Follow us

রেলওয়ে থানায় নারীকে গণধর্ষণের অভিযোগ দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2019-08-07
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছেন এক নারী। ০৩ জুন ২০১৯।
ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছেন এক নারী। ০৩ জুন ২০১৯।
[মেঘ মনির/বেনারনিউজ]

গণধর্ষণের অভিযোগের ঘটনায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উসমান গণি পাঠান ও উপপরিদর্শক (এসআই) নাজমুল হককে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করা হয়েছে। বুধবার তাঁদের ওই থানা থেকে প্রত্যাহার করে পাকশী রেলওয়ে জেলায় সংযুক্ত করা হয়েছে।

খুলনা রেলওয়ে থানায় (জিআরপি) এক নারীকে দল বেঁধে ধর্ষণের অভিযোগের ঘটনায় তাঁদের প্রত্যাহার করা হয়।

বুধবার ওই থানার ওসি উসমান গণি পাঠান ও উপপরিদর্শক (এএসআই) নাজমুল হককে পাকশী রেলওয়ে জেলায় সংযুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কুষ্টিয়া রেলওয়ে সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার ফিরোজ আহমেদ।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে ওই কর্মকর্তাদের খুলনা জিআরপি থানা থেকে প্রত্যাহার করে পাকশী জেলা রেলওয়ে পুলিশ লাইনে নেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, শনিবার মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো এক তরুণীকে (২১) খুলনার মহানগর হাকিম আতিকুস সামাদের আদালতে আনে রেলওয়ে পুলিশ। সেখানেই নারীটি বিচারকের সামনে অভিযোগ করেন যে, থানায় আটক অবস্থায় কয়েকজন পুলিশ দলবেঁধে তাঁকে ধর্ষণ করেছে।

ওই তরুণী আদালতকে জানান, গত ২ আগস্ট সন্ধ্যায় খুলনা রেলস্টেশন থেকে তাঁকে আটক করা হয়। রাতে রেলওয়ে থানায় ওসি উসমান গণি পাঠান, এসআই গৌতম কুমার পাল, এএসআই নাজমুল হক এবং কনস্টেবল মিজান ও হারুন তাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করেন।

অভিযোগ শুনে ওই নারীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক। সোমবার খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর মেয়েটিকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

এ ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে পুলিশ, যার নেতৃত্বে রয়েছেন সহকারী পুলিশ সুপার ফিরোজ। তিনি সাংবাদিকদের জানান, “এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়ার প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার থেকে খুলনা জিআরপি থানার ওসি উসমান গণি পাঠানসহ ৫ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে।”

“তাঁদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা ও গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। দুজনকে ক্লোজড করা হয়েছে। বাকি তিন পুলিশ সদস্যের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি,” বলেন তিনি।

সহকারী পুলিশ সুপার ফিরোজ জানান, অভিযোগকারী নারী বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তাঁর সাথে কথা বলার অনুমতি চেয়ে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে সকল পক্ষের সাথেই কথা বলা হবে।

পুলিশ বেপরোয়া

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, অপরাধ করার পরেও উপযুক্ত শাস্তি না পাওয়ায় পুলিশ দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা অনেকটাই উঠে গেছে।

মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সালমা আলী বেনারকে বলেন, “সংশ্লিষ্ট পুলিশদের প্রত্যাহার করে লাভ নেই। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। এই প্রত্যাহার নামমাত্র। লোক দেখানো।”

“পুলিশের এত অপকর্ম যেন থামছেই না। শাসকগোষ্ঠীকেও তারা মানতে চাইছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অপরাধ প্রবণতাই যখন এত বেড়ে যায়, তখন দেশের আইনশৃঙ্খলা অবস্থা সহজেই অনুমেয়। সরকার এদের কীভাবে সামাল দেবে, সেটা ভাবা জরুরি।”

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বেনারকে বলেন, “গুরুতর অপরাধের লঘু শাস্তি হয় বলে অপরাধী পুলিশরা পার পেয়ে যায়। যার কাছে সুরক্ষার জন্য যাচ্ছেন সে যখন ভক্ষক হয়ে যায় তখন পুরো ব্যবস্থার উপরে মানুষের চরম অনাস্থা চলে আসে।”

“আমরা দ্রুততার সাথে সেই পর্যায়ে যাচ্ছি। এটি দারুণ উদ্বেগজনক। বিষয়টি নিয়ে রাষ্ট্র এবং সরকারকে গভীরভাবে চিন্তা করা দরকার। এই কর্মকাণ্ডগুলোর ক্ষেত্রে প্রকৃত অর্থে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে,” বলেন তিনি।

রাতভর ধর্ষণ করে পাঁচ পুলিশ

ভুক্তভোগীর বড় বোন হোসনে আরা বেনারকে বলেন, গত ২ আগস্ট সন্ধ্যায় আমার বোন তার আড়াই বছরের সন্তানকে নিয়ে যশোর থেকে ট্রেনে করে খুলনায় পৌঁছান। স্টেশনে নামার পর রেল পুলিশের সদস্যরা তাঁকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।

তিনি জানান, খবর পেয়ে তার ভাই সেখানে গেলে বোনকে ছাড়াতে এক লাখ টাকা দাবি করে পুলিশ। এত টাকা দিতে অসামর্থ্যের কথা জানালে আটক নারী এবং তাঁর ভাইকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে তারা। রাত ১০টার দিকে ওই নারীর সন্তানকে তাঁর মা এবং ভাইয়ের হেফাজতে দিয়ে তাঁদেরকে থানা থেকে বের করে দেয়।

তিনি বলেন, পরদিন সকালে আমার বোনকে কারাগারে পাঠানো হয়। আমি সেখানে তার সাথে দেখা করতে গেলে আমার বোন জানায়, ওই রাতে ওসিসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য তাকে রাতভর ধর্ষণ করে। তাকে পাঁচ বোতল ফেনসিডিলসহ গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। অথচ এসব কিছুই তার কাছে ছিল না। সে ডাক্তার দেখিয়ে যশোর থেকে ফিরছিল।

হোসনে আরা বলেন, “আমার বোনকে যেদিন আটক করা হয় সে সুস্থ ছিল। অথচ আদালতে দেখলাম সে অসুস্থ। ধর্ষণের পাশাপাশি তাঁকে অনেক মারধরও করেছে পুলিশ।”

তিনি জানান, আমরা বোনকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ জানিয়েছে তার মেডিকেল রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত মামলা নেবে না।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন