জাতিসংঘ প্রতিনিধি দলের উপস্থিতিতে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের বিক্ষোভ

আবদুর রহমান ও জেসমিন পাপড়ি
কক্সবাজার ও ঢাকা
2021-05-31
Share
জাতিসংঘ প্রতিনিধি দলের উপস্থিতিতে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের বিক্ষোভ নোয়াখালীর ভাসানচরে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের পরিদর্শনকালে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার দাবিতে রোহিঙ্গাদের বিক্ষোভ। ৩১ মে ২০২১।
[বেনারনিউজ]

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর সদর দপ্তরের প্রতিনিধিদের পরিদর্শনকালে রেশন, মাসিক ভাতা, কর্মসংস্থান, উন্নত চিকিৎসাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গারা। 

বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের লাঠিপেটায় কয়েকজন শরণার্থী আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন রোহিঙ্গারা। পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, রোহিঙ্গারাই ইট ছুড়েছেন পুলিশের দিকে।

রোহিঙ্গাদের দাবি, বিক্ষোভে তিন থেকে চার হাজার শরণার্থী অংশ নিয়েছেন, পুলিশের মতে, বিক্ষোভে ছিলেন পাঁচ থেকে ছয়শ’ মানুষ। 

রোববার চার দিনের সফরে ঢাকায় আসেন ইউএনএইচসিআরের কার্যক্রম পরিচালনা বিষয়ক সহকারী হাইকমিশনার রাউফ মাজাও এবং সুরক্ষা বিষয়ক সহকারী হাইকমিশনার গিলিয়ান ট্রিগস। সোমবার তাঁরা সরকারি আয়োজনে হেলিকপ্টারে করে রোহিঙ্গাদের দেখতে ভাসানচর যান।

“সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে ইউএনএইচসিআরের দুই সহকারী হাইকমিশনারসহ ১৪ সদস্যের প্রতিনিধিদল হেলিকপ্টারযোগে ভাসানচরে পৌঁছালে রোহিঙ্গারা জড়ো হয়ে তাঁদের দিকে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করে,” বেনারকে বলেন নোয়াখালীর পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আলমগীর হোসেন।

“এ সময় তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে রোহিঙ্গারা বিক্ষুব্ধ হয়ে ইট পাটকেল ছোড়ে। এমনকি তারা ওয়ার হাউজে ভাংচুর চালায়। এ ঘটনায় পুলিশসহ চার-পাঁচ জন লোক আহত হয়েছে। তবে তাঁদের কারো জখম খুব বেশি গুরুতর নয়,” বলেন তিনি। 

ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের পর জাতিসংঘের সদর দপ্তরের কোনো প্রতিনিধিদের এটাই প্রথম সফর। এর আগে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে দ্বীপটি পরিদর্শন করেন জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াংহি লি। তবে তখনো ভাসানচর বসবাসের জন্য প্রস্তুত হয়নি। এছাড়া গত মার্চে দ্বীপটি পরিদর্শন করেছিল বাংলাদেশে কর্মরত জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর একটি প্রতিনিধিদল। 

সোমবার জাতিসংঘ প্রতিনিধি দল ভাসানচরে পৌঁছালে নিজেদের “দাবি বলার জন্য” প্রতিনিধিদের থেকে ৩০-৪০ হাত দূরে অবস্থান নিয়ে রোহিঙ্গারা “বিক্ষোভ মিছিল করে,” বলে ভাসানচর থেকে ফোনে বেনারকে জানান সেখানকার রোহিঙ্গা নেতা নুরুল ইসলাম। 

তিনি জানান, সেখানে রোহিঙ্গাদের “প্রতিমাসে ৫ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হচ্ছে না বলে শ্লোগান দেন তারা। এছাড়া কর্মসংস্থান ও পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা করার দাবিও তোলেন রোহিঙ্গারা।” 

পুলিশ এই বিক্ষোভে “বাধা দেয়” জানিয়ে তিনি বলেন, “বিক্ষোভরত রোহিঙ্গারা প্রতিনিধি দলের সাথে কথা বলার সুযোগ পায়নি। তবে সরকারি কার্যালয়ে অন্য এক দল রোহিঙ্গার সাথে প্রতিনিধি দলটি কথা বলেছে।” 

জাতিসংঘের প্রতিনিধি দলের সাথে সাক্ষাতকারী দলে ছিলেন রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ জুবাইর। তিনি ভাসানচর থেকে ফোনে বেনারকে বলেন, “শত শত রোহিঙ্গা জড়ো হয়ে জাতিসংঘের প্রতিনিধি দলের সামনে বিক্ষোভ করেন। এসময় তাঁরা সেখানে কষ্ট আছেন, তাঁদের উপর জুলুম হচ্ছে বলে স্লোগান দিতে থাকেন।”

তিনি জানান, বিক্ষোভ থেকে রোহিঙ্গারা ভাসানচরে “চলাচলের ওপর কঠোর হস্তক্ষেপ বন্ধ” ও “কাজের সুযোগ” দেওয়া না হলে “কক্সবাজারের ক্যাম্পে ফিরিয়ে নিতে অনুরোধ জানান।”

“এতে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী বাধা দেয়। এসময় কিছু রোহিঙ্গা বিক্ষুব্ধ হয়ে ইটপাটকেল ছুঁড়লে পুলিশ লাঠি চার্জ করে। এতে নারী শিশুসহ অনেকেই রক্তাক্ত হয়,” বলেন জুবাইর।

আহতদের কারো আঘাত গুরুতর নয় বলে জানান তিনি। বিক্ষোভে তিন থেকে চার হাজার রোহিঙ্গা অংশ নিয়েছিলেন বলে জানান জুবাইর ও নুরুল ইসলাম।

প্রতিনিধি দলের সাথে বৈঠক প্রসঙ্গে জুবাইর বলেন, “জাতিসংঘ ভাসানচরের ত্রাণ কাজে সম্পৃক্ত হলে আমরা এখানে থাকব কিনা তাঁরা জানতে চান। কিন্তু আমরা জানিয়েছি, এখানে আমরা থাকতে চাই না।”

এদিকে রোহিঙ্গাদের ওপর লাঠি চার্জের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভাসানচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহে আলম। 

ওই বিক্ষোভে ৫০০ থেকে ৬০০ মানুষ অংশগ্রহণ করেছিলেন জানিয়ে তিনি বেনারকে বলেন, “রোহিঙ্গাদের মধ্যে একটি দুষ্ট চক্র জাতিসংঘের প্রতিনিধি দলের সামনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিক্ষোভ করছিল।”

“এ সময় তাদের থামানোর চেষ্টা করলে তারা ইট পাটকেল ছোঁড়ে। এতে আমাদের কয়েকজন লোক সামান্য আহত হয়,” বলেন মাহে আলম।

“এছাড়া রোহিঙ্গারা সরকারি একটি কার্যালয়, মোটরসাইকেলসহ কয়েকটি দোকানপাট ভাংচুর চালায়,” জানিয়ে তিনি বলেন, “এ ঘটনার নেতৃত্বদানকারীদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। 

উদ্বিগ্ন ইউএনএইচসিআর

জাতিসংঘ প্রতিনিধিদলের পরিদর্শনকালে ভাসানচরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শরণার্থীদের আহত হবার সংবাদে তাঁরা “গভীরভাবে উদ্বিগ্ন” বলে সোমবার এক ইমেইল বার্তায় বেনারকে জানান ইউএনএইচসিআর-এর কমিউনিকেশন অফিসার লুইস ডোনোভান।

তিনি বলেন, “আমরা লজ্জিত যে সেখানে আহতদের মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছেন বলেও শোনা গেছে।”

“শরণার্থীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার,” জানিয়ে তিনি বলেন, তাঁরা আহতদের বিস্তারিত অবস্থা জানার চেষ্টা করছেন। এছাড়া আহত রোহিঙ্গাদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতিও আহ্বান জানান তিনি।

ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধিরা ভাসানচরে একদল শরণার্থীর সাথে সাক্ষাৎ করে “বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য শুনেছেন” জানিয়ে ডোনোভান বলেন, “প্রতিনিধিদল পরবর্তীতে বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিতভাবে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করবে।” 

ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র লুইস ডোনোভান জানান, ভাসানচর সফরের পর প্রতিনিধিদল কক্সবাজারে পৌঁছেছে। দলের সদস্যরা মঙ্গলবার এখানকার শরণার্থী শিবির পরিদর্শন শেষে ঢাকা ফিরে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করবেন। 

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও নিপীড়নের মুখে দেশটি থেকে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। এর আগে থেকেও বাংলাদেশে বসবাস করছিলেন কয়েক লাখ রোহিঙ্গা। 

সব মিলে বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারে ঘিঞ্জি পরিবেশে বসবাস করছেন। কক্সবাজারের শিবিরগুলো থেকে এক লাখ রোহিঙ্গাকে অধিকতর নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে ২ হাজার ৩১২ কোটি টাকা ব্যয় করে নৌ বাহিনীর তত্ত্বাবধানে ভাসানচর দ্বীপকে প্রস্তুত করে সরকার। 

শুরু থেকেই ভাসানচরে বসবাসযোগ্যতার ওপর পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা বিষয়ক টেকনিক্যাল প্রোটেকশন অ্যাসেসমেন্ট করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছিল জাতিসংঘ। 

তবে সমীক্ষা ছাড়াই জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলোর আপত্তির মুখে গত ৪ ডিসেম্বর থেকে ধাপে ধাপে রোহিঙ্গাদের ভাসানচর স্থানান্তর শুরু করে সরকার।

এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত কয়েক দফায় প্রায় ১৯ হাজার রোহিঙ্গা সেখানে পৌঁছান। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, সব রোহিঙ্গাই সেখানে স্বেচ্ছায় গেছেন। 

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ঢাকা থেকে কামরান রেজা চৌধুরী।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন