Follow us

সীমান্তের শূন্যরেখায় ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে রোহিঙ্গা যুবক নিহত

শরীফ খিয়াম ও সুনীল বড়ুয়া
ঢাকা ও কক্সবাজার
2020-03-17
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
বান্দরবানের নাইক্ষ্যাংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু খাল ঘেঁষা কোনারপাড়া শূন্যরেখায় আটকে থাকা রোহিঙ্গাদের ওপর কাঁটাতারের বেড়ার ওপাশে পাহাড়ের ছাউনি থেকে নজর রাখছে মিয়ানমারের বিজিপি (বর্ডার গার্ড পুলিশ)। ২৭ আগস্ট ২০১৮।
বান্দরবানের নাইক্ষ্যাংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু খাল ঘেঁষা কোনারপাড়া শূন্যরেখায় আটকে থাকা রোহিঙ্গাদের ওপর কাঁটাতারের বেড়ার ওপাশে পাহাড়ের ছাউনি থেকে নজর রাখছে মিয়ানমারের বিজিপি (বর্ডার গার্ড পুলিশ)। ২৭ আগস্ট ২০১৮।
[শরীফ খিয়াম/বেনারনিউজ]

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের শূন্যরেখায় ল্যান্ডমাইন (স্থল বোমা) বিস্ফোরণে মনির উল্লাহ (২৫) নামে এক রোহিঙ্গা যুবক নিহত হয়েছেন। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু খাল ঘেঁষা সীমান্তে রোববার বিকেলে এ ঘটনা ঘটে।

কোনারপাড়ার নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকে থাকা রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের একজন ছিলেন মনির। এ তথ্য নিশ্চিত করে সেখানকার রোহিঙ্গা নেতা দিল মোহাম্মদ বেনারকে বলেন, “এই সীমান্তে ২০১৭ সালের আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত স্থল বোমা বিস্ফোরণে ১২ রোহিঙ্গা নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছেন।”

তাঁর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সীমান্তের ৩৯ নম্বর পিলার সংলগ্ন কাঁটাতারের বেড়া লাগোয়া এলাকায় জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে স্থল বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন মনির। তিনি মিয়ানমারের ঢেঁকিবুনিয়া গ্রামের মোহাম্মদ কালুর ছেলে।

“সোমবার তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে কোনারপাড়া রোহিঙ্গা শিবিরের পাশে দাফন করা হয়,” বলেন দিল মোহাম্মদ।

নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার হোসেন বেনারকে বলেন, “আমরাও শুনেছি ল্যান্ডমাইন বিষ্ফোরণে এক রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। তবে ঘটনাটি শূন্যরেখার বাংলাদেশ অংশে নয়, মিয়ানমারের অংশে ঘটেছে।”

দিল মোহাম্মদ বেনারকে বলেন, “সীমান্তের কাটাতার ঘেঁষে বিভিন্ন স্থানে স্থলবোমা পুঁতে রেখেছে মিয়ানমার বডার্র গার্ড পুলিশ (বিজিপি)। যে কারণে এখন কেউ মিয়ানমার অংশে গেলেই মাইন বিষ্ফোরণের শিকার হচ্ছেন।”

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মো. আব্দুর রশীদ বেনারকে বলেন, “শূন্যরেখার যেসব জায়গা থেকে রোহিঙ্গারা ফেরত যেতে পারে, সেই সব জায়গাতেই মিয়ানমার মাইন ব্যবহার করেছে। এ জাতীয় মৃত্যুর দায়ভারও দেশটিকে নিতে হবে।”

“স্থলমাইন ব্যবহার করে সাধারণ জনগণকে হতাহত করা আন্তর্জাতিক যুদ্ধ আইনে নিষিদ্ধ। মিয়ানমার এটা লঙ্ঘন করে যেভাবে নিরস্ত্র নিরীহ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানি ঘটাচ্ছে তা মেনে নেওয়া যায় না,” বলেন তিনি।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধনের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। সে বছরের সেপ্টেম্বরেই বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর স্থলমাইন পেতে রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

তারা তখন বলেছিল, “আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ স্থল বোমা পুঁতে রেখে রাখাইনের হাজার হাজার মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। পলায়নরত রোহিঙ্গাদের অনেকে এতে মারা যাচ্ছেন।”

এর আগে ২০১৫ সালের জুলাইতে নাইক্ষ্যংছড়ির আশারতলী সীমান্তের ৪৬ নম্বর পিলারের কাছ থেকে ১৪টি মাইন উদ্ধার করেছিল বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি)। সামরিক বিশ্লেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশক থেকে দুই দেশের সীমান্তের শূন্যরেখায় স্থল বোমা স্থাপন শুরু করে মিয়ানমার।

ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু ল্যান্ড মাইনসের (আইসিবিএলএম) হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে নিহত হয়েছিলেন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের ৬৪ কাঠুরিয়া। তা ছাড়া মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে বন্য হাতি মারা যাওয়ার খবরও বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে এসেছে।

বক্তব্য নেই বিজিবির

স্থল বোমা বিস্ফোরণে মনিরের মৃত্যুর ব্যাপারে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানায়নি বিজিবি। বেনারের পক্ষ থেকে বাহিনীর কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আলী হায়দারের মুঠোফোনে মঙ্গলবার একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি।

এর আগে গত ৮ জানুয়ারি মিয়ানমারের বিজিপি কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকের পর পিলখানা সদর দফতরে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলাম বলেছিলেন, সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে ৫০ গজের পরে মাইন পুঁতে রাখার বিষয়টি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়।

“আমাদের মনোযোগ আমাদের সীমান্ত এবং শূন্যরেখা থেকে ৫০ গজ। ৫০ গজের পরে যা হবে তা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়,” বলেন সাফিনুল। মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কর্মকর্তারা তখন সীমান্তে মাইন পুঁতে রাখার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, “এগুলো কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী রাখতে পারে।’

তা ছাড়া গত ৭ জানুয়ারি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বুসিডং এলাকায় ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে ১০ রোহিঙ্গা শিশু নিহত হওয়ার পর সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাও মিন তুন এ জন্য রাখাইন নৃগোষ্ঠীর (আরাকানি) বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মিকে দায়ী করেন।

তবে ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিসের (আইসিএলডিএস) নির্বাহী পরিচালক রশীদ বলেন, “মিয়ানমারের যেসব গোষ্ঠী বা সন্ত্রাসীরা দেশটির সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য নিরাপত্তা রক্ষীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, বাংলাদেশ সীমান্তে মাইন পুঁতে তাদের কোনো লাভ নেই।”

মূলত রোহিঙ্গারা যাতে স্বেচ্ছায় নিজেদের বাস্তুভিটায় ফিরে যাওয়ার কথা না ভাবে, সেটি নিশ্চিত করতে মাইন পোঁতা হয়েছে উল্লেখ করে সাবেক সেনা কর্মকর্তা রশীদ বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে চাপ দিয়ে মিয়ানমারকে এ ব্যাপারে আরও বেশি দায়বদ্ধ করতে হবে।”

এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক আরও বলেন, “সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজ পর্যন্ত মিয়ানমার যদি কোনো ধরনের ‘ডিফেন্স ওয়ার’ করে, তবে বিজিবি প্রতিবাদ জানাতে পারে। এটা সব দেশই জানিয়ে থাকে।”

“মাইন বিস্ফোরণের এই ঘটনাটি যদি তেমন এলাকায় হয়ে থাকে তবে বিজিবির পতাকা বৈঠক ডেকে জানানো উচিত যে এ ধরনের ঘটনা অনভিপ্রেত,” যোগ করেন তিনি।

এদিকে স্থলমাইন বিস্ফোরণে ইদানীং প্রায় হতাহতের ঘটনা ঘটছে উল্লেখ করে ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ বেনারকে বলেন, “সাধারণত রোহিঙ্গারা এতে আক্রান্ত হচ্ছে। তারা শুধু জ্বালানি কাঠ কুড়াতে নয়, অনেক সময় ইয়াবা আনতেও মিয়ানমারের অংশে যায় বলে শুনেছি।”

তবে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া মেরামত করার কারণে ওপারে যাওয়া এখন আর আগের মতো সহজ নয় বলে বেনারকে জানান রোহিঙ্গা নেতা দিল মোহাম্মদ।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন