Follow us

হতাশা ও নৈরাশ্যের ঝুঁকিতে ৫ লাখ রোহিঙ্গা শিশু

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2019-02-27
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির সফরকালে ইউনিসেফের প্রধান নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯।
কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির সফরকালে ইউনিসেফের প্রধান নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯।
[সৌজন্যে: ইউনিসেফ বাংলাদেশ]

সেনা নির্যাতনের মুখে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা শিশু হতাশা ও নৈরাশ্যের ঝুঁকিতে রয়েছে। ইউনিসেফ ও জাতিসংঘের দুই পদস্থ কর্মকর্তা বুধবার ঢাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানিয়েছেন।

গত সোম ও মঙ্গলবার জাতিসংঘ মহাসচিবের মানবিক সহায়তা বিষয়ক দূত আহমেদ আল মেরাইখি এবং ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা এইচ ফোর কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন।

ঢাকায় ফিরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হেনরিয়েটা বলেন, “কক্সবাজারে অবস্থানরত পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা শিশু এখন রাষ্ট্রহীন শরণার্থী। বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং জনবহুল শরণার্থী আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাসরত এসব শিশুর জন্য টেকসই কোনো সমাধান দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না।”

এসব ‘রাষ্ট্রহীন’ শিশুর সুন্দর জীবন গঠনে শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন জরুরি বলে মনে করেন ইউনিসেফ প্রধান হেনরিয়েটা ফোর।

হেনরিয়েটা বলেন, “রোহিঙ্গা শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজেদের জীবন গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও দক্ষতাবিহীন রাখা যায় না। তারা যদি নিজেরা বেঁচে থাকার যোগ্য হয়ে উঠতে পারে তাহলে তাদের কমিউনিটিগুলোও নিজে থেকে টিকে থাকতে ও সমৃদ্ধি লাভ করতে পারবে। সঠিক বিনিয়োগের মাধ্যমে এই রোহিঙ্গারা তাদের কমিউনিটি ও বিশ্বের কাছে সম্পদ হতে পারে।”

প্রসঙ্গত, মিয়ারনমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনীর দমন অভিযানের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয় সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা। যাদের বড় অংশই শিশু। নতুন ও পুরোনো সব মিলিয়ে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা এখন কক্সবাজারে অবস্থান করছে।

রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে গত সোমবার বাংলাদেশে আসেন ইউনিসেফের প্রধান নির্বাহী হেনরিয়েটা ফোর। এটাই ইউনিসেফের কোনো প্রধান নির্বাহীর প্রথম বাংলাদেশ সফর।

বাংলাদেশের শরণার্থী প্রত্যাবাসন বিষয়ক কমিশনার আবুল কালাম আজাদ বেনারকে বলেন, “ইউনিসেফের প্রধান নির্বাহী দুদিন ধরে কক্সবাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। মূলতঃ রোহিঙ্গাদের শিক্ষা এবং দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।”

কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা আব্দুর রহিম বেনারকে বলেন, “রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ইউনিসেফ পরিচালিত বেশ কিছু স্কুল বা লার্নিং সেন্টার রয়েছে। সেখানে আমাদের বাচ্চারা পড়ালেখার পাশাপাশি বিভিন্ন কাজ শেখে। এটা সত্যি দারুণ।”

“এ ধরনের স্কুল বাড়ানো হলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অন্ধাকারে থাকা শিশুদের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়াবে। তবে আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে নিজেদের দেশে ফিরতে পারা। আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে সেখানেই ফিরতে চাই আমরা।”

২৯ শতাংশ তহবিল সংগ্রহ

চলতি বছরে ৬ লাখ ৮৫ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাদের আশ্রয় প্রদানকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে জরুরি সহায়তা প্রদানে ১৫ কোটি ২০ লাখ ডলার সহায়তা চেয়েছে ইউনিসেফ বাংলাদেশ। সংস্থাটি জানায়, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আবেদনের ২৯ শতাংশ তহবিল সংগ্রহ হয়েছে।

হেনরিয়েটা ফোর বলেন, “তহবিল সংকট সব সময় একটি সমস্যা। বর্তমানে প্রতিবছর ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় তিনশ’র মতো ইমারজেন্সি তৈরি হয়। কিন্তু আমরা যা তহবিল চাই তার ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ অর্থ পেয়ে থাকি।”

শিক্ষা অর্জন শতাংশের

ইউনিসেফ জানায়, গত ডিসেম্বরে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে একটি জরিপ চালায় সংস্থাটি। এক লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা শিশুর ওপর করা এ জরিপে দেখা যায়, ৯০ শতাংশেরও বেশি শিশু প্রাক-প্রাথমিক থেকে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে লেখাপড়া করার যোগ্য।

এদের ৪ শতাংশ তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি এবং ৩ শতাংশ ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যায়ে লেখাপড়ার যোগ্য বলেও জরিপে পাওয়া যায়।

ইউনিসেফ বলছে, ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী রোহিঙ্গা তরুণ-তরুণীদের মাত্র ৩ শতাংশ কোনো ধরনের শিক্ষা বা কারিগরি দক্ষতা অর্জন করেছে।

সংস্থাটি জানায়, রোহিঙ্গা শিশুদের বিকাশের লক্ষ্যে ইউনিসেফ শিক্ষামূলক প্রকল্প নিয়ে ৪-১৪ বছর বয়সী ১ লাখ ৫৫ হাজার শিশুর কাছে পৌঁছেছে। প্রকল্পটিতে ক্রমশ মানোন্নয়ন, কাঠামোগত শিক্ষা ও দক্ষতা যুক্ত করা হচ্ছে।

ইউনিসেফ জানায়, চলতি বছরের অগ্রাধিকার হচ্ছে বেশি বয়সী রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরীদের সাক্ষরতা ও সংখ্যা গণনার প্রাথমিক দক্ষতা এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরি দক্ষতা শেখানো। পাশাপশি কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া হবে।

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নির্যাতনের সময় ধর্ষণের পর জন্ম নেওয়া শিশু ও গর্ভবতী নারীদের বিষয়ে ইউনিসেফ বিশেষ নজর রাখছে বলে সাংবাদিকদের জানান হেনরিয়েটা। তবে এ ধরনের শিশুর সংখ্যা নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।

ইউনিসেফের প্রধান নির্বাহী বলেন, “প্রতিটা শিশুর অধিকার তার জন্ম পরিচয় জানা। বিশ্বজুড়ে আমরা শিশুদের এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কাজ করতে গিয়ে মনে হল, কাজটা আসলেই বেশ কঠিন।”

রাজনৈতিক সমাধান গুরুত্বপূর্ণ

সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘ মহাসচিবের দূত আহমেদ মেরাইখি বলেন, “আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এ সঙ্কট মোকাবেলায় এটাই একমাত্র সমাধান নয়।”

মানবিক সহায়তা কেবল তাদের সাময়িক দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি মনে করি এর রাজনৈতিক সমাধান খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর এ জন্য আমাদের একসাথে কাজ করতে হবে।’

ড. আল মেরাইখি আরো বলেন, “এই প্রজন্মের রোহিঙ্গাদের পেছনে বিনিয়োগের জন্য আমাদের এ মুহূর্তে এবং সম্মিলিতভাবে সম্মত হতে হবে, যাতে তারা তাদের জীবনকে আরও ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারে।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন