Follow us

কোনো আশা দেখেন না মিয়ানমারের অভ্যন্তরে শিবিরে থাকা রোহিঙ্গারা

বিশেষ প্রতিবেদন
2020-02-27
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিত্তের থেহ গিয়াওং আশ্রয় শিবিরে থাকা একজন রোহিঙ্গা নারী। ফেব্রুয়ারি ২০২০।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিত্তের থেহ গিয়াওং আশ্রয় শিবিরে থাকা একজন রোহিঙ্গা নারী। ফেব্রুয়ারি ২০২০।
[রেডিও ফ্রি এশিয়া]

আট বছর আগে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার শিকার হয়ে বাস্তুহারা রোহিঙ্গারা এখনো ভবিষ্যতের কোনো আশা দেখতে পান না। সেখানে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা যে জাতিগত বিদ্বেষের সূচনা করেছিলেন, রোহিঙ্গাদের মতে, সে পরিস্থিতি পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত নেই।

২০১২ সালের জুনে বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড ও হামলায় দুই শতাধিক মানুষ নিহত হন, বাস্তুচ্যুত হন এক লাখ ২০ হাজার। এই মানুষগুলোর ঠাঁই হয় রাখাইন রাজ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গড়ে ওঠা নোংরা স্যাঁতস্যাঁতে শিবিরে।

এর বাইরে বিভিন্ন সময় রাখাইন রাজ্যের সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় কয়েক লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। এর ফলে কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে বর্তমানে রোহিঙ্গা জনসংখ্য বেড়ে ১১ লাখে পৌঁছেছে।

এদের মধ্যে ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের নিরাপত্তা চৌকিতে রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী সংগঠনের হামলার জবাবে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর নিপীড়নমূলক অভিযান শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশে এসেছেন ৭ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা। বাকিরা এসেছেন আগের বিভিন্ন সময়ের সহিংসতার ফলে।

২০১২ সালে রাখাইনের রাজধানী সিত্তেতে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ভস্মীভূত তেমন একটি এলাকা নাজরি ওয়ার্ডের বাসিন্দা ছিলেন রোহিঙ্গা খিন মং (৩০)। সহিংসতার সময় তিনি অন্যদের সাথে শহরের পশ্চিমাংশে চলে যান। ওই অংশটি ছিল মুসলিম অধ্যুষিত।

খিন মং বেনারনিউজের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রেডিও ফ্রি এশিয়াকে জানান, আর কোনোদিন তাঁরা নিজ বাসভূমিতে ফিরতে পারবেন কি না জানেন না।

তিনি বলেন, “আমি ভাবতেও পারি না যে কোনোদিন আমরা নিজের ভিটায় ফিরতে পারব।”

খিন মং এর মা আহ রায় শাহ বলেন, নাজরি ওয়ার্ডের ভিটেটার জন্য মন কাঁদে তাঁর।

“যদিও সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে, সব খুইয়েছি, তবু আমার বাড়িটার কথা মনে পড়ে,” তিনি বলেন।

তিনি আরও বলেন, “আমার সেই ছোট দোকানটার কথা মনে পড়ে। ওখানে ফিরে যেতে চাই, আবারও ওখানে থিতু হতে চাই।”

২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সময় রোহিঙ্গারা রাখাইনের মংডু শহরের দক্ষিণাঞ্চলের আটটি স্থানীয় অধিবাসীদের গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়।

এর পাল্টা জবাবে জাতিগত রাখাইনরা সিত্তেসহ রাখাইনের রোহিঙ্গা বসতির বিভিন্ন গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়।

পরবর্তীতে মিয়ানমার সরকার জাতিগত রাখাইনদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করলেও হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে নিয়ে বিভিন্ন শিবিরে আটকে রাখা হয়। তাঁরা এখনো সেখানেই রয়েছেন।

এই শিবিরগুলোর অনেগুলো বন্ধ হয়ে গেলেও এখনো ১৪টি টিকে রয়েছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এখনো চলমান থাকায় সেগুলোতে থাকা রোহিঙ্গাদের পক্ষে অনুমতি নিয়ে, এমনকি নিরাপত্তা রক্ষীদের সহযোগিতা নিয়েও শিবির ছেড়ে অন্য কোথাও যাতায়াত সম্ভব না।

থেহ গিয়াওং শিবিরে বসবাসকরীর রোহিঙ্গা নারী বাহুসা নারা জানান, সপ্তাহ দুয়েক ধরে তিনি জন্ডিসে ভুগলেও টাকার অভাবে ঠিকমতো চিকিৎসা হচ্ছে না।

তিনি জানান, অনুমতি মিললেও টাকা দিয়ে নিরাপত্তা রক্ষী ভাড়া করে তাঁর পক্ষে সিত্তের হাসপাতালে যাওয়া সম্ভব না।

“শহরের হাসপাতালে যেতে টাকা লাগে,” মন্তব্য করে বাহুসা নারা রেডিও ফ্রি এশিয়াকে বলেন, “আমাকে গাড়িচালককে টাকা দিতে হবে, পুলিশকেও দিতে হবে। আমার পক্ষে এত টাকা যোগাড় করা সম্ভব না। আমি কীভাবে যাব?”

এই কারণেই তিনি শুধু একটি স্থানীয় ক্লিনিকে যাচ্ছেন বলে জানান।

যেখানেই যান, চাই অনুমতি

রাখাইন রাজ্যের শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা শিবিরের বাইরে শহরে যেতে চান, তাঁদেরকে কর্মকর্তাদের অনুমতি নিতে হয়।

“যদি আপনাকে শহরে যেতেই হয়, আপনাকে প্রথমে সরকারকে জানাতে হবে, তারপর যেতে পারবেন,” বলেন রোহিঙ্গা কিয়াও থেয়িং মং।

কিয়াও বাস্তুচ্যুতদের একজন, থাকেন একটি আশ্রয় শিবিরে।

তিনি বলেন, “সরকার আপনাকে একজন নিরাপত্তারক্ষী দেবে, আপনাকে তাঁর সঙ্গে যেতে হবে।”

“আপনাকে হাসপাতালে যেতে হলে নিরাপত্তারক্ষী নিতে হবে, যেখানেই যান নিরাপত্তারক্ষী সঙ্গে নিতে হবে,” বলেন কিয়াও।

রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে কয়েক প্রজন্ম ধরে বসবাস করলেও সরকার তাঁদেরকে দেশটির নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না। বরং অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে গণ্য করে থাকে। ফলে দেশটিতে রোহিঙ্গারা পদ্ধতিগতভাবে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের চাকরি কিংবা আনুষ্ঠানিক শিক্ষার অধিকারও স্বীকৃত নয়।

দরিদ্র বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়।

২০১৭ সালে সিত্তে থেকে উদ্বাস্তু হয়ে শিবিরে আশ্রয় নেওয়া দুই হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা পরিবারের শিশুদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। কারণ ওই আশ্রয় শিবিরে কোনো স্কুল ছিল না।

আশ্রয় শিবিরের বাসিন্দা মোহামেদ শবি বলেন, পরে আশ্রয় শিবিরে একটি বেসরকারি সংস্থা স্কুল খোলে। কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা সহযোগিতাও দেয়।

সরকারের তরফ থেকে ঘরবাড়ি না পেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ নিজেরাই আশ্রয় শিবিরের ভেতরে ঘরবাড়ি তোলেন। জীবিকার তাগিদে তাঁদের অনেকেই দিনমজুরের কাজ করেন।

২০১২ সালের জুন মাসে ভিটা থেকে উচ্ছেদের আগে নারযি ওয়ার্ডে কা সেইনের নিজের ব্যবসা ছিল। বাধ্য হয়ে তাঁকে এখন অন্য কাজ খুঁজে নিতে হয়েছে।

“যখন আমি নারযিতে ছিলাম বাজারে আমার একটা দোকান ছিল, তখন ভালোভাবেই খেয়ে-পরে বেঁচে ছিলাম। এখানে আসার পর আর সে অবস্থা নেই,” কা সেইন বলেন।

তিনি বলেন, “এই বাড়িটা তৈরির পর আমি জুতা সেলাইয়ের কাজ করতাম, তারপর অন্যদের বাড়িঘর তৈরির সময় আমার ডাক পড়তে লাগল। যখন আমার কোনো কাজ থাকে না, তখন আমি আইসক্রিম বিক্রি করি।”

‘আলাদা রাষ্ট্রের দাবি নেই’

বর্তমানে মিয়ানমার সরকার একের পর এক আশ্রয়কেন্দ্র বন্ধ করে দিচ্ছে। ধর্মীয় ও জাতিগত বৈষম্য রোধে জাতিসংঘের সাবেক প্রধান কফি আনান ২০১৭ সালে যে সুপারিশ দিয়েছিলেন তারই আলোকে রোহিঙ্গাদের জন্য অন্যত্র বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

ধারাবাহিকভাবে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো বন্ধ হলেও ২০১৭ সালের আগস্টে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর যে আরও বড় পরিসরে হামলা হলো, সে সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটেনি। ওই সেনা অভিযানে দুই হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হন।

ওই সময় দশলাখ রোহিঙ্গার তিন চতুর্থাংশ নিজেদের ভিটামাটি ছেড়ে বাংলাদেশে পাড়ি জমান।

ফিরে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছেন এমন রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ ঐকমত্যে পৌঁছালেও এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমার ফিরে যেতে রাজি হননি।

বৈষম্যমূলক নীতি, আবারও সহিংসতার আশঙ্কা, নাগরিকত্ব দেওয়া হবে না এই ভয়ে তাঁরা ফিরতে চান না।

রাখাইনে বাস্তুচ্যুত শিবিরে বাস করা রোহিঙ্গাদের মতে, রোহিঙ্গারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মিয়ানমারেরই বাসিন্দা। সমান অধিকার ও পূর্ণ নাগরিকত্ব তাঁদের প্রাপ্য।

“আমরা কোনো রাজ্য চাইছি না, পৃথক রাষ্ট্রও না,” রোহিঙ্গা কিয়াও হ্লা বলেন। থেক্কেহ বাইন আশ্রয় শিবির ব্যবস্থাপনা কমিটির এই সদস্য বলেন, “আমাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিন এবং যেভাবে আমরা জীবনযাপন করেছি সেই জীবনে ফিরে যেতে দিন।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন