Follow us

ট্রলার ডুবির পরও বেপরোয়া: এক সপ্তাহে মালয়েশিয়াগামী ৩৯ রোহিঙ্গা আটক

আবদুর রহমান ও শরীফ খিয়াম
কক্সবাজার ও ঢাকা
2020-02-19
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
গত ডিসেম্বরে কক্সবাজার থেকে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়ে মিয়ানমার নৌবাহিনীর হাতে আটক হওয়া রোহিঙ্গা নারীর ছবি দেখাচ্ছেন টেকনাফের লেদা ক্যাম্পে বসবাসকারী তাঁর ছোট বোন। ১৯ ডিসেম্বর ২০১৯।
গত ডিসেম্বরে কক্সবাজার থেকে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়ে মিয়ানমার নৌবাহিনীর হাতে আটক হওয়া রোহিঙ্গা নারীর ছবি দেখাচ্ছেন টেকনাফের লেদা ক্যাম্পে বসবাসকারী তাঁর ছোট বোন। ১৯ ডিসেম্বর ২০১৯।
[আবদুর রহমান/বেনারনিউজ]

বঙ্গোপসাগরে ট্রলার ডুবিতে প্রাণহানির ঘটনার পরও অবৈধ সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য শরণার্থীশিবির ছেড়ে পালানো অব্যাহত রেখেছে রোহিঙ্গারা। পাচারকারী চক্রের প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে তাঁরা এমনটা করছেন বলে ধারণা স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের।

কক্সবাজারের টেকনাফের বিভিন্ন স্থান থেকে গত দুই দিনে নারী ও শিশুসহ এমন ২৯ শরণার্থীকে আটক করেছে পুলিশ। এ নিয়ে গত এক সপ্তাহে আটক হয়েছেন ৩৯ জন মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গা।

এ প্রসঙ্গে টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বুধবার বেনারকে বলেন, “গত ক’দিনে আটকের এই সংখ্যাই বলে দিচ্ছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাচারকারী চক্র সক্রিয় রয়েছে।”

“এই চক্রের প্রলোভনের শিকার হয়েই অবৈধ পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন আটক হওয়া রোহিঙ্গারা,” বেনারকে বলেন টেকনাফের বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (পরিদর্শক) লিয়াকত আলী।

“মানবপাচারকারীদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ক্যাম্পগুলোতে টহলও বৃদ্ধি করা হয়েছে,” জানান পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত।

এদিকে পুলিশি অভিযানের পরেও পাচারকারীদের দৌরাত্ম্য কমেনি উল্লেখ করে টেকনাফের লেদা ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ আলম বেনারকে বলেন, “বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় চলতি মৌসুম কম দুর্যোগপ্রবণ, পাচারকারীদের এমন প্রচারণার কারণেই সাগরপথে মালয়েশিয়া যাত্রা অব্যাহত রেখেছে রোহিঙ্গারা।”

“যাদের আত্মীয়-স্বজন বিভিন্নভাবে মালয়েশিয়ায় গিয়েছে, তাদের মধ্যেই সেদেশে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। অনিশ্চিত জীবন থেকে মুক্তির আশায় সেখানে পালিয়ে যাচ্ছে তারা। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে সাগর পাড়ি দিচ্ছে,” বলেন তিনি।

“রোহিঙ্গা শিবিরে সক্রিয় মানবপাচার চক্রটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিশু ও নারীদের প্রলোভন দেখিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পাচারের চেষ্টা করছে,” বেনারকে বলেন ইউএনও সাইফুল ইসলাম।

গত ডিসেম্বরে মালয়েশিয়া ভিত্তিক এনজিও চাইল্ড রাইটস কোয়ালিশন মালয়েশিয়া এক প্রতিবেদনে দাবি করে, উন্নত জীবনের লোভ দেখিয়ে বাংলাদেশের শরণার্থীশিবিরগুলো থেকে রোহিঙ্গা কিশোরীদের মালয়েশিয়া পাচার করা হচ্ছে। প্রায় সময়ই এই কিশোরীদের জোরপূর্বক যৌনতার জন্য পাচার (সেক্স ট্রাফিকিং) করা হয়।

তখন “শিবির থেকে রোহিঙ্গা নারী-শিশুদের পাচারের কথা অসত্য নয়। এটি অনেক দিন ধরে চলে আসছে,” বলে বেনারকে জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান।

গত ১১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, বর্তমানে মালয়েশিয়াতে বৈধ-অবৈধভাবে দুই লাখের মতো রোহিঙ্গা বসবাস করছেন, যাদের বেশির ভাগই সাগর পথে মানবপাচারকারীদের সাহায্যে সেখানে পৌঁছেছেন।

“তাঁদের মধ্যে লাখ দেড়েক জাতিসংঘের চেষ্টায় শরণার্থী হিসাবে রয়েছেন, বাকিরা অবৈধভাবে লুকিয়ে থাকেন,” বলে উল্লেখ করা হয় ওই প্রতিবেদনে।

আড়ালেই গডফাদারেরা

বিশ্লেষকদের দাবি, কক্সবাজার থেকে সমুদ্রপথে মানবপাচার পুরোপুরিভাবে বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি বাংলাদেশ।

শরণার্থী ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বেনারকে বলেন, “বিগত বেশ কয়েক বছর ধরেই আমরা দেখছি, মাঠপর্যায়ের পাচারকারী বা দালালদের আইনের আওতায় আনা বা ‘ক্রসফায়ারের’ নামে মারা হলেও তাদের গডফাদার, অর্থাৎ যারা ব্যবসাটিকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার।”

মাঠপর্যায়ের দালালদের ধরপাকড় বা ক্রসফায়ারের মেরে ফেলে খুব একটা লাভ হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই চক্রটির সাথে যে প্রভাবশালীরা জড়িত, তারা কারা তা স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসন সবাই জানে। তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নয়তো কোনো কারণে মানবপাচার অস্থায়ীভাবে বন্ধ হলেও আবার চালু হবে।”

সরকারকে দীর্ঘস্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থার (আইওএম) সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, “সাম্প্রতিক ট্রলার ডুবিটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটা কক্সবাজারের সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্রের ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডেরই ফল। শীতের মৌসুমে সাগর শান্ত থাকার সময়ে পাচার বেশি ঘটে, বর্ষার মৌসুমে এটা আপনাআপনিই কমে যাবে।”

মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টার সময় গত ১১ ফেব্রুয়ারি সেন্টমার্টিন দ্বীপ সংলগ্ন সাগরে ট্রলার ডুবির ঘটনায় সোমবার পর্যন্ত ২১টি মরদেহ পাওয়া গেছে। এছাড়া ডুবে যাওয়া ট্রলারের ১৩৮ জন যাত্রীর মধ্যে ৭৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

“নিখোঁজদের সন্ধানে এখনো অভিযান চলছে,” বলে বেনারকে জানান টেকনাফ কোস্টগার্ডের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট রাহাত ইমতিয়াজ।

ওই ঘটনায় ১৯ জনকে অভিযুক্ত করে কোস্টগার্ডের দায়ের করা মামলায় এখন পর্যন্ত ১২ জনসহ গত এক সপ্তাহে মোট ১৪ জন মানবপাচারকারীকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) মুখপাত্র মোস্তফা মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন বেনারকে জানান, “রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় লোকজনদের মাঝে সমুদ্রপথে যাত্রার ভয়াবহতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে সরকারি কর্তৃপক্ষের সাথে কাজ করে যাচ্ছে জাতিসংঘ।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন