Follow us

আনুষ্ঠানিক শিক্ষা পেতে যাচ্ছে রোহিঙ্গা শিশুরা

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2020-01-28
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
টেকনাফের লেদা শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী দুই রোহিঙ্গা শিশু। ২৬ আগস্ট ২০১৮।
টেকনাফের লেদা শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী দুই রোহিঙ্গা শিশু। ২৬ আগস্ট ২০১৮।
[শরীফ খিয়াম/বেনারনিউজ]

বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত রোহিঙ্গা শিশুরা আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মিয়ানমারের কারিকুলামেই এই শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হবে।

জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত রোহিঙ্গা গণহত্যা রোধে মিয়ানমারকে কিছু করার আদেশ দেওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পরে এই সিদ্ধান্ত এসেছে। রোহিঙ্গা বিষয়ে সরকার গঠিত জাতীয় টাস্কফোর্সের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বিষয়টি নিশ্চিত করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রোহিঙ্গা বিষয়ক সেলের মহাপরিচালক মো. দেলোয়ার হোসেন মঙ্গলবার বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত পদ্ধতি এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।”

“এটুক বলতে পারি, রোহিঙ্গা শিশুদের মিয়ানমারের কারিকুলামে শিক্ষা দেয়া হবে। যাতে মিয়ানমারে ফেরার পরে তারা নিজেদের সেখানে খাপ খাইয়ে নিতে পারে,” বলেন এই মহাপরিচালক।

বাংলাদেশিদের সাথে নয়, বরং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আলাদা করে তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান দেলোয়ার হোসেন।

তিনি বলেন, “এ বিষয়ে ইউনিসেফ আমাদের কাছে বিস্তারিত উল্লেখ করে একটা প্রস্তাব দেবে। সেটা পিরীক্ষা নিরীক্ষা করার পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউনিসেফ বাংলাদেশের কমিউনিকেশন অফিসার ইফতিখার আহমেদ চৌধুরী বেনারকে বলেন, “বর্তমানে ‘লার্নিং সেন্টারের’ মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা দেওয়ার কাজ করে যাচ্ছে ইউনিসেফ। এখন সেখানে রোহিঙ্গা শিশুদের বাংলা, ইংরেজি ও গণিত শিক্ষা দেওয়া হয়।”

“রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে বর্তমানে তিন হাজার ছয়শটিরও বেশি শিক্ষা কেন্দ্র রয়েছে যার মধ্যে আড়াই হাজারের বেশি ইউনিসেফ সমর্থিত। হয়তো এগুলোকে আরো সমৃদ্ধ করে রোহিঙ্গা শিশুদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ দেওয়া হবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রস্তাবনা এখনো তৈরি হয়নি,” বলেন তিনি।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরে মিয়ানমারের সেনাদের হত্যাযজ্ঞ থেকে বাঁচতে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। নুতন পুরাতন মিলিয়ে বর্তমানে শরণার্থী শিবিরগুলোতে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা মানবেতর পরিবশে বসবাস করছেন।

ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী প্রায় ৫ লাখ শিশু কক্সবাজারের আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে বসবাস করছে। এদের মধ্যে ৩ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ৩ লাখ।

বর্তমানে রোহিঙ্গা শিশুরা জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের প্রতিষ্ঠিত অস্থায়ী লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করলেও বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে ব্যবহৃত পাঠ্যক্রমগুলো তাদের পড়ানোর বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, ইউনিসেফ এবং বাংলাদেশ যৌথভাবে পাঠ্যক্রমের কারিকুলাম তৈরি করবে। শুরুতে ১০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি পাইলট প্রোগ্রাম চালু করা হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, রোহিঙ্গা শিশুদের ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত মিয়ানমারের কারিকুলামে পড়ানো করা হবে। তাদেরকে কারিগরি প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে যাতে দেশে ফিরে তারা মিয়ানমারে কাজ করতে পারে।

এই খবরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন রোহিঙ্গারা। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনও বাংলাদেশের প্রসংশা করেছে।

লেদা রোহিঙ্গা শিবিরের একজন নেতা আবদুর রশিদ বেনারকে বলেন, “আমাদের সন্তানরা শিক্ষার আলো পাবে এই খবর আমাদেরকে অত্যন্ত আনন্দিত করেছে। বাংলাদেশের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা আরো বেড়ে গেলো।”

তিনি বলেন, “আমরা জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে পালিয়ে এসেছিলাম। জীবন বাঁচলেও আমাদের সন্তানেরা রাখাইনেও যেমন শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত ছিল, এখানেও তেমন অন্ধকারে বেড়ে উঠছিল। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার এই সুযোগ তাদের আলোকিত জীবন দেবে।”

কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের নেতা মো. শাহজাহান বেনারকে বলেন, “রাখাইনে আমরা বৈষম্যের শিকার ছিলাম। সেখানে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বসহ শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশে শিক্ষার সুযোগ পেলে রাখাইনে ফিরে তারা মাথা উচু করে বাঁচতে পারবে আমাদের বাচ্চারা।”

“এই সিদ্ধান্ত রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নেওয়া কিশোরদের উগ্রপন্থী হওয়ার সম্ভাবনা কমাবে বলে মনে করেন তিনি।

সম্প্রতি কিছু রোহিঙ্গা শিশু নিজেদের পরিচয় গোপন করে বাংলাদেশি পরিচয় দিয়ে কক্সবাজারে স্থানীয় স্কুলে ভর্তি হয়। তাদের পরিচয় জানার পরে সেসব স্কুল থেকে তাদেরকে বের করে দেওয়া হয়। এর পরেই ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা দীর্ঘদিন ধরেই রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল।

রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে বিভিন্ন ইসলামী গোষ্ঠী মাদ্রাসার মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা দিয়ে আসছে।

রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিতের বিষয়ে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

রোহিঙ্গা শিশুদের পড়াশুনা ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং ইতিবাচক অঙ্গীকার বলে মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।

বিবৃতিতে বলা হয়, রোহিঙ্গা শিশুদের পাশাপাশি স্থানীয় শিশুদের যথাযথ, স্বীকৃতি এবং মান সম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করাটা জরুরি। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য বাংলাদেশকে সহায়তার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন