ইসলামের নবীর ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশের প্রতিবাদ: ফ্রান্সের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবিতে ঢাকায় বিক্ষোভ

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2020-10-27
Share
201027_BD-France-protest_1000.jpg ফ্রান্সে ইসলামের নবীর ব্যাঙ্গচিত্র প্রদর্শনের প্রতিবাদে ‘ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’র ঢাকায় ফ্রান্স দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচির মিছিল শান্তিনগর মোড় পৌঁছালে পুলিশ বাধা দেয়। ২৭ অক্টোবর ২০২০।
[ফোকাস বাংলা]

ইসলামের মহানবী হযরত মুহাম্মদকে ব্যঙ্গ করে কার্টুন প্রকাশ ও এর পক্ষে অবস্থান নেয়ায় ফ্রান্সের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবিতে মঙ্গলবার ঢাকায় ফরাসী দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচি পুলিশ আটকে দিয়েছে।

বিক্ষোভকারীরা ফ্রান্সের পণ্য বর্জন করার জন্য দেশবাসীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।

পল্টন থানার তদন্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক বেনারকে বলেন, “একটি দূতাবাস ঘেরাও করতে ইসলামী আন্দোলন নামে একটি সংগঠনের বিক্ষোভ মিছিল শান্তিনগরে আটকানো হয়। প্রথমে তাঁরা ​ব্যারিকেড অতিক্রম করার চেষ্টা করলেও আলাপ–আলোচনার মাধ্যমে পরে শান্ত হন। এরপর সংগঠনের নেতা–কর্মীরা সেখানে মোনাজাত করে ফিরে গেছেন।”

বিক্ষোভ কর্মসূচিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর মুফতি সৈয়দ রেজাউল করিম বলেন, “ফ্রান্সে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নবী (সা.) এর ব্যঙ্গচিত্র কার্টুন প্রকাশ করায় সারা বিশ্বের মুসলমানদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। গোটা বিশ্বে ফ্রান্সের পণ্য বর্জনের মাধ্যমে তাদের উচিত জবাব দিতে হবে।”

অচিরেই বাংলাদেশে জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডেকে নিন্দা প্রস্তাব নেওয়ার পাশাপাশি দেশটির সাথে সকল প্রকার কূটনৈতিক সর্ম্পক ছিন্ন করার দাবি জানান তিনি।

তবে এই বিক্ষোভ সম্পর্কে মন্তব্য করতে রাজি হননি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন।

তিনি বলেন, “আমরা আশা করব কেউ কারো ধর্ম বিশ্বাসে আঘাত দেবে না। এই ব্যাপারে সবাই যেন ধৈর্যশীল হয়।”

এ বিষয়ে ঢাকায় যোগাযোগ করা হলে ফ্রান্স দূতাবাসের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

ইসলামি চিন্তাবিদরা বলছেন, ইসলামের অবমাননা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে তার পৃষ্ঠপোষকতা করা অত্যন্ত নিন্দনীয়। শান্তিপূর্ণভাবে এর প্রতিবাদ জানাতে হবে। তবে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ব্যাপারেও দ্বিমত পোষণ করেন তাঁরা।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. শামছুল আলম বেনারকে বলেন, “আল্লাহর রাসুলকে কেউ অপমান করুক সেটা কোনো মুসলমান বরদাশত করবে না। তবে প্রতিবাদ করতে হবে নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবে। ইসলাম যে শান্তির ধর্ম সেটাও প্রতিবাদের মধ্যে প্রমাণ রাখতে হবে।”

“পণ্য বর্জনের ডাক শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি। কিন্তু দূতাবাস ঘেরাও কিংবা হঠাৎ করে কূটনৈতিক সম্পর্ক বর্জনের দাবি জানানো সঠিক নয়। কারণ, ফ্রান্স জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য এবং বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র। পৃথিবীতে দেশটির গুরুত্ব আছে,” বলেন তিনি।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের উচিত ফ্রান্সের এই কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানানো। রাষ্ট্র কথা বললে সাধারণে মানুষের ক্ষোভ অনেকটাই প্রশমিত হবে।”

এদিকে “ফ্রান্সের আচরণ অত্যন্ত নিন্দনীয়,” বলে মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহম্মদ শফিকুর রহমান।

তিনি বেনারকে বলেন, “সমাজে সকল ধর্মই থাকবে। তবে সবাইকে সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।”

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, গত ১৬ অক্টোবর প্যারিসের শহরতলী এলাকায় এক স্কুল শিক্ষককে গলা কেটে হত্যা করে ১৮ বছরের এক মুসলিম কিশোর।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ওই শিক্ষক ক্লাসে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আলাপকালে শিক্ষার্থীদের ইসলামের নবীর কার্টুন দেখিয়েছিলেন। এরপরই তাঁকে হত্যা করা হয়।

বছর পাঁচেক আগে ইসলামের নবীর বিতর্কিত কার্টুন ছাপানোর পর ফ্রান্সের ব্যঙ্গাত্মক ম্যাগাজিন শার্লি এবদোতে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। সাম্প্রতিক শিক্ষক হত্যার ঘটনার পরে আবারও সেই কার্টুন ছাপায় শার্লো এবদোতে।

এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠলেও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বিষয়টির পক্ষ নিয়ে জানান, তিনি হজরত মুহাম্মদের বিতর্কিত কার্টুন ছাপানো নিয়ে নিন্দা জানাবেন না। পাশাপাশি বিচ্ছিন্নতাবাদী ও এসব হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেন তিনি।

ফরাসি প্রেসিডেন্টের এই অবস্থানের প্রতিবাদে আরব উপসাগরীয় অঞ্চলসহ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ফ্রান্সের পণ্য বর্জনের ডাক দেয়। ফলে বহু বিশ্বখ্যাত চেইন শপসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ফরাসি পণ্য বিক্রি বন্ধ করেছে। তবে আরব দেশগুলোর প্রতি পণ্য বর্জন বন্ধের অনুরোধ জানিয়েছে ফ্রান্স।

ফ্রান্স দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচি

পূর্বঘোষিত এই কর্মসূচিতে যোগ দিতে সকাল থেকেই বায়তুল মোকাররম এলাকায় দলটির কয়েক হাজার নেতাকর্মী জড়ো হন। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে তাঁরা বিশাল মিছিল নিয়ে ফ্রান্স দূতাবাস অভিমুখে রওনা হন।

তবে দূতাবাস থেকে অন্তত ৮ কিলোমিটার দূরে শান্তিনগর এলাকায় কাঁটাতারের ব্যারিকেড দিয়ে মিছিলের গতিরোধ করে পুলিশ। সেখানে পুলিশ ও মিছিলকারিদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হয়।

এই বিক্ষোভে ফ্রান্সের পতাকা এবং দেশটির প্রেসিডেন্টে ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর গলায় জুতার মালা পরিয়ে তাঁর কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়।

ফ্রান্সের সাথে কূটনেতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ফ্রান্স সরকারের বিরুদ্ধে নিন্দা জানানোর দাবিসহ মোট পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর।

সমাবেশ থেকে আগামী ২৯ অক্টোবর সারাদেশে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিলের ঘোষণা দেওয়া হয়।

দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক

ফ্রান্স বাংলাদেশের অন্যতম ব্যবসায়িক অংশীদার। বিশেষ করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম ক্রেতা ইউরোপের এই দেশটি।

বাংলাদেশ ফ্রান্সে তৈরি পোশাক, হিমায়িত খাদ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে থাকে। দেশটি থেকে বাংলাদেশে আমনাদির মধ্যে রয়েছে রাসায়নিক, সুগন্ধি, প্রসাধনসামগ্রী, ফার্মাসিটিক্যালস ও কৃষিভিত্তিক পণ্য।

বাংলাদেশে ফরাসী জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে লাফার্জ সিমেন্ট, টোটাল গ্যাস সিলিন্ডার, বিক রেজর, কসমেটিকস গার্নিয়ার ও লরিয়েল এবং মেডিসিন প্রোডাক্ট সানোফি।

গত ২৪ অক্টোবর বেসরকারি সময় টেলিভিশনের এক প্রতিবেদনে ফ্রান্সে বাংলাদেশর রাষ্ট্রদূত কাজী ইমতিয়াজ হোসেনকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে ফ্রান্সে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি ছিল ১০৭ কোটি (১.০৭ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য।

এর মধ্যে ৯০ ভাগই তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল। বাকিগুলোর মধ্যে রয়েছে বাইসাইকেল, চিংড়ি, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য।

২০১৩ সালে ফ্রান্স সরকার ঢাকায় তাদের বিজনেস অফিস খুলেছে। লাফার্জের বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগ রয়েছে। ফরাসী কোম্পানি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট তৈরি করছে। চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি নামে শোধনাগারটি ফ্রান্সের তৈরি।

নিন্দা অব্যাহত

মঙ্গলবার বামপন্থী মোর্চা গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি এবং নির্বাহী সমন্বয়কারী (ভারপ্রাপ্ত) আবুল হাসান রুবেল যৌথ বিবৃতিতে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্স ইমানুয়েল ম্যাক্রোর মুসলিম বিদ্বেষী বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানান।

তাঁরা বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে সরকারি ভবনে ইসলামের নবীর ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শন করা অন্যায়। দেশটির প্রেসিডেন্ট যে ভাষায় কথা বলেছেন তা মুসলমানদের জন্য অপমানজনক এবং উস্কানিমূলক।

একই বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ-মিছিল করেছে ইসলামী ছাত্র মজলিস। মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত সমাবেশ শেষে এক সংক্ষিপ্ত বিক্ষোভ মিছিলও বের করে তারা।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন