মালয়েশিয়া: আটককেন্দ্র থেকে পালিয়ে গাড়ি চাপায় ছয় রোহিঙ্গার মৃত্যু

রে শেরম্যান ও নিশা ডেভিড
2022.04.20
কুয়ালালামপুর
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
মালয়েশিয়া: আটককেন্দ্র থেকে পালিয়ে গাড়ি চাপায় ছয় রোহিঙ্গার মৃত্যু মালয়েশিয়ার উত্তরাঞ্চলের একটি অভিবাসী বন্দিশিবিরের ভাঙা বেড়া দেখা যাচ্ছে। এই বন্দিশিবির থেকে কয়েক শ রোহিঙ্গা পালিয়ে যাবার পথে গাড়িচাপায় মারা যান ছয়জন। ২০ এপ্রিল ২০২২।
[এ. আমারুদিন/বেনারনিউজ]

মালয়েশিয়ার বন্দিশিবিরে বুধবার ভোরে দাঙ্গার পর কয়েকশ রোহিঙ্গা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে মহাসড়ক পার হওয়ার সময় গাড়িচাপায় মারা গেছেন ছয়জন।

পলাতকদের মধ্যে প্রায় ৪০০ জনকে সন্ধ্যার মধ্যে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার কর্মকর্তারা।

এ ঘটনায় মালয়েশিয়ার গোপন অভিবাসী আটক কেন্দ্রগুলোর বেদনাদায়ক পরিস্থিতি প্রকাশিত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। কী কারণে এ ধরনের অস্থিরতা তৈরি হল তা তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

দেশজুড়ে এমন কতগুলো গোপন বন্দিশিবির আছে এবং সেগুলোতে কত সংখ্যক অভিবাসী অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দি আছেন তা প্রকাশেরও দাবি জানিয়েছেন মানবাধিকার কর্মীরা।

দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হামজাহ জয়নুদিন বলেছেন, “কী এমন কারণে তারা এমন পন্থা বেছে নিলো, তা বিস্তারিত তদন্ত করতে পুলিশ এবং অভিবাসন বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

এখনো পলাতক থাকা শতাধিক লোককে খুঁজে বের করতে দেশের অনেকগুলো সংস্থা কাজ করছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, “লাংকাউইয়ের একটি শিবির থেকে পালানো ওই ৫২৮ জন বন্দির সবাই জাতিগত রোহিঙ্গা শরণার্থী। মালয়েশিয়ার জলসীমায় অনুপ্রবেশ এবং অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের জন্য ২০২০ সালে তাঁরা গ্রেপ্তার হন।” লাংকাউই মালয়েশিয়ার কেদাহ উপকূলে অবস্থিত একটি দ্বীপপুঞ্জ।

পালাতে গিয়ে মারা গেলেন ছয় জন

পুলিশ প্রধান ওয়ান হাসান ওয়ান আহমেদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় পুলিশকে ভোর ৪টার দিকে সুঙ্গাই বাকাপ অস্থায়ী অভিবাসন কেন্দ্রে দাঙ্গা এবং পালানোর বিষয়ে জানানো হয়।

দাঙ্গার আগে সেখানে ৬৬৪ জনকে রাখা হয়েছিল, যাদের মধ্যে ৪৩০ জন পুরুষ, ৯৭ জন নারী এবং ১৩৭ জন শিশু।

সাংবাদিকদের তিনি বলেন, দাঙ্গার সময় কোনো গুরুতর হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে দাঙ্গার কারণ তদন্ত করা হচ্ছে।

পলানোর আগে রোহিঙ্গারা দরজা ও ফটক ভেঙে ফেলে জানিয়ে তিনি বলেন, ঘটনার আকস্মিকতায় দায়িত্বে থাকা ২৩ জন নিরাপত্তা কর্মী হতবিহ্বল হয়ে পড়েন।

“সংকীর্ণ জায়গায় অনেক বেশি বন্দি থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল এবং বন্দিরা বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল,” কেদাহে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন তিনি।

“পলাতকদের মারাত্মক দুর্ঘটনায় পড়ার ঘটনা ঘটেছে বন্দিশালা থেকে প্রায় ছয় থেকে সাত কিলোমিটার দূরে। পালানোর সময় একটি মহাসড়ক অতিক্রমকালে যানবাহনের ধাক্কায় দুই পুরুষ, দুই মহিলা এবং দুই শিশু (একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে) মারা যায়,” বলেন তিনি।

অভিবাসী আটক কেন্দ্রের কাছে বসবাসকারী গ্রামবাসী হাশিম বেনারকে বলেন, “সব দিকে শুধু বন্দিদের দেখা যাচ্ছিল। কেন্দ্র থেকে পালিয়ে জঙ্গলে ঢোকার আগে তারা আমাদের গ্রামের দিকেই ছুটেছিল।”

আরেক গ্রামবাসী আহমেদ হুসেন বলেন, পালিয়ে আসা ব্যক্তিরা কাছাকাছি পামওয়েলের বাগানে লুকিয়ে থাকতে পারে।

“তারা তৃষ্ণার্ত ছিল; তাদের কেউ কেউ আমাদের কাছে পানি চাইতে এসেছিল। কিন্তু খারাপ কিছু ঘটে, এই ভয়ে কেউ তাদের পানি দিতে সাহস পায়নি,” বেনারকে বলেন তিনি।

পলাতক বন্দিদের কারণে এখনো তাদের পরিবার বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছে বলে দাবি করেছেন দুজনেই।

পলায়নকারীদের সাহায্য না করার জন্য নিকটবর্তী গ্রামের বাসিন্দাদের সতর্ক করেছেন কেদাহর পুলিশ প্রধান। পলাতকদের সাহায্য করা আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ, ঘোষণা দেন তিনি।

নিজ দেশ মিয়ানমারে নিপীড়ন থেকে বাঁচতে এবং বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে কষ্টকর জীবনযাপন থেকে মুক্তি পেতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড এবং ইন্দোনেশিয়াসহ অন্যান্য দেশে পালিয়ে গেছেন।

স্বচ্ছ তদন্তের দাবি

মালয়েশিয়া অবশ্য শরণার্থীর মর্যাদা স্বীকার করে না। দেশটি ২০২০ সাল থেকে হাজার হাজার শরণার্থীকে একত্রিত করেছে এবং তাদের জনাকীর্ণ আটক কেন্দ্রে রেখেছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধ করার জন্য এই ব্যবস্থা বলে দাবি করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।

বর্তমান আনুমানিক এক লাখ ৮০,০০০ ইউএনএইচসিআর কার্ডধারী রোহিঙ্গা মালয়েশিয়ায় বসবাস করেন।

মালয়েশিয়ার মানবাধিকার কমিশনের সদস্য জেরাল্ড জোসেফ জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের প্রতিনিধিকে আটককৃতদের সাথে দেখা করার অনুমতি দেওয়ার জন্য দেশটির অভিবাসন বিভাগের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন।

আটককৃতরা সত্যিই রোহিঙ্গা কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধিদের প্রবেশাধিকার দেওয়া উচিত। যদি রোহিঙ্গাই হয়, তবে তাদের দেশটিতে থাকা দেড় লাখ রোহিঙ্গার মতো মুক্ত করা উচিত... শুধু রাষ্ট্রহীন বলে রোহিঙ্গাদের আটকে রেখে অভিবাসন বিভাগের কোনো লাভ নেই,” বলেন তিনি।

সুংগাইয়ের বাকাপ অভিবাসন আটক কেন্দ্রের মারাত্মক পরিস্থিতি, যা বন্দিদের পালানোর চেষ্টা করতে মরিয়া করে তুলেছিল এবং এর ফলে ছয়জন প্রাণ হারিয়েছেন- এ কথা উল্লেখ করে স্বচ্ছভাবে ঘটনার তদন্ত করার দাবি জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

“সারাদেশে এরকম কতগুলো অস্থায়ী অভিবাসী আটক কেন্দ্র আছে তারও তদন্ত দরকার,” এক বিবৃতিতে বলেছেন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মালয়েশিয়ার নির্বাহী পরিচালক ক্যাটরিনা জোরেন মালিয়ামাউভ।

অনির্দিষ্টকালের জন্য এরকম আটককে ‘যন্ত্রণাময়’ অভিহিত করে তিনি বলেছেন, “মালয়েশিয়ার অভিবাসন কেন্দ্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অতীতের ঘটনাগুলোর প্রেক্ষিতে এই অভিবাসী আটক কেন্দ্রগুলোর পরিস্থিতি নথিভুক্ত করা উচিত।”

তিনি বলেন, “সরকারকে শুধু ছয় ব্যক্তির মৃত্যুর বিষয়ে নয়, কেন শিশুসহ এত শরণার্থীকে আটক করা হচ্ছে তারও জবাব দিতে হবে।”

কেদাহ রোহিঙ্গা অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ইউসুফ আলীও মালয়েশিয়া সরকারের কাছে আবেদন করেছেন দেশের অভিবাসন কেন্দ্রে আটক রোহিঙ্গাদের ব্যাপারটি দেখার জন্য।

হয়তো রোহিঙ্গারা সেখানে অনেক দিন ধরে আছে একারণে পালিয়েছে, যাদের কারও কারও কাছে “অস্থায়ী ডকুমেন্ট এবং ইউএনএইচসিআর কার্ড রয়েছে,” জানিয়ে তিনি বলেন, তবে সেসব পরিচয়পত্র কর্তৃপক্ষকে দেখালে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তাদের গ্রেপ্তার করবেন এবং তাদের ডকুমেন্ট বা কার্ডকে জাল বলে অভিযোগ করবেন,” বলেই হয়তো তাঁরা পালানোর পথ বেছে নিয়েছেন।

“অন্য কোনো দেশ আমাদের জাতিগোষ্ঠীকে মেনে নিতে চায় না। এটা এখন মালয়েশিয়া সরকারের বিবেচনার উপর নির্ভর করছে,” বলেন ইউসুফ আলী।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন মালয়েশিয়ার পেনাং থেকে জুল সুফিয়ান এবং কেদাহ থেকে ইস্কান্দার জুলকারনাইন।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।