মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চেষ্টা বেড়েছে, সীমান্তে টহল জোরদার

শরীফ খিয়াম ও আবদুর রহমান
ঢাকা ও কক্সবাজার
2021-04-30
Share
মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চেষ্টা বেড়েছে, সীমান্তে টহল জোরদার মিয়ানমার থেকে নদীপথে টেকনাফের একটি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ চেষ্টাকালে রোহিঙ্গা বোঝাই দুটি নৌকাকে ফেরত পাঠাচ্ছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা। ২২ এপ্রিল ২০২১।
[বিশেষ ছবি, বেনারনিউজ]

মিয়ানমারের সেনা অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চেষ্টা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। 

চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে ১০৪ জন রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো হয় বলে জানা যায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী। এর আগের দুই মাসে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন ২৯ জন রোহিঙ্গা। 

এছাড়া গত চার মাসে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করা আরো ৩১ রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। 

“সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের নাগরিকদের অনুপ্রবেশের চেষ্টা বেড়েছে এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বাংলাদেশ–মিয়ানমার সীমান্তে টহল জোরদার করা হয়েছে” বৃহস্পতিবার বেনারকে জানান বিজিবির পরিচালক (অপারেশন্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফয়জুর রহমান। 

“সীমান্তে বিজিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। নতুন করে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হবে না,” বেনারকে জানান কক্সবাজার বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আলী হায়দার আজাদ। 

তবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না দিয়ে ‘পুশব্যাক’ করা বা ফেরত পাঠানোকে ‘দুঃখজনক’ বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশের মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন।

“২০১৭ সালে রোহিঙ্গারা যখন গণহত্যার মুখে জীবন বাঁচাতে দলে দলে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল, তখন মানবিক কারণে তাঁদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল,” জানিয়ে তিনি বেনারকে বলেন, “এখন পর্যন্ত দেশটিতে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে তা বলার সুযোগ নেই।” 

“তাই বর্বরতার মুখে কেউ আশ্রয় চাইলে যেকোনো দেশেরই উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো,” বলেন নূর খান। 

গত ১ ফেব্রুয়ারির সামরিক অভ্যুত্থান পরবর্তী মিয়ানমার পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে গত ৩১ মার্চ জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক সংবাদ ভাষ্যে জানায়, সেখানকার ঘটনা প্রবাহ মানুষকে দেশের অভ্যন্তরে ও সীমান্ত পার হয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করছে। 

“সুরক্ষার জন্য পালিয়ে আসা সবাইকে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য এই অঞ্চলের দেশগুলোর প্রতি আমরা জরুরি আহবান জানাচ্ছি,” উল্লেখ করে সংস্থাটি। 

তবে নতুন করে আর কোনো রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া হবে না বলে তখন বেনারকে জানিয়েছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার অনুবিভাগের মহাপরিচালক (ডিজি) মোহাম্মাদ দেলোয়ার হোসেন। 

“বাংলাদেশের যতটুকু সামর্থ্য রোহিঙ্গাদের জন্য তার চেয়ে অনেক করেছে। এখন অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোরও তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত,” বলেন দোলোয়ার হোসেন। 

“এতগুলো বছরেও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য মিয়ানমারের কোনো রকম তৎপরতা আমরা লক্ষ করছি না,” জানিয়ে নূর খান লিটন বেনারকে বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এ ব্যাপারে যথাযথ চেষ্টা করেছে তা বলার সুযোগ নেই।” 

তাঁর মতে, “লাখ লাখ মানুষের ভার বাংলাদেশ একাই বইছে, এটাও কিন্তু আরেকটি অমানবিকতা।”

“প্রতিবেশী দেশগুলোর এই বোঝা ভাগাভাগি করে নেওয়া উচিত ছিল,” যোগ করেন নূর খান লিটন। 

অনুপ্রবেশ বাড়ার নেপথ্যে

মিয়ানমারের নববর্ষ উপলক্ষে সামরিক সরকার সাধারণ ক্ষমার আওতায় এপ্রিলের মাঝামাঝি ২৩ হাজারের বেশি বন্দিকে মুক্তি দেয়। এর মধ্যে প্রায় ৬০০ রোহিঙ্গাও রয়েছেন, যারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছেন বলে জানান কর্মকর্তারা।

“মিয়ানমার সম্প্রতি জেলে আটকে থাকা অনেক নাগরিককে মুক্তি দিয়েছে। তাদের অনেকের আত্মীয়-স্বজন বাংলাদেশে আগে থেকেই রয়েছে, যে কারণে তারা এদিকে আসার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে,” বলেন বিজিবি কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান। 

“আমরা খবর পেয়েছি, সেদেশে কারামুক্ত হওয়া ছয়শ রোহিঙ্গা এপারে অনুপ্রবেশের চেষ্টায় রয়েছে,” বেনারকে জানান কক্সবাজার আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক মো. তারিকুল ইসলাম। 

এছাড়া রাখাইন থেকে কিছু অসুস্থ রোহিঙ্গা নারীও সম্প্রতি বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করছেন বলে বেনারকে জানান টেকনাফের লেদা শরণার্থী শিবিরের নেতা মোস্তফা কামাল। 

“কারণ সেখানে (রাখাইনে) তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই,” বলেন তিনি। 

অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে কড়াকড়ির ভেতরও অনেক রোহিঙ্গা লুকিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। 

চলতি বছরের প্রথম চার মাসে এমন ৩১ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে বলে জানান এপিবিএন অধিনায়ক তারিকুল ইসলাম। 

এই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশের পর বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে লুকিয়ে ছিলেন, আটকের পর তাঁদের উখিয়ায় ইউএনএইচসিআর-এর ট্রানজিট শিবিরে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি। 

মিয়ানমারের মংডুর গজরবিলের বাসিন্দা কবির আহমদ ও তার স্ত্রী বেগম বাহার সম্প্রতি টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ করে শালবন রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নেন। খবর পেয়ে এপিবিএন সদস্যরা বৃহস্পতিবার তাঁদের ট্রানজিট পয়েন্টে কোয়ারেন্টিনের (সঙ্গনিরোধে) জন্য পাঠায়। 

“এই দম্পতি ২০১৭ সালে ২৫ আগস্টের পর সেনাবাহিনীদের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিল। সম্প্রতি কারামুক্ত হয়ে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে এপারে এসে আশ্রয় নেয়। তাদের স্বজনেরা এখানে আগে থেকেই আশ্রয় নিয়েছিল,” বলেন তারিকুল ইসলাম। 

লেদা শরণার্থী শিবিরের উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম বেনারকে বলেন, “রাখাইন থেকে চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে আমার ক্যাম্পেও একটি পরিবারে এসেছিল। পরে তারা কোথায় গেছে, তা আমি জানি না।”

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন