Follow us

সীমান্তে গুলিবর্ষণের ঘটনা অস্বীকার করেছে মিয়ানমার

জেসমিন পাপড়ি ও তুষার তুহিন
ঢাকা ও কক্সবাজার
2018-03-02
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
শেয়ার দিন
বান্দরবানের তুমব্রু সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার ওপার থেকে বাংলাদেশের ভেতরে রোহিঙ্গা শিবিরের দিকে তাকিয়ে আছেন মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) এক সদস্য।
বান্দরবানের তুমব্রু সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার ওপার থেকে বাংলাদেশের ভেতরে রোহিঙ্গা শিবিরের দিকে তাকিয়ে আছেন মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশের এক সদস্য। ১ মার্চ ২০১৮।
AFP

বাংলাদেশকে লক্ষ্য করে নয় বরং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যই বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু সীমান্তে নিজেদের অংশে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে দাবি করেছে মিয়ানমার।

তবে সৈন্য সমাবেশের বিষয়ে যুক্তি দেখালেও সীমান্তে গুলিবর্ষণের ঘটনা পুরোপুরি অস্বীকার করেছে মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি)।

সীমান্তে সৈন্য সমাবেশের একদিন পর শুক্রবার বিকেলে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির সঙ্গে পতাকা বৈঠকে এমন দাবি করেছে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপি।

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিত্তেতে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা এবং সীমান্তে রোহিঙ্গাদের বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) উপস্থিতির সংবাদ পাওয়ার প্রেক্ষিতেই সীমান্তে সৈন্যসংখ্যা বাড়ানো হয়েছে বলে বেনারনিউজের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রেডিও ফ্রি এশিয়াকে জানিয়েছেন মিয়ানমার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সেক্রেটারি উ মিন্ট থু।

“সাম্প্রতিক সময়ে সিত্তেতে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, এবং জানা গেছে যে আরসা সন্ত্রাসীরা দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় লোকজনের ভীড়ে মিশে অবস্থান করছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে আমরা নিরাপত্তা বাড়িয়েছি, যা ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে,” বলেন উ মিন্ট থু।

তবে মিয়ানমারের এমন দাবি মোটেই ‘গ্রহণযোগ্য’ মনে করছে না বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব মো. খুরশেদ আলম বেনারকে বলেন, “মিয়ানমারের এই দাবি কোনোমতেই আমরা গ্রহণযোগ্য মনে করি না।”

তিনি মনে করেন, “শূন্য রেখায় অবস্থান করা রোহিঙ্গাদের ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে পাঠিয়ে দিতেই সীমান্তে এই শক্তি বৃদ্ধি করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী।”

তবে এর ফলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে না বলে মনে করেন খুরশেদ আলম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মুহম্মদ রুহুল আমিন বেনারকে বলেন, “মিয়ানমার রাখাইনে জাতিগত নিধন এবং গণহত্যা চালাচ্ছে সে বিষয়ে প্রায় পুরো বিশ্ব এখন একমত। এটাকে পাশ কাটানোর জন্য দেশটি নানা ছলচাতুরী ও কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। এ কর্মকাণ্ডও তারই একটা অংশ।”

“প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াও এর মাধ্যমে ঝুলে যাবে,” বলেন তিনি।

এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে হঠাৎ করেই তুমব্রু সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের সেনা বৃদ্ধি ও ফাঁকা গুলি ছোড়ার ঘটনায় দু’দেশের সীমান্তে উত্তেজনা ও শূন্য রেখায় অবস্থান নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। এরই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের আহ্বানে শুক্রবার পতাকা বৈঠকে অংশ নেয় দু’পক্ষ।

বৃহস্পতিবার ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত লিউন উ–কে তলব করে সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ ঘটানোর কড়া প্রতিবাদও জানায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

শুক্রবার বিকেলে প্রায় দেড় ঘণ্টার পতাকা বৈঠকে বাংলাদেশের সাত সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন বিজিবি ৩৪ ব্যাটালিয়নের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মঞ্জুরুল হাসান খান।

নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তের শূন্যরেখায় মৈত্রী সেতুসংলগ্ন পয়েন্টে বাংলাদেশের ভেতরে অনুষ্ঠিত এই পতাকা বৈঠকে মিয়ানমারের সাত সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে দেন বিজিপির ব্যাটালিয়ন কমান্ডার সুচায়ে হু।

বৈঠক শেষে মঞ্জুরুল হাসান খান সাংবাদিকদের বলেন, “বৈঠকে মিয়ানমার দাবি করেছে, নিজেদের নিরাপত্তায় সীমান্ত অঞ্চলের বিভিন্ন সময়ে তারা সেনা বা বিজিপি মোতায়েন করে থাকে। তার অংশ হিসেবে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে টহলও দেওয়া হয়। এটি সম্পূর্ণ মিয়ানমারের নিজস্ব নিরাপত্তার প্রয়োজনে।”

বৃহস্পতিবার রাতে সীমান্তে মিয়ানমারের দিক থেকে ফাঁকা গুলি ছোড়া প্রসঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিবাদের জবাবে বিজিপি বিষয়টি অস্বীকার করেছে বলে বেনারকে জানান মঞ্জুরুল হাসান খান।

তিনি বলেন, “তাঁদের দাবি সীমান্তে কোনো গুলিবর্ষণ হয়নি।”

তবে সীমান্তে বাংলাদেশ কেন সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছে সে বিষয়য়ে প্রশ্ন তোলে বিজিপি। জবাবে বিজিবি জানায়, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যই বাংলাদেশ এটা করেছে।

গত বছরের ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের রাখাইনে সে দেশের সেনাবাহিনী নিপীড়ন ও গণহত্যা চালানো শুরু করলে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তাঁদের অস্থায়ীভাবে আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা দিলেও নিজেদের দেশে ফেরত পাঠাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আহ্বানসহ দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে সরকার।

কক্সবাজারে লিসা কার্টিস

বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তে টানাপোড়েনের এই সময়টাতে গতকাল ঢাকায় এসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা লিসা কার্টিস।

তিন দিনের সফরে ঢাকায় এসে এদিন বিকেলেই রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে তিনি কক্সবাজার রওনা হয়েছেন।

এদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে সৃষ্ট উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির ওপর সতর্কতার সঙ্গে নজর রাখছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে গত বৃহস্পতিবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র হিদার নোয়ার্ট সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

সীমান্ত থেকে সেনা কমিয়েছে মিয়ানমার

বিজিবির সঙ্গে পতাকা বৈঠকের পর বান্দরবান নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রুর মিয়ানমার সীমান্ত থেকে অল্পসংখ্যক সেনা সদস্য ও কিছু ভারী অস্ত্র যান সরিয়েছে নিয়েছে মিয়ানমার।

এ বিষয়ে তুমব্রু শূন্য রেখায় বসবাসকারী রোহিঙ্গা দিল মোহাম্মদ বেনারকে বলেন, “বৃহস্পতিবার মিয়ানমার সেনা বাড়ায়। তবে এদের মধ্যে কিছু সংখ্যক সদস্যকে সীমান্ত থেকে সরিয়ে নিয়েছে তারা। কয়েকটি গাড়িও সীমান্ত থেকে সরিয়েছে বিজিপি।”

“বৃহস্পতিবারের চেয়ে শুক্রবারের পরিবেশ শান্ত। সীমান্তের উত্তেজনা কমে এসেছে। মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বিজিপি তাঁদের ভারী অস্ত্র ও অতিরিক্ত মোতায়েন করা সেনা জিরো লাইন থেকে সরিয়ে নিচ্ছে,” বলেন মঞ্জুরুল আহসান খান বলেন,

শূন্যরেখায় থাকা রোহিঙ্গারাও ভালো আছে বলে জানান তিনি।

রোহিঙ্গাদের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে নিহত ১

শুক্রবার ভোরে উখিয়ার কুতুপালংয়ে অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুটি রোহিঙ্গা গ্রুপের সংঘর্ষে আবু তাহের (৩০) নামে এক রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন উখিয়া থানার ওসি (তদন্ত) মাকছুদুর রহমান।

তবে সংঘর্ষের কারণ এখনো জানা যায়নি বলে তিনি জানান।

এদিকে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্প থেকে পালানোর সময় বান্দরবানের রুমা উপজেলা থেকে ১০ জন রোহিঙ্গাকে বৃহস্পতিবার রাতে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মন্তব্য (0)
পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন