Follow us

থামেনি মালয়েশিয়ামুখী রোহিঙ্গা স্রোত: তিন মাসে উদ্ধার ২৮০ জন

আবদুর রহমান ও শরীফ খিয়াম
কক্সবাজার ও ঢাকা
2020-03-11
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
বঙ্গোপসাগরে ট্রলার ডুবির পর উদ্ধার হওয়া মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গাদের সেন্ট মার্টিন কোস্ট গার্ডের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০।
বঙ্গোপসাগরে ট্রলার ডুবির পর উদ্ধার হওয়া মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গাদের সেন্ট মার্টিন কোস্ট গার্ডের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০।
[আবদুর রহমান/বেনারনিউজ]

কক্সবাজারের টেকনাফের শামলাপুর উপকূল থেকে বুধবার ভোর রাতে মালয়েশিয়াগামী আট রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে পাঁচজন নারী এবং তিনজন পুরুষ। শরণার্থী শিবির থেকে পালিয়ে মানব পাচারকারীদের ট্রলারের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন তাঁরা।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে টেকনাফের বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক মোহাম্মদ লিয়াকত আলী বেনারকে বলেন, “পাচারকারীদের সহায়তায় অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে রোহিঙ্গারা। যে কারণে প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ আমাদের হাতে ধরা পড়ছে।”

“গত তিন মাসে কমপক্ষে ২৮০ জন মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন শরণার্থীশিবিরে পাঠানো হয়েছে,” বেনারকে জানান কক্সবাজার জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন। তিনি জানান, এদের সিংহভাগই নারী।

এর মধ্যে গত ১১ ফেব্রুয়ারির বঙ্গোপসাগরে সেন্টমার্টিন দ্বীপ সংলগ্ন এলাকায় ট্রলার ডুবির পর একদিনে সর্বোচ্চ ৭১ জন মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

ওই ঘটনায় ২১টি লাশ উদ্ধার হয়েছিল, যার মধ্যে ১৬ জনই নারী। বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের হিসাব অনুযায়ী, আরও ৪৫ রোহিঙ্গার সলিলসমাধি হয়েছে। যদিও সহযাত্রীদের হিসেবে নিহত বা নিখোঁজ রোহিঙ্গার সংখ্যা অর্ধাশতাধিক।

তবে কোনো নিখোঁজ রোহিঙ্গার পরিবার ক্যাম্প ইনচার্জ বা পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ না করায় নিখোঁজের সংখ্যা সুনির্দিষ্ট করা যায়নি বলে বেনারকে জানান শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মাহবুব আলম তালুকদার।

থামেনি মালয়েশিয়ামুখী স্রোত

ট্রলার ডুবির পর রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে মানব পাচার ঠেকানোর বিষয়ে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়ামুখী স্রোত থামাতে পারেনি।

কুতুপালং (পূর্ব) ক্যাম্পের সিআইসি (ইনচার্জ) মোহাম্মদ আতাউর রহমান বেনারকে বলেন, “ট্রলার ডুবিতে প্রাণহানির পর প্রতিটি ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতাদের সাথে বৈঠক করে মানব পাচারবিরোধী প্রচারণা চালানো হয়েছে।”

“নানাভাবে রোহিঙ্গাদের বারবার বোঝানো হয়েছে, তারা যাতে ক্যাম্প ছেড়ে অবৈধভাবে সাগর পাড়ি দিতে না যায়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংস্থার মাধ্যমেও এ জাতীয় প্রচারণা অব্যাহত রেখেছি আমরা,” বলেন তিনি।

জেলা পুলিশের কর্মকর্তা ইকবালও বলেন, “রোহিঙ্গা শিবির থেকে মানবপাচার বন্ধে অভিযান অব্যাহত রেখেছে পুলিশ। কেউ যাতে ক্যাম্প থেকে পালাতে না পারে সে ব্যাপারে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।”

এর আগে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) মুখপাত্র মোস্তফা মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেনও বেনারকে বলেন, “রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় লোকজনদের মাঝে সমুদ্রপথে যাত্রার ভয়াবহতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে সরকারি কর্তৃপক্ষের সাথে কাজ করে যাচ্ছে জাতিসংঘ।”

এ ব্যাপারে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) গবেষক ড. জালাল উদ্দিন শিকদার বেনারকে বলেন, “সরকার বা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মানব পাচারবিরোধী কর্মপন্থার চেয়ে পাচারকারীদের কৌশল শক্তিশালী হওয়ার কারণেই তারা মানুষকে অবৈধপথে যেতে রাজি করাতে পারছে।”

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সাবেক কর্মকর্তা আসিফ মুনীর বেনারকে বলেন, “সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্রই রোহিঙ্গাদের মাঝে এভাবে পালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা তৈরি করছে। মূলত আইনের প্রয়োগ শিথিল হওয়ার কারণেই রোহিঙ্গাদের প্রলোভিত করতে পারছে তারা।”

এদের ঠেকাতে আরও আগে থেকে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল জানিয়ে এই দুই বিশ্লেষক দাবি করেন, ট্রলার ডুবির ঘটনাটি না ঘটলে এ বিষয়টি আলোচনায়ই আসত না।

ওই ঘটনায় কোস্টগার্ডের দায়ের করা মানবপাচার মামলার ১২ জন আসামিসহ গত এক মাসে মোট ১৯ জন মানব পাচারকারীকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

এ ছাড়া মামলাটির পলাতক আসামি আব্দুস সালাম (৩০) ও মোহাম্মদ মোজাহের (২৮) গত ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি পুলিশের পৃথক অভিযানে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। বিষয়টি নিশ্চিত করে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ বেনারকে বলেন, “সাগরপথে মানব পাচার রোধে আমরা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছি।”

তবে ড. জালাল বলেন, “তাঁদের এমন মৃত্যু সরকার বা পুলিশ-প্রশাসনের ওপর তৈরি হওয়া চাপ কিছু প্রশমিত করলেও মানব পাচার প্রতিরোধে দীর্ঘস্থায়ী কোনো সুফল দেবে না।”

এ মন্তব্যের সাথে একমত পোষণ করে আসিফ মুনীর বলেন, “এ জাতীয় ঘটনা আমাদের সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।”

যা বলছেন রোহিঙ্গা নেতারা

শরণার্থী ক্যাম্প কেন্দ্রিক সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ উল্লাহ বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। যে কারণে মরিয়া হয়ে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সাগরপথ পাড়ি দিচ্ছে তারা।”

টেকনাফের লেদা ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা মোস্তফা কামাল বেনারকে বলেন, “ক্যাম্পে নারীদের বিয়ে দেওয়া খুবই কঠিন। এখানে যৌতুক ছাড়া কারোই বিয়ে হয় না। কিন্তু কেউ যদি মালয়েশিয়ায় অবস্থানকারী কোনো রোহিঙ্গা যুবককে বিয়ে করতে রাজি হয়, তবে আর যৌতুক দিতে হয় না।”

“বরং মোবাইলে বিয়ে করা বা বিয়ের জন্য রাজি হওয়া হবু স্বামীই তাঁকে নিজ খরচে মালয়েশিয়া নেওয়ার ব্যবস্থা করেন,” বলেন তিনি।

গত ডিসেম্বরে মালয়েশিয়া ভিত্তিক এনজিও চাইল্ড রাইটস কোয়ালিশন মালয়েশিয়া এক প্রতিবেদনে দাবি করে, উন্নত জীবনের লোভ দেখিয়ে বাংলাদেশের শরণার্থীশিবিরগুলো থেকে রোহিঙ্গা কিশোরীদের মালয়েশিয়া পাচার করা হচ্ছে। প্রায় সময়ই এই কিশোরীদের জোরপূর্বক যৌনতার জন্য পাচার (সেক্স ট্রাফিকিং) করা হয়।

তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বেনারকে বলেছিলেন, “শিবির থেকে রোহিঙ্গা নারী-শিশুদের পাচারের কথা অসত্য নয়। এটি অনেক দিন ধরে চলে আসছে। যেহেতু আমরা রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দিই না সেহেতু পাচারকারীরা সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচার করে।”

গত ১১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, বর্তমানে মালয়েশিয়ায় বৈধ-অবৈধভাবে দুই লাখের মতো রোহিঙ্গা বসবাস করছেন, যাদের বেশির ভাগই সাগর পথে মানবপাচারকারীদের সাহায্যে সেখানে পৌঁছেছেন।

এদের মধ্যে লাখ দেড়েক জাতিসংঘের চেষ্টায় শরণার্থী হিসেবে রয়েছেন এবং বাকিরা অবৈধভাবে লুকিয়ে থাকেন বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনটিতে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন