শরণার্থী শিবিরের বাইরে থেকে আটক সাড়ে তিনশ’র বেশি রোহিঙ্গা

আবদুর রহমান ও শরীফ খিয়াম
2022.04.05
কক্সবাজার ও ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
শরণার্থী শিবিরের বাইরে থেকে আটক সাড়ে তিনশ’র বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজার শরণার্থী শিবিরের বাইরে যাওয়ায় উখিয়া থানা পুলিশের হাতে আটক রোহিঙ্গাদের একাংশ। ৫ এপ্রিল ২০২২।
[আবদুর রহমান/বেনারনিউজ]

কক্সবাজারে শরণার্থী শিবিরের বাইরে দুইদিনে আটক ও উদ্ধার হওয়া ৩৬৪ জন রোহিঙ্গাকে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) ট্রানজিট সেন্টারে পাঠিয়েছে পুলিশ।

কাজের সন্ধানে শিবিরের বাইরে যাওয়া ৩১৬ জনকে বিশেষ অভিযান চালিয়ে আটকের কথা জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা বেনারকে বলেন, বাকি ৪৮ জনকে পাচারকারীদের খপ্পর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

স্থানীয় দুটি থানার কর্মকর্তারা বেনারকে জানান, বিশেষ অভিযানে সোমবার ও মঙ্গলবার উখিয়ায় ২১৬ জন এবং টেকনাফে একশ রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়।

“নানা কৌশলে ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গারা বেরিয়ে পড়ছে,” উল্লেখ করে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আহমদ সনজুর মোরশেদ বেনারকে জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে প্রথমে কয়েকটি বাজারে অভিযান চালানো হয়। বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার সময়ও অনেক রোহিঙ্গা আটক হয়েছে।

“তাদের প্রায় প্রত্যেকে ক্যাম্পের বাইরে কাজ করতে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছে,” বলেন তিনি।

টেকনাফ মডেল থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমান বেনারকে বলেন, “রোহিঙ্গারা যাতে ক্যাম্প থেকে বের না হয় তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যারা বাইরে বিভিন্ন কাজে যুক্ত আছে তাদের ফেরাতে এই বিশেষ অভিযান।”

এছাড়া সোমবার পৃথক অভিযানে পাচারকারীদের খপ্পর থেকে ৪৮ জন মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গাকে উদ্ধারের কথা উল্লেখ করে উখিয়ার ওসি জানান, ভূমি অফিসের সামনে থেকে মানবপাচার চক্রের সক্রিয় ছয় সদস্যকেও আটক করা হয়েছে।

আটক ও উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গাদের ট্রানজিট ক্যাম্প থেকে নিজ নিজ ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হবে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তারা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার অফিসের মুখপাত্র রেজিনা দে লা পোর্টিলা খোঁজ নিয়ে পরে বিষয়টি জানানোর কথা বলেন। বাংলাদেশ সময় রাত নয়টা পর্যন্ত তাঁর কাছ থেকে এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়নি।

বেকার দিন কাটছিল

উখিয়ার পালংখালী বাজারে চায়ের দোকানে কাজ করতে গিয়ে সোমবার পুলিশের হাতে ধরা পড়া কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা নুর আমিন মঙ্গলবার বেনারকে জানান, ট্রানজিট ক্যাম্প থেকে ক্যাম্প ইনচার্জের মাধ্যমে তাঁদের যার যার ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়।

“আমাদের সবাইকে ক্যাম্প থেকে বের না হতে সর্তক করে দেওয়া হয়,” উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ক্যাম্পে বেকার দিন কাটছিল। তাই গত মাস থেকে একটি চায়ের দোকানে দৈনিক দুইশ টাকা মজুরিতে কাজ শুরু করি। সেদিন কাজে যাওয়ার সময় ধরা পড়ি। আমার মতো আরো অনেককে পুলিশ আটক করে।”

কুতুপালং শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা জিয়াউর করিম বেনারকে বলেন, “এ ধরনের ঘটনা রোহিঙ্গাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে দেখা দরকার।”

তবে পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বেনারকে বলেন, “ক্যাম্পের বাইরের বিভিন্ন জায়গায় তারা দিনমজুর হিসেবে কম পারিশ্রমিকে কাজে যোগ দেওয়ায় স্থানীয় শ্রমিকেরা বিপদে আছে।”

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ করার অনুমতি দেওয়া না হলেও অর্ধেকেরও বেশি রোহিঙ্গা এবং ১৫ থেকে ১৬ বছর বয়সী ৩০ শতাংশ শিশু অনানুষ্ঠানিক কাজ করার কথা জানিয়েছে, যা তাদের শোষণ ও গ্রেপ্তারের ঝুঁকিতে ফেলেছে।”

নতুন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে শঙ্কা

নিজেদের ওয়েবসাইটে “বাংলাদেশ: রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নতুন নিষেধাজ্ঞা” শিরোনামে সোমবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে এইচআরডব্লিউ বলেছে, “সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবিকা, চলাচল এবং শিক্ষার ওপর তাদের বিধিনিষেধ জোরদার করেছে।”

“রোহিঙ্গাদের মুক্ত ও স্বাধীনভাবে বসবাসের ক্ষমতাকে অস্বীকার করা হচ্ছে,” বলেছে এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটি জানায়, গত অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সরকারি অভিযানে ক্যাম্পের ভেতরে রোহিঙ্গাদের গড়ে তোলা তিন হাজার দোকানপাট ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।

তাদের ভাষ্য, রোহিঙ্গাদের এক ক্যাম্প থেকে আরেক ক্যাম্পে যেতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তল্লাশি চৌকিতে হয়রানিসহ নানা ‘স্বেচ্ছাচারী বিধিনিষেধের’ শিকার হচ্ছে রোহিঙ্গারা।

তবে রোহিঙ্গা শিবিরে দায়িত্বরত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) কর্মকর্তারা এইচআরডব্লিউর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। ১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক ও পুলিশ সুপার (এসপি) নাঈমুল হক বেনারকে জানান, ক্যাম্পের ভেতরে রোহিঙ্গাদের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি।

“পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমরা সেখানে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। তবে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা দোকানগুলো তুলে দেওয়া হয়েছে,” বলেন তিনি।

তবে ৮-এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) কামরান হোসেন বেনারকে বলেন, “জরুরি কাজ ছাড়া রোহিঙ্গারা যাতে শিবিরের বাইরে যেতে না পারে সেজন্য ‘চেকপোস্টে’ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।”

দাতা সংস্থাগুলোকেও ক্যাম্পের কাঁটাতারের ভেতরে ত্রাণ বিতরণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলেও তিনি জানান।

শরণার্থী মর্যাদাই সমাধান

এইচআরডব্লিউর উল্লেখ করা বিষয়গুলো স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলোও অবগত আছে উল্লেখ করে মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বেনারকে বলেন, “আমার মনে হয়, যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা এই রোহিঙ্গাদের আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শরণার্থী’ হিসেবে স্বীকৃতি না দিচ্ছি, ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁদের এই ধরনের সমস্যার কোনো সরল সমাধান নেই।”

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বসবাস করা প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গার ‘শরণার্থী’ হিসেবে স্বীকৃতি না থাকায় স্থানীয় আইনের অধীনে তারা অনিশ্চয়তা ও অধিকার হারানোর ঝুঁকিতে আছে।

“তবুও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির অধীনে বাংলাদেশে শরণার্থীসহ সবার চলাফেরার স্বাধীনতা, জীবিকা, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা সহ মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে বাধ্য,” বলেছে তারা।

নূর খান লিটনের মতে, চলাফেরার স্বাধীনতা ও কাজের সুযোগ না থাকার কারণে রোহিঙ্গারা শরণার্থী শিবিরে থাকার ব্যাপারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে না। ফলে তাঁরা “জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেই যাচ্ছে।”

এইচআরডব্লিউর ধারণা, বাংলাদেশের কর্মকর্তারা উদ্বাস্তুদের ভাসানচর দ্বীপে স্থানান্তর বা মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার জন্য চাপে রাখতে চাচ্ছেন। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ গত ডিসেম্বরে রোহিঙ্গাদের পরিচালিত কমিউনিটি স্কুল নিষিদ্ধ করায় প্রায় ৬০ হাজার শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও দাবি করেছে তারা।

“প্রতিটি শিশু ও কিশোরের শিক্ষা গ্রহণের জন্মগত অধিকার রয়েছে। তা সে যে ভূখণ্ডে যেভাবেই থাকুক না কেন,” বলেন বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী কমিটির মহাসচিব নূর খান লিটন।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন