Follow us

রোহিঙ্গা শিবিরে ওষুধ, কম্পিউটার ও স্বর্ণের দোকান বন্ধের নির্দেশ

কামরান রেজা চৌধুরী ও সুনীল বড়ুয়া
ঢাকা ও কক্সবাজার
2019-04-05
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
টেকনাফের লেদা ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের এক কম্পিউটারের দোকানে মোবাইলে ইসলামী বক্তাদের ভিডিও ঢোকানো হচ্ছে। ২৬ আগস্ট ২০১৮।
টেকনাফের লেদা ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের এক কম্পিউটারের দোকানে মোবাইলে ইসলামী বক্তাদের ভিডিও ঢোকানো হচ্ছে। ২৬ আগস্ট ২০১৮।
[শরীফ খিয়াম/বেনারনিউজ]

মাদকপাচার, জঙ্গি তৎপরতা, পর্নোগ্রাফি ও সাইবার অপরাধের মতো অপকর্ম রোধে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলোর আনাচে কানাচে গড়ে ওঠা ওষুষ, কম্পিউটার ও স্বর্ণের দোকান বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।

“সরকারের এ সিদ্বান্ত বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা নেতাদের জানানো হয়েছে,” শুক্রবার বেনারকে বলেছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম।

একইদিন কক্সবাজার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আশরাফুল আফসার বেনারকে বলেন, “আমরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

তবে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বলছেন, ক্যাম্পের ভেতর ওষুধের দোকান বন্ধ করে দিলে তাঁদের বিপত্তিতে পড়তে হবে। কারণ তাঁরা যে ওষুধ পান সেগুলো যথেষ্ট নয়।

শরণার্থী কমিশনার আবুল কালাম বলেন, “আমাদের কাছে তথ্য আছে, ক্যাম্পের ভিতরে স্থাপিত কম্পিউটার, ওষুধ এবং স্বর্ণের দোকানকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। সে কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার জন্য ইতোমধ্যে ক্যাম্প ইনচার্জদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”

“ওষুধের দোকানগুলোতে চোরাচালানকারীরা ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য মজুদ করে বেচাকেনা করছে। কম্পিউটারের দোকান থেকে মোবাইল ফোনে পর্নোগ্রাফিক সিনেমা ও জঙ্গিবাদকে উদ্বুদ্ধ করে এমন ভিডিও সরবরাহ করা হচ্ছে, সাইবার অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে,” যোগ করেন তিনি।

সরকারের এই অতিরিক্ত সচিব জানান, কম্পিউটারের দোকানগুলোতে নকল বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র ও জাতীয়তার সনদও তৈরি হচ্ছে। নকল সনদ ব্যবহার করে রোহিঙ্গারা বিভিন্ন সুবিধা নিচ্ছে।

“এছাড়া ক্যাম্পের মধ্যে অনেক স্বর্ণের দোকান স্থাপন করা হয়েছে। এগুলো থেকে চড়া সুদে স্বর্ণালঙ্কারের ব্যবসা চালানো হচ্ছে। চড়া সুদে অর্থ লেনদেনের কারণে রোহিঙ্গাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং সংঘাত বাড়ছে,” যোগ করেন কালাম।

এসব অপরাধ ঠেকানোর পাশাপাশি ক্যাম্পের আইনশৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এমন সিদ্বান্ত নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে আরআরসি আরো বলেন, “দোকান পরিচালনা করতে লাইসেন্স দরকার হয়। রোহিঙ্গারা সেসবের তোয়াক্কা না করে ব্যবস্যা পরিচালনা করে আসছে। তাদের আর নিয়ম বহির্ভূতভাবে কিছু করতে দেওয়া হবে না।”

প্রয়োজনে নামবে পুলিশ

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসেন বেনারকে বলেন, “রোহিঙ্গারা নিজেরা এব্যাপারে ব্যবস্থা না নিলে ক্যাম্প ইনচার্জদের সাথে সমন্বয় করে শিগগিরই এ সিদ্বান্ত বাস্তবায়নে নামবে পুলিশ। ক্যাম্পগুলোতে কোনোভাবেই অপরাধ কর্মকাণ্ড চলতে দেওয়া হবে না।”

তাঁরও দাবি, “মূলত এ ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্যাম্পের ভেতরের নানা অপরাধ সংগঠিত হওয়ার অন্যতম উৎস। মাদক চোরাচালান, সাইবার অপরাধ, সার্টিফিকেট জালিয়াতি, জঙ্গি তৎরতাসহ নানা অপরাধ হচ্ছে।”

“বিশেষ করে ক্যাম্পের ভেতরে এসব দোকানপাট দখল-বেদখলকে কেন্দ্র করে রোহিঙ্গাদের মধ্যে সংঘাত দিন দিন বাড়ছে। আধিপত্য বিস্তারের ঘটনায় দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এসব কমাতে ক্যাম্প থেকে দোকানগুলো তুলে দেওয়া হবে,” যোগ করেন ইকবাল।

জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ২১ মার্চ ২০১৯ পর্যন্ত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে অস্ত্র, মাদক, হত্যা, ধর্ষণসহ মোট ২৯৭টি মামলা হয়েছে। এ সব মামলায় আসামী করা হয়েছে ৫৯৬ জন রোহিঙ্গাকে।

তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, রোহিঙ্গা শিবিরে প্রকৃত অপরাধের সংখ্যা মামলার সংখ্যার চাইতে অনেক বেশি। অনেক অপরাধের জন্য পুলিশ মামলা রুজু করতে চায় না। শুধু গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেই মামলা নেয় পুলিশ।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারকে জানান, চাকুরির দাবিতে স্থানীয়দের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পর প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে রোহিঙ্গা সংক্রান্ত একটি সভা হয়।

সেখানে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়া এবং ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে বিভিন্ন সরকারি সুবিধা নেয়ার বিষয়সহ রোহিঙ্গাদের অপরাধ কার্যক্রমের ব্যাপারে আলোচনা হয়।

ওই সভার নির্দেশনা অনুযায়ী, ক্যাম্পের ভিতরের সকল কম্পিউটার, ওষুধ ও স্বার্ণালঙ্কারের দোকান বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিপদে পড়বে রোহিঙ্গারা

উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প-৪’র হেডমাঝি আব্দুর রহিম বেনারকে বলেন, “কম্পিউটার এবং স্বর্ণের দোকানে নানা অপরাধ হচ্ছে, এটা ঠিক। এগুলো বন্ধ করলে সাধারণ রোহিঙ্গাদের সমস্যা হবে না।”

“কিন্তু ক্যাম্পের ভেতরের সকল ফার্মেসি বন্ধ করে দেওয়া হলে রোহিঙ্গারা বেকায়দায় পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে যেসব ফার্মেসির নামে অভিযোগ আছে, কেবল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক,” যোগ করেন এই রোহিঙ্গা নেতা।

রহিমের দাবি, “রাতে হঠাৎ অসুস্থ হলে অনেকে সাথে সাথে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতে এসব ফার্মেসি থেকে ওষুধ খেয়ে অনেকে ভালো হচ্ছে।”

বালুখালী ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ নূরও বেনারকে বলেন, “রাতে বিপদ আপদে অনেক সময় ফার্মেসিগুলো মানুষের উপকারে আসে।”

তবে মাদক চোরাচালানকারীরা রোহিঙ্গা শিবিরি ব্যবহার করছে জানিয়ে “কঠোরভাবে এসব দমন করা না হলে ভবিষ্যতে পরিণতি খুবই খারাপ হবে,” বলে মন্তব্য করেন কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন