Follow us

দাবি ছিল কোটা সংস্কার, সরকার করল বাতিল

প্রাপ্তি রহমান
ঢাকা
2018-10-03
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য চাকরিতে কোটা সংরক্ষণের দাবিতে ঢাকার শাহবাগে বিক্ষোভ। ৩ অক্টোবর ২০১৮।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য চাকরিতে কোটা সংরক্ষণের দাবিতে ঢাকার শাহবাগে বিক্ষোভ। ৩ অক্টোবর ২০১৮।
বেনারনিউজ

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ ক্ষেত্রে মেধাই হবে যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি।

বুধবার মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে সভা শেষে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম সংবাদ সম্মেলনে করেন।

তিনি বলেন, “জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি সংস্কার/বাতিলে’ সুপারিশ পেশ করে। সেই সুপারিশই অপরিবর্তিতভাবে অনুমোদন পায়।”

“তিনটি সুপারিশ ছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ, কোটা বাতিল এবং কোটা বাতিলের ফলে বিদ্যমান জনগোষ্ঠীর বিষয়ে যথোপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ- তিনটি সুপারিশেরই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে,” বলেন শফিউল আলম।

দু'তিন দিনের মধ্যেই এ সম্পর্কিত প্রজ্ঞাপণ জারি করা হবে বলেও জানান শফিউল।

বর্তমানে সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ পদ কোটায় সংরক্ষিত। এর মধ্যে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ, নারী ১০ শতাংশ, অনগ্রসর জেলা ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীী ৫ শতাংশ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য এক শতাংশ কোটা রয়েছে।

কোটা বাতিলকে ‘যৌক্তিক সিদ্ধান্ত’ বলে মন্তব্য করেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার।

তিনি বেনারকে বলেন, “কোটা সুবিধা না থাকায় কেউ পিছিয়ে পড়বে না। স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই বরং সবাই সমান সুযোগ পাবে। এ ক্ষেত্রে মেধাই হবে যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি।”

তবে এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা। তাঁরা এসব কোটা বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন।

সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন অবশ্য বলেছেন, আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় প্রতিবন্ধীদের জন্য এক শতাংশ কোটা থাকবে।

আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক, তবে…

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মোর্চা বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ গতকাল বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে সংবাদ সম্মেলন করে। তাঁরা আজ বৃহস্পতিবারের মধ্যে কিছু বিষয় স্পষ্টীকরণের দাবি করেছে।

যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নুর বলেন, “সরকারের সিদ্ধান্ত আপাতত ইতিবাচক। তবে একটি বিষয় এখনও স্পষ্ট নয়। বৃহস্পতিবারের মধ্যে বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে।”

“আমরা কোটা সংস্কার চেয়েছিলাম, বাতিল নয়। অনগ্রসর সম্প্রদায়ের জন্য যদি কোটার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, তবে তা সরকার করতে পারবে এমন একটি শর্ত রাখা হয়েছে। এতে বিশেষ নিয়োগের সুযোগ থাকছে কি না তা স্পষ্ট হওয়া দরকার,” নূরুল বলেন।

তবে প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা রাখার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন তাঁরা।

আন্দোলনকারীরা তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রত্যাহার ও হামলাকারীদের বিচারের ব্যাপারেও সুস্পষ্ট ঘোষণা ও তার বাস্তবায়ন দাবি করেছে।

মামলাগুলোর কী হবে?

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন গড়ে তোলে। এপ্রিলে দাবি আদায়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণা দেন। আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসলে গত ২৮ জুন জাতীয় সংসদে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রাখার কথা বলেন।

তারপর কোটা সংস্কার, বাতিল বা পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠন করেন তিনি।

তৃতীয় দফায় গত ৩০ জুন থেকে শিক্ষার্থীরা সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ কোটা রেখে নিয়োগ প্রক্রিয়া সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। সরকারও কঠোরভাবে তা দমন করে। সরকারপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়।

গত এপ্রিলে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন যখন তুঙ্গে সে সময় ঢাকার শাহবাগ থানায় চারটি ও রমনা থানায় একটি মামলা হয়।

কোটা সংস্কার প্রশ্নে সরকার অবস্থান পরিবর্তন করলে জুলাই মাসে শিক্ষার্থীরা আবারো পথে নামে। নতুন করে তিন মাসের পুরোনো মামলায় বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আট শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সরকারের তরফ থেকে অভিযোগ ওঠে, আন্দোলনে ষড়যন্ত্রকারীরা ঢুকে পড়েছে, তারা দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। টাকার বিনিময়ে ষড়যন্ত্রকারীরা আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।

দুই দফায় ১৫ দিনের রিমান্ডে ছিলেন রাশেদ খান। কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গে।

“আমাকে বারবারই জিজ্ঞাসা করা হচ্ছিল বিএনপি-জামাতের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ আছে কি না। কারণ, আমি ছাড়া নেতাদের প্রায় সবাই ছাত্রলীগের নেতা বা কর্মী। আমাদের অ্যাকাউন্টগুলোও চেক করা হয়েছে,” রাশেদ বলেন।

তিনি আরও জানান, টানা চার মাস আন্দোলন চলেছে। সারাদেশের শিক্ষার্থীরা মোবাইল অ্যাকাউন্টে ১০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত দিয়েছে। মোট খরচ হয়েছিল সাত লাখ টাকা। তবে গোয়েন্দারা বারবারই ১২৫ কোটি টাকা দেওয়ার প্রস্তাব কেউ করেছিল কি না জানতে চান।

তদন্তে যুক্ত গোয়েন্দা বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাঁরা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রকারীদের যোগ এখনও খুঁজে পাননি। গতকাল ৩ অক্টোবর পর্যন্ত মামলাগুলোর একটিতেও অভিযোগপত্র জমা দেয়নি পুলিশ।

আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নিতে আসলেই কেউ মদদ দিয়েছিল কি না এমন প্রশ্নে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)র মুখপাত্র ও উপকমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, তদন্ত চলছে।

“সবগুলো মামলারই তদন্ত চলছে, ধ্বংসাত্মক কাজে যারা জড়িত ছিল তাঁদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার ব্যাপারে পুলিশ কাজ করছে,” মাসুদুর রহমান বলেন।

রাতে শাহবাগে অবস্থান

মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাতিল করে সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রাখার দাবিতে বুধবার রাতে রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কমান্ড নামে একটি সংগঠন।

‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মো. সাজ্জাদ হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক রাশেদুজ্জামান শাহীন এবং ঢাকা মহানগর কমিটির সভাপতি জোবায়দা হক গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত মুক্তিযোদ্ধা এবং তাঁদের সন্তানেরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না। এই সিদ্ধান্ত মুক্তিযোদ্ধা এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের হৃদয়ে আঘাত করেছে।

অন্যদিকে ৫ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটা বহালের জন্য সরকারকে তিন দিনের সময় বেঁধে দিয়েছে আদিবাসী কোটা সংরক্ষণ পরিষদ নামে আরেকটি সংগঠন। তিন দিনের মধ্যে নিশ্চয়তা না পেলে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা অধ্যুষিত এলাকায় অর্ধদিবস হরতাল ও ছাত্র ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন জেসমিন পাপড়ি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন