Follow us

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা, বন্ধ ঘোষণা

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2019-11-05
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতির অভিযোগে উপাচার্যকে অপসারণের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের হামলায় আহত এক ছাত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ৫ নভেম্বর ২০১৯।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতির অভিযোগে উপাচার্যকে অপসারণের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের হামলায় আহত এক ছাত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ৫ নভেম্বর ২০১৯।
[বেনারনিউজ]

দুর্নীতির অভিযোগে উপাচার্যকে (ভিসি) অপসারণের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের হামলার জের ধরে উত্তাল হয়ে উঠেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)।

সাভারে অবস্থিত দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়টি কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করলেও শিক্ষার্থীরা নির্দেশ অমান্য করে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার রহিমা কানিজ মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটায় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের কথা জানান।

“বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা সিন্ডিকেট এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে,” বেনারকে বলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান।

বন্ধ ঘোষণার পর শিক্ষার্থীদের মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে আবাসিক হল ছাড়ার নির্দেশ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরে এক বিজ্ঞপ্তি জারি করে আরও এক ঘণ্টা সময় বাড়ানো হয়। হল ছেড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলনকারীদের সাথে একাত্ম হতে শুরু করে।

রাত এগারোটায় এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত ক্যাম্পাসে ছাত্রবিক্ষোভ চলছিল। কয়েকটি ছাত্রীহল থেকে বের হয়ে এসে ছাত্রীরা আন্দোলনে যোগ দেন। তাঁরা উপাচার্যের বাসভভন ঘেরাও করে রাখেন।

“শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। হল থেকে বের করে দেওয়া এবং বের হয়ে আসা ছাত্রছাত্রীরা জড়ো হচ্ছে,” বেনারকে বলেন আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও ছাত্রফ্রন্টের (মার্ক্সবাদী) জাবি শাখার সভাপতি মাহাথির মোহাম্মদ।

জাবি প্রক্টর ফিরোজ বলেন, “সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত সবাইকেই মানতে হবে। যেহেতু আমরা বন্ধ ঘোষণা করেছি, এখন যদি এটা না কেউ মানে, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ক্যাম্পাসের দায়িত্ব দিয়ে দেবো। তারাই বিষয়টি দেখবে।”

“কোনো তৃতীয় পক্ষ এই অবস্থার সুযোগ নিতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ে সুষ্ঠু পরিস্থিতি বজায় রাখার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে,” যোগ করেন সরকার ও রাজনীতি বিভাগের এই সহযোগী অধ্যাপক।

“প্রক্টর নিজেই বলেন ক্যাম্পাস আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দিতে হবে, তাঁর মানে কি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ? —এমন প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনের সমন্বয়ক ও মুখপাত্র রায়হান রাইন।

জাবির দর্শন বিভাগের এই অধ্যাপক বেনারকে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিয়ে বা মারধর করে কীভাবে তাঁরা টিকে থাকার কথা ভাবেন, সেটাই আমার কাছে বিস্ময়কর লাগে। এই পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চালানো মানেই চরম ব্যর্থতা।”

ছাত্রলীগের হামলা, ভিসির সাফাই

জাবি ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলামকে বাসভবনে অবরুদ্ধ করে রাখা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালান।

এরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনিক ভবনে গিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ভিসি বলেন, “আমার সহকর্মী, কর্মকর্তা কর্মচারীসহ সব ছাত্রছাত্রী, বিশেষ করে ছাত্রলীগের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। কারণ তারা দায়িত্ব নিয়ে এ কাজটি করেছে।”

“এটিকে আপনি হামলা বলতে পারেন, আমি বলব না। এটি গণ-অভ্যুত্থান, আমার কোনো নির্দেশে তারা (ছাত্রলীগ) করেনি। শুধু শারীরিক ধাক্কাধাক্কি কি হামলা বলা যাব? যদি হামলা হয়ে থাকে, সেটি প্রক্টর দেখবেন,” সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন তিনি।

প্রক্টর ফিরোজ বেনারকে বলেন, “সেখানে দুটো পক্ষ মুখোমুখি ছিল। ধাক্কাধাক্কি যে হয়েছে সেটাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। দুই পক্ষেই অনেক সংখ্যক মানুষ ছিলেন বলে আমরা (জাবি প্রশাসন) সামলাতে পারিনি।”

“বিশ্ববিদ্যালয় খুললে, সবকিছু দেখেশুনে, খোঁজ-খবর নিয়ে এ বিষয়ে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে,” বলেন তিনি।

হামলায় নেতৃত্বদানকারী জাবি শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি জুয়েল রানা ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারকে বলেন, “ভিসির পদত্যাগের দাবিতে যারা আন্দোলন করছে, ওরা শিবিরের কর্মী। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে ওদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য খুঁজে বের করার আহবান জানাই।”

“আমাদের চিন্তা করতে হবে কারা, কেন, কীভাবে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে চায়,” উল্লেখ করে ভিসিও বলেন, “তারা (ছাত্রলীগ) এত দিন ধৈর্য ধরে রেখেছে, মাঠে নামেনি। কিন্তু শিবির যখন এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে, তখন প্রতিবাদ করে যথাযথ ভূমিকা পালন করেছে।”

হামলার শিকার মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ডাকে ছাত্রলীগ এসে আমাদের যেভাবে পিটিয়েছে, বিশেষ করে ছাত্রীদের যেভাবে পেটানো হয়েছে ক্যাম্পাসের ইতিহাসে তা নজিরবিহীন।”

“এ ঘটনায় ভিসি এবং ছাত্রলীগের প্রতি ক্যাম্পাস জুড়ে যে ঘৃণা তৈরি হয়েছে, সেটার সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তাদের নেই। এই ঘৃণার রোষ থেকে নিজেদের বাঁচানোর জন্যই তারা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে আমাদের হলগুলো খালি করাতে বাধ্য করেছে,” বলেন তিনি।

তিনি জানান, ছাত্রলীগের হামলায় আহত ১২ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছে এবং স্থানীয় এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে ২০ জনকে।

“হামলা চলাকালে উপাচার্যপন্থী শিক্ষক-কর্মকর্তারা ‘ধর ধর’ ও ‘জবাই কর’ স্লোগান দিয়েছেন। ভিসির বাসভবনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সামনেই ছাত্রলীগ শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের পিটিয়েছে, তারা নিষ্ক্রিয় ছিল,” বলেন রায়হান রাইন।

যে পথে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ

অধ্যাপক রায়হান বেনারকে বলেন, “তারা সশস্ত্র হামলা করে আমাদের উঠিয়ে দিতেই পারে। এর দ্বারা আন্দোলন সাময়িকভাবে বন্ধও হয়তো হবে, কিন্তু তা আন্দোলনের যৌক্তিকতাকে নস্যাৎ করতে পারবে না।”

“শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ঠেকাতে গিয়ে ইতিমধ্যে আমরাও (শিক্ষক) আহত হয়েছি,” উল্লেখ করে রায়হান জানান, “এ কারণে আমরা এখন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়েই বেশি ভাবছি। তাদের জীবন যাতে ঝুঁকির মুখোমুখি না হয়, সেভাবেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে ভিসি ও ছাত্রলীগের আঁতাতে দুর্নীতি হওয়ার অভিযোগের তদন্তের দাবিতে প্রায় তিন মাস আগে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ শিরোনামে এই আন্দোলন শুরু হয়। দাবি পূরণ না হওয়ায় গত ২ অক্টোবর থেকে ভিসিকে অপসারণের দাবি তোলেন আন্দোলনকারীরা।

চলমান পরিস্থিতি নিয়ে সোমবার দুপুরে তাঁদের সাথে বৈঠক করেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। কিন্তু সেই বৈঠক থেকে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো প্রশাসনিক ভবনের সামনে তৈরি করা উপাচার্য অপসারণ মঞ্চ থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় সন্ধ্যা সাতটার দিকে থেকে ভিসিকে বাসভবনে অবরুদ্ধ করে ফেলে আন্দোলনকারীরা। তিনি অপসারিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে বাসভবনে অবরুদ্ধ করে রাখা হবে বলেও তখন সাংবাদিকদের জানান আন্দোলনের সমন্বয়ক রায়হান রাইন।

পরে মঙ্গলবার দুপুরে হামলার শিকার হওয়ার পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “হামলাবাজ উপাচার্যকে দ্রুত সরিয়ে নিতে সরকারের কাছে দাবি জানাই।”

“প্রথমে উপাচার্যপন্থী শিক্ষকদের একটি দল আন্দোলনরতদের ওপর হামলার চেষ্টা চালায়। এতে ব্যর্থ হয়ে তারা ছাত্রলীগ পাঠায়,” যোগ করেন রাইন।

অন্যদিকে “মুষ্টিমেয় কয়েকজন ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করেছে,” উল্লেখ করে ভিসি বলেন, “একটা মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে আমাকে অসম্মান ও অপদস্থ করা হয়েছে। যদি কোনও প্রমাণ থাকে, তাহলে যা বিচার হবে তা মেনে নেব।”

টানা ১১ দিন ধরে প্রশাসনিক ভবন অবরোধ ও দশম দিনের মতো সর্বাত্মক ধর্মঘট পালন করছিল আন্দোলনকারীরা।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন