংশ পদে প্রতিবন্ধী নিয়োগের বিধান রয়েছে। শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের জন্য গত ফেব্রুয়ারি থেকে আন্দোলন শুরু করে।

গত ৮ এপ্রিল শাহবাগ এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ লাঠিপেটা করে ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। এতে আন্দোলন সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে গত ১১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন।

কোটা সংস্কার নিয়ে নতুন করে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি পর্যালোচনা, সংস্কার বা বাতিলের বিষয়ে ২ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে প্রধান করে সাত সদস্যের একটি কমিটি করে সরকার। ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে এই কমিটির প্রতিবেদন দেওয়ার কথা।

এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার ১২

কোটা সংস্কারে প্রজ্ঞাপন জারির দাবিতে গত ৩০ জুন নতুন করে কর্মসূচি ঘোষণা করে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। ওই দিনই তাঁরা সরকারপন্থী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের মারপিটের শিকার হন। পুলিশের ধরপাকড় শুরু হয় একদিন পর।

“কোটা সংস্কার আন্দোলনে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনায় শাহবাগ থানায় মোট চারটি মামলা হয়েছিল। এর একটি দায়ের করেছে বিশ্ববিদ্যালয়, একটি পুলিশের বিশেষ শাখার কর্মকর্তা ও দুটি শাহবাগ থানা-পুলিশ। এর বাইরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে এক ব্যক্তি একটি মামলা করেছেন। ডিবি তিনজনকে ও শাহবাগ থানা-পুলিশ নয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে,” মাসুদুর রহমান বলেন।

শাহবাগ থানা-পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে, জসিম উদ্দিন, তারিকুল, মশিউর, আমানউল্লাহ, মাজহারুল, জাকারিয়া, রমজান, রবিন ও মাহফুজকে। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ গ্রেপ্তার করেছে তিনজনকে। তাঁরা হলেন, রাশেদ খান, ফাইজুর ও আতিকুর।

গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মাহফুজ জামিনে মুক্তি পেয়েছেন বলে জানা গেছে।

সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান মামুন দাবি করেছেন, শুধু হয়রানি করার জন্যই এসব মামলায় ছাত্রদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

“মামলাগুলো গত ৮ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে হামলা ও একজন পুলিশ সদস্যের মোটরসাইকেল পোড়ানোর জন্য দায়ের করা। শুধু একজনের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা হয়েছে। হামলার পরপরই উপাচার্য কিন্তু বলেছিলেন, ছাত্ররা এই হামলা করেনি। আমরাও হামলার বিচার দাবি করেছিলাম। এজাহারে নাম না থাকলেও এখন আমাদের ওপরই দোষ চাপানো হচ্ছে,” বেনারকে বলেন হাসান মামুন।

রিমান্ডে থাকা ছাত্র ফারুক হোসেনের ভাই আরিফুল ইসলাম বেনারকে বলছিলেন, তাঁর ভাই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছাত্রলীগের হামলায় মারাত্মক আহত হন। তিনি কারাগারেও হাসপাতালে ছিলেন। তবু রিমান্ড হলো।

তবে গতকালও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, আন্দোলনে অপশক্তি ঢুকে গিয়েছিল। তাদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জঙ্গি গোষ্ঠীর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। গ্রেপ্তার ছাত্রদের ব্যাপারে তিনি কী করবেন, জানতে চাইলে বলেন, আইন আইনের গতিতে চলবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার ও মামলায় জড়ানো এবং উপাচার্যের বক্তব্যে ব্যথিত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ।

“স্বৈরশাসক এরশাদের সময়ে প্রায়ই হলে রেড দিয়ে ছাত্রদের ধরে নিয়ে যেত। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাজই ছিল থানা থেকে তাদের ছাড়িয়ে নেওয়া। ছাত্রদের নিয়ে কর্তৃপক্ষ যা বলছে, তা আমাকে শুধু ব্যথিত করছে,” বেনারকে বলেন এমাজউদ্দীন আহমেদ।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন