Follow us

ভয়ে ও অভাবে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসছে রোহিঙ্গারা

আবদুর রহমান ও মোহাম্মদ আমিন পিরজাদা
কক্সবাজার, বাংলাদেশ ও জম্মু, ভারত
2019-01-11
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে কাজ শেষে মজুরির জন্য অপেক্ষা করছেন কয়েকজন রোহিঙ্গা নির্মাণ শ্রমিক। ১৪ নভেম্বর ২০১৮।
কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে কাজ শেষে মজুরির জন্য অপেক্ষা করছেন কয়েকজন রোহিঙ্গা নির্মাণ শ্রমিক। ১৪ নভেম্বর ২০১৮।
[এএফপি]

ভারত থেকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের হার সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। জোর করে মিয়ানমার ফেরত পাঠানো হতে পারে এই ভয় এবং অভাবের কারণেই রোহিঙ্গারা ভারত ছাড়ছেন বলে জানিয়েছেন শরণার্থীরা।

ভারতে প্রায় চল্লিশ হাজার রোহিঙ্গা রয়েছেন। গত অক্টোবর ও চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভারত কয়েকজন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার ফেরত পাঠায়। তবে কোনো অপাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত না হলে ভারতে রোহিঙ্গাদের ভয় নেই বলে জানিয়েছেন ভারতীয় কর্মকর্তারা।

চলতি মাসে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা ৭৪ জন রোহিঙ্গাকে পুলিশ আটক করে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে পাঠিয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে বলে জানিয়েছেন উখিয়া কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ মো. রেজাউল করিম।

কুতুপালংএ বর্তমানে ভারত থেকে আসা একশোর বেশি রোহিঙ্গা রয়েছেন জানিয়ে রেজাউল বেনারকে বলেন, “আমরা এখনো এদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করতে পারিনি।”

“তবে এটা সত্য যে সাম্প্রাতিক সময়ে ভারত থেকে একশোর বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। যা অস্বাভাবিক। আরো অনেকেই আসার চেষ্টায় রয়েছেন,” যোগ করেন তিনি।

এদিকে ভারত থেকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের বিষয়টি “আমাদের দেশের জন্য মোটেই ইতিবাচক নয়,” বলে বেনারের কাছে মন্তব্য করেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার।

তিনি বলেন, “এখন এটা নিয়ে কী করা যায় আমরা সেটা ভাবছি।”

ভারতে ভয় ও অভাব

সম্প্রতি ভারত কয়েকটি রোহিঙ্গা পরিবারকে মিয়ানমার ফেরত পাঠানো ও রোহিঙ্গাদের ওপর পুলিশি নজরদারি বাড়ানোর কারণে আতঙ্কিত হয়ে অনেকেই বাংলাদেশ চলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন শরণার্থীরা।

তবে অভাব অনটনের কারণেও কেউ কেউ বাংলাদেশ যেতে চাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন অনেকেই।

ভারতের জম্মু শহরে বসবাস করা রোহিঙ্গা নসরুল্লা করিম বেনারকে বলেন, “আমার মনে হয় রোহিঙ্গা এলাকাগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের তল্লাশি বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেকে ভাবছে যে, তাঁদেরকে জোর করে মিয়ানমার পাঠিয়ে দেয়া হবে। ফলে তাঁদের অনেকেই বাংলাদেশে পাড়ি দেয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গ চলে গেছে।”

নসরুল্লা জানান, সম্প্রতি জম্মু ও সাম্বা জেলার উপকণ্ঠে নারওয়াল এলাকায় পুলিশ রোহিঙ্গা বসতিগুলোতে এসে পরিচয়পত্র পরীক্ষাসহ আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করায় অনেকে ভয় পেয়ে গেছেন।

প্রায় দশ দিন আগে তাঁর এক রোহিঙ্গা প্রতিবেশী গফুর আহমেদ পরিবার নিয়ে বাংলাদেশে চলে গেছেন বলে জানান নসরুল্লা।

তিনি বলেন, “জম্মু এলাকায় পুলিশের অভিযানের কারণে সে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তার মনে হচ্ছিল পুলিশ তাকে জোর করে মিয়ানমার পাঠিয়ে দেবে।”

“গফুর এখানে মুচির কাজ করত। এখানকার আয় দিয়ে সংসার চালানোও অনেক কঠিন ছিল। তার বাংলাদেশ চলে যাবার এটাও একটা কারণ হতে পারে,” যোগ করেন নসরুল্লা।

তবে ভারত থেকে শরণার্থীরা বাংলাদেশে চলে যাবার বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত নন বলে বেনারকে জানিয়েছেন জম্মু পুলিশের ডিভিশনাল কমিশনার সঞ্জীব ভার্মা।

“শরণার্থীরা এখানে নিরাপদ,” জানিয়ে তিনি বেনারকে বলেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ কোনো ধরনের বেআইনি কাজে যুক্ত না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁদের ভয় পাবার কিছু নেই।”

রোহিঙ্গাদের পরিচয়পত্র পরীক্ষা করার বিষয়টি নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ বলে বেনারকে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভারতীয় পুলিশের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

নারওয়েল এলাকায় প্রায় সাত হাজার রোহিঙ্গা রয়েছেন।

সম্প্রতি ভারতের হায়দ্রাবাদ শহর থেকেও কিছু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। তবে সেখানকার বেশিরভাগেরই বাংলাদেশে যাবার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন তাঁরা।

হায়দ্রাবাদের মির মমান পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দা রোহিঙ্গা মোহাম্মদ সেলিম বেনারকে বলেন, “এখানে আমাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না।”

“হয়ত বিশেষ কোনো কারণে কিছু পরিবার বাংলাদেশে চলে গেছে। তবে এখানকার স্থানীয়রা কোনোভাবে আমাদের হয়রানি করে না,” যোগ করেন সেলিম।

শরণার্থী কার্ডসহ আসছেন রোহিঙ্গারা

ভারত থেকে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের অনেকেই নিজে থেকে এসে আশ্রয় নিয়েছেন কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে। এদের বেশিরভাগের সাথেই ভারতে ইউএনএইচসিআর এর দেয়া শরণার্থী কার্ড রয়েছে।

সম্প্রতি ভারতের জম্মু-কাশ্মীর এলাকা থেকে এসে টেকনাফের শামলাপুর রোহিঙ্গা শিবিরে নিজের মামা মোহাম্মদ আইয়ুব আলীর ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন মোহাম্মদ আজিজ উল্লাহ (২৬)। আজিজ মিয়ানমারের মংডু জেলার হাসসুরাত গ্রামের আজিম উল্লাহর ছেলে।

৯ জানুয়ারি শামলাপুর শিবিরে বেনারের সাথে কথা বলেন আজিজ। তাঁর কাছে ইউএনএইচসিআর এর দেয়া একটি শরণার্থী কার্ডও রয়েছে।

আজিজ জানান, খুব ছোটবেলা পরিবারের সঙ্গে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসে টেকনাফের শামলাপুর হাতকলা পাড়া গ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এখানে ১২ বছর থাকার পর তাঁর পরিবার ভারতের জম্মু-কাশ্মীরে চলে যায়। সেখানকার কেরানিটেলা নামক এলাকায় বসবাস শুরু করেন তাঁরা, যেখানে প্রায় তিন হাজারের বেশি রোহিঙ্গা রয়েছেন।

তিনি জানান, সেখানে লোহা তৈরির কাজে দিন মজুরি করে তাঁর সংসার চলত। তবে মজুরির টাকায় সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হতো। তাছাড়া সেখানে সব সময় রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর ভয় কাজ করত।

আজিজ জানান, জম্মু-কাশ্মীর থেকে তিন দিনে কলকাতা পৌঁছান। তারপর এক রাতে ছোট একটি খাল পাড়ি দিয়ে সাতক্ষীরায় সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। পরে সেখান থেকে শামলাপুর রোহিঙ্গা শিবিরে এসে মামার ঘরে আশ্রয় নেন।

স্ত্রীসহ তিন সন্তানকে ভারতে নিজের বাবা-মায়ের কাছে রেখে এসেছেন জানিয়ে আজিজ বলেন, তারাও বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করছে। কেননা সেখানে অভাব বেশি। আর ভারত তাঁদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়ে দেবার কিছুটা ভয়েও রয়েছে।

গত কয়েকদিনে কক্সবাজারের টেকনাফ উনচিপ্রাং ও নাইক্ষ্যংছড়ি তম্রব্রু শূন্যরেখা রোহিঙ্গা শিবিরে ভারত থেকে দুটি পরিবারের ১১ জন রোহিঙ্গা এসে আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন রোহিঙ্গা নেতারা।

তাঁরা জানান, এদের সবার কাছেই ইউএনএইচসিআর এর দেয়া শরণার্থী কার্ড রয়েছে। ভারত তাঁদেরকে জোর করে মিয়ানমার পাঠিয়ে দেবার ভয়েই তাঁরা বাংলাদেশে এসেছেন।

এদিকে ভারত থেকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পরিস্থিতি বোঝার জন্য নয়া দিল্লির সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে বেনারকে জানান কক্সবাজার ইউএনএইচসিআর এর মুখপাত্র ফিরাস আল খাতিব।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন কক্সবাজার থেকে সুনীল বড়ুয়া, ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি ও নয়াদিল্লি থেকে জয়শ্রী বালাসুব্রামানিয়াম।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন