Follow us

পশ্চিমবঙ্গে খ্রিস্টান সন্ন্যাসিনী ধর্ষণ: ছয় অভিযুক্ত দোষী সাব্যস্ত

পরিতোষ পাল
কলকাতা
2017-11-07
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
স্কুলের প্রবীণ সন্ন্যাসিনী ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে মোমবাতি মিছিলে অংশগ্রহণ করে পশ্চিমবঙ্গের রাণাঘাটের কনভেন্ট অব জেসাস এন্ড মেরী স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা। ১৫ মার্চ ২০১৫।
স্কুলের প্রবীণ সন্ন্যাসিনী ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে মোমবাতি মিছিলে অংশগ্রহণ করে পশ্চিমবঙ্গের রাণাঘাটের কনভেন্ট অব জেসাস এন্ড মেরী স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা। ১৫ মার্চ ২০১৫।
AP

পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার রাণাঘাটের গাংনাপুরের একটি কনভেন্ট স্কুলে ৭২ বছরের এক খ্রিস্টান সন্ন্যাসিনীকে ধর্ষণ ও ডাকাতির মামলায় আটক হওয়া ছয় অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত। কলকাতার নগর দায়রা আদালতের অতিরিক্ত বিচারক কুমকুম সিংহ মঙ্গলবার এই মামলায় রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে নজরুল ইসলাম ওরফে নজু নামে একজনকে ধর্ষণের অভিযোগে ও বাকিদের ডাকাতির ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত। বুধবার দোষী ব্যক্তিদের সাজা ঘোষণা করা হবে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রবীণ সন্ন্যাসিনীর সঙ্গে যা হয়েছে তা লজ্জাজনক। তাঁকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। তবে গণধর্ষণ হয়নি। মেডিকেল রিপোর্ট, সিসিটিভি ফুটেজ, ফরেনসিক রিপোর্ট ও অন্যান্য সাক্ষ্য প্রমাণ খতিয়ে দেখে বিচারক এই রায় দিয়েছেন।

পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে, গোপাল সরকারের বাড়িতেই কনভেন্টে ডাকাতির পরিকল্পনা করেছিল দুষ্কৃতকারীরা। বাংলাদেশ থেকে এসে একাধিক দুষ্কৃতকারী গোপাল সরকারের বাড়িতে আশ্রয় নিত। সে কারণে আদালত তাঁকেও দোষী সাব্যস্ত করেছে।

অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সিআইডি ফৌজদারি আইনের ১২০ (বি) ধারায় অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, ৩৯৫ ধারায় ডাকাতি এবং ৩৭৬ (বি) ধারায় গণধর্ষণের মামলা দায়ের করে। দুই দফায় পুলিশ আদালতে চার্জশিট দেয়। রায় ঘোষণার সময় সব কটি ধারাতে অপরাধীদের দোষী সাব্যস্ত করা হলেও গণধর্ষণের ধারাটি বদলে শুধুমাত্র ধর্ষণ অর্থাৎ ৩৭৬ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে প্রধান অভিযুক্ত নজরুল ইসলামকে।

সরকারি আইনজীবী দীপক ঘোষ বেনারকে বলেন, “দেড় বছর ধরে মামলার শুনানি হয়েছে। মোট ৪২ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। গত ৩০ অক্টোবর এই মামলার বিচার শেষ হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে পাঁচজনই বাংলাদেশের নাগরিক।”

ছয় অভিযুক্ত হলেন-নজরুল ইসলাম, মিলন কুমার সরকার, ওহিদুল ইসলাম, মহম্মদ সেলিম শেখ, খালেদুর রহমান ও গোপাল সরকার।

ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনা

ঠিক আড়াই বছর আগে ২০১৫ সালের ১৪ মার্চ কলকাতা থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে নদীয়া জেলার রাণাঘাট মহকুমার গাংনাপুরের কনভেন্ট অব জেসাস অ্যান্ড মেরী স্কুলে একদল দুষ্কৃতকারী গভীর রাতে লুটপাট চালায়। এ সময় তারা তিনজন সন্ন্যাসিনীকে লাঞ্ছিত করে। একজন দুষ্কৃতকারী দোতলায় উঠে ৭২ বছরের এক প্রবীণ সন্ন্যাসিনীকে ধর্ষণ করে বলে পুলিশ আদালতে জানায়। ভোর রাতের দিকে দুষ্কৃতকারীরা ১২ লাখ রুপি, একটি মোবাইল ফোন, একটি ল্যাপটপ ও একটি ক্যামেরা নিয়ে এলাকা থেকে চম্পট দেয়।

কলকাতার আর্চবিশপ টমাস ডি সুজা সাংবাদিকদের জানান, দুষ্কৃতকারীরা চ্যাপেলে ঢুকেও লুটপাট চালায় এবং সেখানে থাকা পবিত্র সামগ্রী নষ্ট করে দেয়।

ঘটনার পরপরই ধর্ষিতা সন্ন্যাসিনীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। স্কুল সূত্র জানায়, কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর সন্ন্যাসিনীকে চার্চ কর্তৃপক্ষ দিল্লিতে পাঠিয়ে দেয়।

এই ঘটনা নিয়ে সেই সময় প্রবল চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। ছাত্র-ছাত্রী ও তাদের অভিভাবক এবং স্থানীয় মানুষ বিক্ষোভ প্রকাশ করে জাতীয় সড়ক ও রেল স্টেশন অবরোধ করে। দেশি ও বিদেশি মিডিয়ায় ঘটনাটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।

ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টকে (সিআইডি) এই মামলার তদন্তভার দেওয়া হয়। সিআইডির গোয়েন্দারা স্কুলের সিসিটিভি ভিডিও দেখে দুষ্কৃতকারীদের শনাক্ত করে। এরপর ছয় দুষ্কৃতকারীকে গ্রেপ্তার করে। একজন অবশ্য এখনো পলাতক বলে আদালতে জানানো হয়।

এদিন আদালতে কনভেন্টের বেশ কয়েকজন সন্ন্যাসিনী উপস্থিত ছিলেন। তাদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারকে বলেন, “পুরো ঘটনাই স্কুলের সিসিটিভিতে ধরা ছিল। তাই অভিযুক্তদের শনাক্ত করা কঠিন হয়নি।”

আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাণাঘাট মহকুমা আদালতে প্রথমে বিচার শুরু হলেও স্কুলের নিগৃহীত সন্ন্যাসিনী নিরাপত্তার অভাববোধ করায় কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে বিচার কাজ কলকাতার আদালতে স্থানান্তর করা হয়।

দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা

আদালতের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন কলকাতার আর্চ বিশপ টমাস ডি স্যুজা। তিনি বেনারকে বলেন, “আইন অনুযায়ী অপরাধীদের শাস্তি হয়েছে, এটাই কাম্য। বিচারকের সাজা ঘোষণার দিকে এখন তাকিয়ে রয়েছি।”

তিনি বলেন, “বৃদ্ধা সন্ন্যাসিনীর সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে তা দুর্ভাগ্যজনক। তাঁর সঙ্গে যে অপমানজনক ঘটনা ঘটেছে এ জন্য আমি আগেও দুঃখ প্রকাশ করেছি, এখনো করছি।”

তিনি বলেন, “আমাদের সমাজে এই ধরনের ঘটনা যাতে আর না হয় সে জন্য অনেক চেষ্টা করতে হবে। সকলকে সচেতন করতে হবে। আমরা চাই না এমন ঘটনা আর ঘটুক।”

বিশিষ্ট মনোরোগ চিকিৎসক ডা. গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঘটনাকে ভয়ংকর সামাজিক অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, “মূল্যবোধের অবক্ষয় এই ধরনের ঘটনার পেছনে কাজ করে। সেই সঙ্গে অপরাধীর আক্রমণাত্মক মনোভাবের পরিণতিতেই এই ধরনের ঘটনা ঘটছে।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন