Follow us

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা বিলুপ্তির সুপারিশ সরকারি কমিটির

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2018-09-17
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার শাহবাগে কোটা আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভ। ৯ আগস্ট ২০১৮।
ঢাকার শাহবাগে কোটা আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভ। ৯ আগস্ট ২০১৮।
নিউজরুম ফটো

বাংলাদেশে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির (নবম থেকে ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত) সরকারি চাকরিতে নারী, মুক্তিযোদ্ধাসহ কোনো ধরনের কোটা না রেখে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের নিয়ম চালু করার সুপারিশ করেছে সরকার গঠিত কমিটি। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে মন্ত্রিপরিষদ অনুমোদন দিলে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে।

সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর সাংবাদিকদের এসব কথা জানান কোটা সংস্কার, বাতিল ও পর্যালোচনার জন্য গঠিত কমিটির প্রধান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম।

“কোটা নিয়ে আমাদের ফাইন্ডিংস হলো, নবম থেকে ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত যে প্রাথমিক নিয়োগ হয়, সে নিয়োগে কোনো কোটা থাকবে না,” বলেন তিনি।

কমিটির এই সুপারিশকে স্বাগত জানিয়েছেন বিশ্লেষকেরা। এ বিষয়ে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বেনারকে বলেন, “কোটা পর্যালোচনা কমিটির এই সুপারিশকে আমি ওয়েলকাম করি।”

তবে প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত এক ধরনের আশঙ্কা থেকে যাবে বলেও মনে করেন অনেকে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক খ আলী আর রাজি বেনারকে বলেন, “যতক্ষণ প্রজ্ঞাপন না হচ্ছে ততক্ষণ এর কোনো মূল্য নাই। প্রজ্ঞাপন হওয়ার পরও সরকার আবার নানা ঝামেলা তৈরি করে প্রজ্ঞাপন বাতিল করে দিতে পারে। তাই প্রজ্ঞাপনই যে সবকিছু এমনটি মনে হয় না।”

প্রসঙ্গত, বিদ্যমান ব্যবস্থায় প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ অগ্রাধিকার কোটায় (৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা, ১০ শতাংশ নারী, ১০ শতাংশ জেলা কোটা, ৫ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা) নিয়োগের বিধান আছে।

এ ছাড়া তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরির ক্ষেত্রে পোষ্য, আনসার-ভিডিপিসহ আরও কিছু কোটা রয়েছে।

বিদ্যমান এই কোটা সংস্কার করার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা।

গত ৮ এপ্রিল শাহবাগ এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ হামলা চালানোর পরে এই আন্দোলন সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন চলাকালে গত ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারপর কোটা সংস্কার, বাতিল বা পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠন করেন তিনি।

তবু আন্দোলন চলবে

কোটা বাতিল করার সুপারিশকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা। তবে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির পাশাপাশি তাঁদের সদস্যদের নামে মামলা প্রত্যাহার ও হামলাকারীদের বিচার চেয়েছেন তাঁরা। তাই প্রজ্ঞাপন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

সোমবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতারা।

সংবাদ সম্মেলনে কোটা আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন বলেন, ‘কমিটি যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, সেটাকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। পাশাপাশি আমাদের দাবি ছিল সব চাকরির ক্ষেত্রে যে কোটা পদ্ধতি রয়েছে তার একটি যৌক্তিক সংস্কার। সচিব নবম গ্রেড থেকে ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত বাতিলের যে প্রতিবেদন দিয়েছেন, সেটিকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি।”

“এর পাশাপাশি যে গ্রেডগুলো রয়েছে সেখানে যৌক্তিকভাবে কোটার সহনীয় সংস্কার করা হোক সেই দাবিও আমরা জানাই। কোটা সংস্কার প্রজ্ঞাপন আকারে জারি না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে,” ঘোষণা দেন তিনি।

“যেদিন আমাদের তিন দফা দাবি বাস্তবায়ন হবে, সেদিনই আমরা আন্দোলন থেকে সরে যাব। আমাদের দাবিগুলো হলো- ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক সব মামলা প্রত্যাহার করা, হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া ও পাঁচ দফার আলোকে কোটার সংস্কার করা,” বলেন সংগঠনের যুগ্ম-আহ্বায়ক ফারুক হোসেন।

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঢাকার শাহবাগ থানায় চারটি ও রমনা থানায় একটি মামলা হয়। এই আন্দোলনের একজন যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান কেবল এর মধ্যে একটি মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি। বাকি মামলাগুলোর কয়েক শ আসামির সবাই অজ্ঞাতনামা।

এসব মামলার মধ্যে দুটি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামানের বাসভবনে ভাঙচুর, সরকারি কাজে বাধা, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর ও পুলিশের বিশেষ শাখার এক সদস্যের মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগের চারটি ঘটনা রয়েছে।

আগামী মাসেই প্রজ্ঞাপন

কমিটি সুপারিশ করলেও সরকারই চাকরিতে কোটা রাখা বা না রাখার সিদ্ধান্ত নেবে। সরকার ইতিবাচক সিদ্ধান্ত জানালেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তা প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম জানান, কমিটির প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কাছে সাবমিট করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এতে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন করলে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেলে আগামী মাসেই তা প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হতে পারে।

ত্রয়োদশ থেকে বিংশতম গ্রেডে অর্থাৎ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা আগের নিয়মই বহাল থাকবে বলে সাংবাদিকদের জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটাও তুলে দেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি। অথচ এই কোটা সংরক্ষণের বিষয়ে আদালতের একটি পর্যবেক্ষণ রয়েছে বলে এত দিন সরকারের পক্ষ থেকে বলে আসা হচ্ছিল।

এ বিষয়ে মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, “আদালতের একটি নির্দেশনা আছে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে। এ বিষয়ে আমরা এক্সামিন করেছি। রাষ্ট্রের আইন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। তাঁরা বলেছেন, সরকার পলিসি ম্যাটার হিসেবে যেটা সিদ্ধান্ত দেবে সেটা ঠিক আছে।”

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কিংবা প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা অন্য কোনোভাবে রাখা যায় কি না তা ভাবা হবে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শফিউল আলম জানান, “কমিটি ব্যাপকভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখেছে, এখন আর পিছিয়ে পড়া কোনো জনগোষ্ঠী নেই। সবাই এগিয়ে গেছে। তারা এখন কোটা না হলেও চলতে পারে।”

তবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনায় রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম আরেফিন সিদ্দিক।

তিনি বেনারকে বলেন, “কমিটি মাত্র সুপারিশ করেছে। আমি মনে করি মেধাকে অধিকার দিয়ে দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনায় রাখার বিষয়টি মন্ত্রিসভা বিবেচনায় রাখবে।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন