Follow us

সরকারের বিধিনিষেধে রোহিঙ্গাদের ঝুঁকি বেড়েছে: এইচআরডব্লিউ

শরীফ খিয়াম ও সুনীল বড়ুয়া
ঢাকা ও কক্সবাজার
2020-04-28
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের একটি বাজারে কোনো ধরনের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়াই ঘোরাফেরা করছেন রোহিঙ্গারা। ২৬ এপ্রিল ২০২০।
উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের একটি বাজারে কোনো ধরনের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়াই ঘোরাফেরা করছেন রোহিঙ্গারা। ২৬ এপ্রিল ২০২০।
[সুনীল বড়ুয়া/বেনারনিউজ]

করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ ঠেকাতে বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া বিধিনিষেধ কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোর রোহিঙ্গাদের আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। এমনটা দাবি করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বলেছে, লকডাউনের কারণে শিবিরগুলোয় মানবিক সহায়তা দেওয়া কর্মীর সংখ্যা ৮০ শতাংশ কমে গেছে।

এই অবস্থা শরণার্থীদের খাদ্য ও পানির ঘাটতি এবং শিবিরগুলোকে রোগ প্রাদুর্ভাবের মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে বলে মঙ্গলবার সংগঠনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠনটি।

“বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে কোভিড-১৯ এর বিস্তার রোধ করতে চাইছে, তবে প্রতিটি চেষ্টায় লকডাউনের ক্ষতির মাত্রা কমিয়ে আনা উচিত,” উল্লেখ করে এইচআরডব্লিউর এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, “কোভিড-১৯ সম্পর্কিত বিধিনিষেধে দাতাগোষ্ঠী, বিশেষ করে তাদের খাবার, পানি, স্বাস্থ্যসেবা এবং সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করা উচিত নয়।”

এদিকে এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনকে ‘অবাস্তব’ আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মাহবুব আলম তালুকদার বেনারকে বলেন, “লকডাউনের মধ্যেও রোহিঙ্গা শিবিরে জরুরি সেবাসমূহ ব্যাহত হয়নি। খাদ্য ও পানি সংকটের তো প্রশ্নই আসে না।”

“খাদ্য সামগ্রী বিতরণ আগের মতোই স্বাভাবিক রয়েছে,” উল্লেখ করে তিনি বলেন, “কিছু কিছু ক্যাম্পে পানি সংকট তৈরি হতে পারে ভেবে আমরা বিকল্প হিসাবে পানির ‘ভ্যান’ প্রস্তুত রেখেছিলাম। কিন্তু এরই মধ্যে কয়েক দফা বৃষ্টি হওয়াতে তা আর দরকার হয়নি।”

কয়েকটি শিবির মারাত্মক খাদ্য ও পানির ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে জানিয়ে এইচআরডব্লিউ দাবি করেছে, কমপক্ষে চারটি ক্যাম্পের বাসিন্দা জানিয়েছেন, তাঁরা নিয়মিত ‘রেশন’ পাচ্ছেন না এবং বেশ কিছু এলাকায় পানীয় জলেরও ব্যবস্থা নেই।

তবে এখন পর্য়ন্ত কোনো ধরনের সংকটের মুখোমুখি না হওয়ার কথা জানিয়ে সাহায্য সংস্থাগুলোর জোট ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেটর গ্রুপের (আইএসসিজি) মুখপাত্র সৈকত বিশ্বাস বেনারকে বলেন, “খাদ্য, পানি সরবারাহ, চিকিৎসা সেবা, স্যানিটেশনসহ জরুরি সেবাগুলো যথাযথভাবেই চলছে।”

শরণার্থীদের সংগঠন রিফিউজি কমিটির সভাপতি মো. সিরাজুল মোস্তফা বেনারকে বলেন, “সহায়তা কর্মীদের সংখ্যা কমলেও আমরা খাবার পাচ্ছি। তবে এই লকডাউন যদি অব্যাহত থাকে, আমরা খাদ্য ও পানির সংকটের মুখোমুখি হব।”

“আমরা কয়েকটি শিবির থেকে জানতে পেরেছি যে তারা পর্যাপ্ত খাবার, পানি এবং অন্যান্য জরুরি সেবা পাচ্ছেন না,” বলেন তিনি।

উল্লেখ্য, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় রোহিঙ্গা শিবিরগুলো গত ৯ এপ্রিল লকডাউন করা হয়। এই সংক্রমণের হার সারাদেশে বাড়ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বাংলাদেশে গত ২৪ ঘন্টায় নতুন ৫৪৯ জন করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। বর্তমানে সারা দেশে এই ভাইরাসে মোট আক্রান্ত ৬ হাজার ৪৬২ জন। এছাড়া গত ২৪ ঘন্টায় মৃত ৩ জনসহ সব মিলিয়ে এই রোগে দেশে এ পর্যন্ত মারা গেছেন ১৫৫ জন।

তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনো রোহিঙ্গা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হননি।

যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে, মঙ্গলবার পর্যন্ত সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৩০ লাখ ৯৮ হাজারের বেশি মানুষ, মারা গেছেন দুই লাখ ১৬ হাজারের বেশি।

সুরক্ষা ঝুঁকির শীর্ষে নারীরা

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রোহিঙ্গা শিবিরে মানবিক সহায়তা কর্মীদের প্রবেশাধিকার কমে যাওয়ায় নারী শরণার্থীদের সুরক্ষাও বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

সুরক্ষা দলের এক সদস্য এইচআরডব্লিউকে বলেছেন, “এখন যদি কোনও মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়, তবে তিনি আমাদের কাছে খবর পৌঁছাতে পারবেন না এবং কোনও সাহায্য পাবেন না।"

তবে “লকডাউনের কারণে কোথাও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে, তেমন খবর আমাদের কাছে আসেনি,” বলে মন্তব্য করেন আরআরআরসি। এছাড়া এখন পর্যন্ত নিরাপত্তার কোনও সমস্যা চোখে পড়েনি বলে বেনারকে জানান রোহিঙ্গা নেতা সিরাজুল মোস্তফা।

রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর সাধারণ স্বাস্থ্যসেবাও গুরুতর প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে। সেখানে হাম ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব থাকলেও ভ্যাকসিন সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জনবলের ঘাটতির কারণে টিকা কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।

“কোভিড -১৯ প্রাদুর্ভাবের সাথে মোকাবিলা করার অর্থ এই নয় যে, আমরা অন্যান্য রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা বন্ধ করি,” এইচআরডব্লিউকে বলেন এক স্বাস্থ্যকর্মী।

এদিকে “চিকিৎসা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে কিছু কিছু সমস্যা তৈরি হচ্ছে, যদিও এগুলো বড় কোনো বিষয় নয়,” বলে জানান রোহিঙ্গা নেতা সিরাজুল।

যুক্তরাজ্যকে ঢাকার আহ্বান

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ দফতরের প্রতিমন্ত্রী লর্ড আহমদ বঙ্গোপসাগরে ভাসমান প্রায় ৫০০ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ার জন্য ঢাকাকে অনুরোধ করার প্রেক্ষিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. একে আবদুল মোমেন আশেপাশের দেশ এবং উন্নত দেশগুলোকে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এই দায়িত্ব নেয়ার জন্য ব্রিটিশ মন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

মোমেন ব্রিটিশ মন্ত্রীকে বলেন, “সংখ্যার বিচারে হয়তো ৫০০ জন অনেক বেশি নয়, কিন্তু উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মানবিক কারণে ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। তাছাড়া, তারা তো বাংলাদেশের সীমানার মধ্যেও নেই।”

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে মঙ্গলবার বলা হয়েছে, ব্রিটিশ মন্ত্রী লর্ড আহমদ গতকাল মোমেনকে ফোন করেন এবং মোমেন তাঁকে বলেন, নৌকাগুলো বাংলাদেশের উপকূলরেখায় অবস্থান করছে না। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, তারা কেন এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশকে বাদ দিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য শুধু বাংলাদেশকেই বলছেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আশঙ্কা করেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অবশিষ্ট রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে, কারণ, তাঁদের হত্যা ও জন্মভূমি থেকে বিতাড়নের জন্য সামরিক ক্র্যাকডাউন এখনো চলছে।

কয়েক সপ্তাহ ধরে পর্যাপ্ত খাদ্য ও পানিবিহীন সমুদ্রে ভাসমান রোহিঙ্গাদের উদ্ধারে অনাগ্রহের কারণে ইউএনএইচসিআর-সহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ঢাকাসহ এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের ভূমিকার সমালোচনা করে।

মোমেন বলেন “কেন বাংলাদেশ প্রতিবারই দায়িত্ব নেবে? আমাদের উদারতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে।”

শরণার্থীদের সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের নেতা সৈয়দ উল্লাহ বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া ও সৌদিআরবসহ যেসব দেশে রোহিঙ্গা রয়েছে তাদেরই দায়িত্ব নিয়ে সবাইকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া উচিত। তাহলে রোহিঙ্গারা বুঝবে তাদের একটি দেশ আছে।”

নৌকা দুটির খোঁজ মিলছে না

বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলের দেশগুলো ভাসমান রোহিঙ্গাদের নিজেদের ভূমিত প্রবেশ করতে না দিয়ে ফেরত পাঠিয়েছে, এমন খবর পেলেও তাঁদের বহনকারী নৌযানগুলোর কোনো হদিশ পাওয়া যাচ্ছে না বলে মঙ্গলবার বেনারকে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)।

কক্সবাজার থেকে ইউএনএইচসিআর মুখপাত্র লুইস ডোনোভান বেনারকে বলেন, “আমরা ওই নৌকাগুলোর বর্তমান অবস্থান বা তাঁদের যাত্রা শুরুর জায়গাটি নিশ্চিত করতে পারছি না।”

“তবে নৌকাগুলোতে অবস্থানকারী মানুষের ভাগ্য নিয়ে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন, কারণ এই মৌসুমে বঙ্গোপসাগরে আবহাওয়া পরিস্থিতির খুব দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে,” বলেন তিনি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন