Follow us

আরসাও নিপীড়ন করছে রোহিঙ্গাদের, নির্যাতন বন্ধের আহ্বান

বিশেষ প্রতিবেদন
ওয়াশিংটন ডিসি
2019-03-15
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
উখিয়ার জামতলি রোহিঙ্গা শিবির। ২৭ নভেম্বর ২০১৭।
উখিয়ার জামতলি রোহিঙ্গা শিবির। ২৭ নভেম্বর ২০১৭।
[এপি]

রোহিঙ্গাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার প্রবণতা বন্ধে জঙ্গি সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) প্রতি আহবান জানিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থা। এই জঙ্গি সংগঠনটি রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর আদলেই নির্যাতন চালাচ্ছে বলে অভিযোগ সংস্থাটির।

ফোর্টিফাই রাইটস নামে ওই মানবাধিকার সংস্থাটি বৃহস্পতিবার তাদের বিবৃতিতে বলেছে, বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে রোহিঙ্গারা যেন স্বর্গরাজ্য পেয়েছে।

বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের ওপর আরসার নৃশংসতা বন্ধ এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানায় মানবাধিকার সংস্থাটি।

“রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর আরসার অত্যাচার, হুমকি এবং অপহরণ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডের প্রতিচ্ছবি,” বলেছেন ফোরটিফাই রাইটসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ম্যাথিউ স্মিথ।

তিনি আরও মনে করেন, অপরাধীদের দোষ প্রমাণ করতে ন্যায্য এবং নিরপেক্ষ বিচার প্রক্রিয়া প্রয়োজন।

এদিকে গত মঙ্গলবার টুইটারে আসা এক ভিডিও বার্তায় দেখা যায়, আরসা তাদের সদস্য, সমর্থক এবং শরণার্থীদের যেকোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে বল হয়, জঙ্গি গোষ্ঠীটি জানে ক্যাম্পগুলোতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হয়। কিন্তু তারা দায় নিতে অস্বীকার করেছে। তারা আরও বলছেন, “অপরাধীরা কেবলমাত্র বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধেই যাচ্ছে না বরং এই অপরাধে নিজেদের ওপর দায়ভার তৈরি করছে।”

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সীমান্তে এই জনগোষ্ঠীর হামলার কারণে দেশটির সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা চালায়। হত্যা, অত্যাচার, ধর্ষণ, বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনার কারণে সাত লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়।

“মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এই অপরাধ সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করে, সেনানায়কদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অপরাধে বিচার প্রক্রিয়া পরিচালনা করা উচিত,” বলে জাতিসংঘ মত দিলেও তাদের প্রতিবেদনে ‘আরসা চূড়ান্তভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে’ বলেও দাবি করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে আরসার সাথে সংশ্লিষ্ট জঙ্গিরাই খুব সম্ভবত ত্রাণকর্মীসহ রোহিঙ্গাদের অপহরণের সাথে জড়িত বলে প্রতিবেদনে জানায় ফোর্টিফাই রাইটস।

এতে বলা হয় যারাই আরসার বিরুদ্ধে সোচ্চার তারাই এর শিকার হচ্ছেন।

স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করা এক নারী ফোরটিফাই রাইটসকে গত মাসে তাঁর স্বামীর ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতনের বর্ণনা দেন।

বর্ণনায় ওই নারী বলেন, “অপরিচিত এক লোক আমাকে আমার এলাকা থেকে দূরে পাহাড়ের চূড়ায় একটি মসজিদের কাছে নিয়ে যায়। আমি প্রচণ্ড ভেঙে পড়ি, কাঁদতে থাকি। মসজিদে পৌঁছানোর পরে আরও অনেকের সঙ্গে আমার স্বামীকেও দেখতে পাই- তাদেরকে সেখানে খুব নির্যাতন করা হচ্ছিল।”

“তাদের লাথি এবং ঘুষি মারা হচ্ছিল। একজন আমাকে প্রশ্ন করে, তুমি বুঝতে পারছ আমরা কীভাবে শাস্তি দেই? যদি ঘরের বাইরে কাজ করো, তবে তোমার সাথেও এমনই হবে,” বলেন তিনি।

এই হুমকির পর ভয় পেয়ে তিনি স্বেচ্ছাসেবীর কাজ থেকে পদত্যাগ করেন বলে ফোরটিফাই রাইটসকে জানান।

নির্ভয়ে ঘরের বাইরে কাজ করার অধিকার রোহিঙ্গা নারীদের আছে মন্তব্য করে স্মিথ আরও বলেন, সমাজের সাহায্য এবং প্রচারে নারীর ভূমিকা অপরিহার্য। তাই তাদের কর্মক্ষেত্র এবং অধিকার রক্ষা করতে হবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত মাসে ক্যাম্পে আরসা একটি সভা করে। সেখানে তারা জানায়, জুলাই মাসে নিখোঁজ হওয়া এক ধর্মীয় নেতাকে অপহরণ ও হত্যা করেছে তারা। এই ঘটনা উল্লেখ করে তারা বলে, আরসাকে যারা সমর্থন দেবে না তাদের সবাইকে হত্যা করা হবে।

পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে ফোরটিফাই রাইটস জানায়, শরণার্থীদের মনে ভয়ভীতি তৈরি করে সমর্থন পাওয়া তাদের পুরনো কৌশল।

বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের উচিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অপরাধের তদন্ত করা এবং অপরাধ দমনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সাথে কাজ করা বলে মন্তব্য করেন স্মিথ।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ভালোভাবেই জানে শরণার্থীদের প্রতি তাদের কী কী দায়িত্ব। তবে শরণার্থীদেরও জানা প্রয়োজন যে, এই দেশ তাদের রক্ষা করবে।

তবে বাংলাদেশ আরসার উপস্থিতির বিষয় অস্বীকার করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল।

“রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর একাংশ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। তারা হত্যা এবং অন্যান্য অপরাধ করছে। তবে বরাবরের মতো আমি আবারও বলছি, বাংলাদেশে আরসার কোনো অস্তিত্ব নেই,” বেনারকে বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল আব্দুর রশিদ বলেন, “সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আরসা যে পরিচিতি লাভ করেছে, তারা সম্ভবত সেখান থেকে বেরিয়ে ‘রাজনৈতিক শক্তি’ হিসেবে আবির্ভূত হতে চাইছে। তাদের অডিও বার্তা এমনটাই ইঙ্গিত করছে।”

“হয়ত তারা সন্ত্রাস পরিহার করে রাজনৈতিক পথে আগাতে চাইছে, নয়ত সন্ত্রাসী পরিচয়টা অন্তত ঢাকতে চাইছে,” বলেন তিনি।

তিনি বলেন, “ভিডিওটি আরসাই প্রচার করেছে তা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। তবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে অবস্থান করলে এই গোষ্ঠী লাভবান হবে।”

তিনি আরও বলেন, “অপরাধ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো স্থানীয় গোষ্ঠীর সহানুভূতি পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের নীলনকশা হতে পারে। আরসা তাদের সন্ত্রাসী রূপ আড়াল করে পরবর্তীতে রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে কাজ করতে পারে।”

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ঢাকা থেকে কামরান রেজা চৌধুরী ও শরীফ খিয়াম

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন