Follow us

স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় তিন শিক্ষক বরখাস্ত

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2018-12-05
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
অরিত্রীর আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারীদের বিচারের দাবিতে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ করে ভিকারুননিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা। ৫ ডিসেম্বর ২০১৮।
অরিত্রীর আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারীদের বিচারের দাবিতে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ করে ভিকারুননিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা। ৫ ডিসেম্বর ২০১৮।
[নিউজরুম ফটো]

ঢাকার ভিকারুননিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যায় ঘটনায় স্কুল কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত একটি তদন্ত কমিটি। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আন্দোলনের মুখে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে বুধবারেই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ তিন শিক্ষককে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাঁদের বেতন ভাতার সরকারি অংশও (এমপিও) স্থগিত করা হয়েছে।

বুধবার সন্ধ্যায় জরুরি এক বৈঠকের পরে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা কমিটির সভাপতি আশরাফ তালুকদার বেনারকে বলেন, “শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী পরিচালনা পরিষদের সভা ডেকে অভিযুক্ত তিন শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের বিষয়টি সবাইকে চিঠি দিয়ে জানানো হবে।”

আগামী কয়েক দিনের মধ্যে গভর্নিং বডির সভা ডেকে যোগ্য শিক্ষককে নতুন করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে অরিত্রীর বাবা দিলীপ অধিকারীর করা মামলায়ও বহিষ্কার হওয়া ওই তিনজনকে আসামি করা হয়েছে। এরা হলেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস, প্রভাতি শাখার শিফট ইনচার্জ জিনাত আরা এবং ক্লাস টিচার হাসনা হেনা।

দণ্ডবিধির ৩০৫ ধারায় করা এই মামলায় সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড, সর্বনিম্ন শাস্তি দশ বছর কারাদণ্ড, সেই সঙ্গে অর্থদণ্ড। এ ছাড়া আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া যাবে।

এদিকে অভিযুক্ত ওই তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে গতকাল বিকেলে র‍্যাবের মহাপরিচালক ও ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনারকে চিঠি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অরিত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় বুধবারও দ্বিতীয় দিনের মতো বেইলি রোডের স্কুল ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল। ‘টক অব দ্যা টাউনে’ পরিণত হওয়া বিষয়টি নিয়ে বুধবার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল নাহিদ।

এই ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের করা তদন্ত প্রতিবেদনের সারমর্ম তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, “তদন্ত কমিটি তিন শিক্ষককে প্ররোচক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এরপর পুলিশও হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারবে না, ব্যবস্থা নিতেই হবে।”

গত সোমবার ভিকারুননিসা নুন স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী অধিকারী তার শান্তিনগরের বাসায় আত্মহত্যা করে। এর আগে রোববার নবম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা দিতে গিয়ে নিষেধ সত্ত্বেও হলে মোবাইল ফোন সঙ্গে নেওয়ায় অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগ এনে পরীক্ষার হল থেকে তাকে বের করে দেওয়া হয়।

অরিত্রীর স্বজনরা জানান, পরদিন স্কুল কর্তৃপক্ষ অরিত্রীর বাবা-মাকে ডেকে নিয়ে ‘অপমান’ করেন। বাবা-মা ও অরিত্রী মাফ চাইলেও অধ্যক্ষ তাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। বাবা-মায়ের ‘অপমান সইতে না পেরে’ ঘরে ফিরে আত্মহত্যা করে এই কিশোরী।

বুধবার শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে ভিকারুননিসার সব শাখার ক্লাস ও পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়।

তবে এদিন সন্ধ্যায় বেইলি রোড শাখার শিক্ষক মুশতারি সুলতানা সাংবাদিকদের জানান, পরিচালনা পর্ষদের সভায় ভিকারুননিসায় চলমান বার্ষিক পরীক্ষার দুই দিনের সময় নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বৃহস্পতিবারের পরীক্ষা পরদিন শুক্রবার এবং ৫ তারিখের পরীক্ষা ১১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান তিনি।

ভিকারুননিসায় নানা অসংগতি

সংবাদ সম্মেলনে অরিত্রীর আত্মহত্যার ঘটনাকে ‘খুবই অমানবিক’ হিসেবে বর্ণনা করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- বাবা-মা আবেদন নিয়ে আসলে ওই তিন শিক্ষক তাঁদেরকে ভয়ভীতি দেখান। পিতা-মাতার সাথে অধ্যক্ষ, শিফট ইনচার্জের নির্মম ও নির্দয় আচারণ অরিত্রীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে এবং তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে।”

“যার দায় কোনভাবেই প্রতিষ্ঠানের প্রধান, শিফট ইনচার্জ এবং শ্রেণি শিক্ষিকা এড়াতে পারেন না।”

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি এই প্রতিষ্ঠানে আরো অনিয়ম এবং অসঙ্গতি লক্ষ করা গেছে।

তিনি বলেন, “ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে বহুদিন ধরে অধ্যক্ষ নেই, একজনকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও তারা নিয়ম অনুসরণ করে অধ্যক্ষ নিয়োগের ব্যবস্থা নেয়নি, এটাও একটা বড় ধরনের অনিয়ম। নিয়মের বাইরেও তারা শিক্ষার্থী ভর্তি করে।”

শিক্ষামন্ত্রী জানান, তিনি প্রথম শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেন যখন, তখন ওই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করতে ১০ লাখ টাকাও লাগত। সেটা বন্ধ করতে লটারি ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু এখন যত শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমোদন পায়, তার চেয়ে অনেক বেশি ভর্তি করে। তার মানে অন্য কোনো পথে করে, তা বোঝাই যায়।

এসব অনিয়ম দূর করতে হাইকোর্টের নির্দেশ অনুসারে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করা হবে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী।

একই সঙ্গে তদন্ত কমিটি বলেছে, এ ঘটনায় স্কুল পরিচালনা কমিটির অবহেলা ছিল। বিধায় এ কমিটি বাতিল করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

ভিকারুননিসার পরিচালনা পর্ষদ সম্পর্কে নাহিদ বলেন, “আমরা পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিতে পারি।”

ভিকারুননিসার এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক রানু সরকার বেনারকে বলেন, “নানা ভয়ভীতির কারণে আমরা স্কুলটির বিরুদ্ধে কথা বলতে পারি না। কারণ সেখানে আমার মেয়ে পড়ালেখা করে। আশা করি এবার স্কুল কর্তৃপক্ষের মুখোশ টেনে খোলা হবে। এবং প্রতিষ্ঠানটিতে শৃঙ্খলা ফিরবে।”

বৃহস্পতিবারেও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

অধ্যক্ষ বরখাস্ত হলেও গভর্নিং বডির অপসারণসহ ৬ দফা দাবিতে বৃহস্পতিবারেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ভিকারুননিসার ছাত্রীরা।

শিক্ষার্থীদের পক্ষে নবম শ্রেণির ছাত্রী আনুশকা রায় সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের বলেন, “আমাদের দাবিগুলো হলো- অভিযুক্তদের আত্মহত্যার প্ররোচণায় দণ্ডবিধি ৩০৫ ও ৩০৬ ধারায় শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, ভিকারুননিসা স্কুলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ করতে হবে, কথায় কথায় বহিষ্কারের ভয় দেখানো যাবে না এবং অপরাধ অনুযায়ী শাস্তির জন্য ডিটেনশন পলিসি চালু করতে হবে, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মানসিক সুস্থতার জন্য পরামর্শক নিয়োগ এবং গভর্নিং বডির পদত্যাগ ও অরিত্রির বাবা-মা’র সঙ্গে দুর্ব্যবহারের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে।

১১ মাসে ১৭১ জন নির্যাতিত

এদিকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত শিক্ষকদের কাছে ১৭১ জন শিক্ষার্থী শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। যার মধ্যে দুজন শিক্ষার্থী নির্যাতনের পর আত্মহত্যা করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজ বেনারকে বলেন, “শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করে উচ্চ আদালত নির্দেশনা দিলেও তা অব্যাহত রয়েছে।”

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের শাস্তি বন্ধের জন্য সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন