Follow us

রোহিঙ্গারা ফেরত না গেলে রাখাইনে চীনের স্বার্থ বিঘ্নিত হবে: বাংলাদেশ

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-06-12
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কক্সবাজারের একটি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির। ৭ মার্চ ২০১৯।
কক্সবাজারের একটি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির। ৭ মার্চ ২০১৯।
[রয়টার্স]

মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবসিত করা না গেলে রাখাইনে চীনের স্বার্থ বিঘ্নিত হবে। এ কথা চীনকে জানাতে চায় বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন চীন সফরে এই বার্তা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানোর কথা বলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন।

তাঁর মতে, ১১ লাখ শরণার্থী অনিশ্চয়তার মধ্যে বছরের পর বছর বাংলাদেশে অবস্থান করলে রোহিঙ্গারা জঙ্গিবাদের সাথে জড়িয়ে পড়তে পারে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পর্কে ঢাকায় অবস্থিত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের ব্রিফিং শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, মিয়ানমার যাতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয় সে জন্য সেদেশের বন্ধু রাষ্ট্র চীনকে বাংলাদেশ অনুরোধ করবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ‘ডাহা মিথ্যা তথ্য প্রচার করছে’ বলে জানান মন্ত্রী।

এর আগে মঙ্গলবার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একটি প্রতিনিধিদলের সাথে সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ঝ্যাং ঝু।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্রিফিং

বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় আয়োজিত ব্রিফিংয়ে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক এবং দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

ব্রিফিং এর পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন সাংবাদিকদের বলেন, “আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আগামী মাসে আশা করি চীনে যাবেন। তখন আমরা এই ইস্যুটি বড় করে উত্থাপন করব।

চীনকে আমরা বলব, “দেখ এখানে যদি শান্তি না থাকে, শৃঙ্খলা না থাকে, যদি এখানে আনসার্টেনিটি থাকে তাহলে তোমাদেরও স্বার্থ বিঘ্নিত হবে’।”

তিনি বলেন, “চীন আমাদের বারবার বলেছে তারা আমাদের সাথে একমত যে মিয়ানমারের লোকগুলো মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া উচিত।”

রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ছে এমন প্রসঙ্গ উত্থাপন করা হলে মন্ত্রী বলেন, “এটা আমরা অনেক দিন ধরে আঁচ করেছিলাম। বিরাট সংখ্যক লোক যদি এখানে পড়ে থাকে তাহলে সন্ত্রাসী তৎপরতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে।”

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে কথা রাখছে না মন্তব্য করে আব্দুল মোমেন বলেন, গত বছর জানুয়ারি থেকে প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা ছিল এবং দুবছরের মধ্যে তা শেষ হওয়ার কথা ছিল।

“কিন্তু সেটা হয়নি । তারপর বলা হলো ২০১৮ সালের নভেম্বরে তারা শুরু করবে। কিন্তু সেটাও হয়নি। আমরা গত মাসে মিয়ানমারে চতুর্থ জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের সভায় গেলাম তখন আমরা খুব আশাবাদী ছিলাম। বোধ হয় প্রক্রিয়াটি শুরু হলো। তা হয়নি,” যোগ করেন মন্ত্রী।

মোমেন বলেন, “তারপর তারা আবার মিয়ানমারের ৮০০টি গ্রামের মধ্যে দুটো গ্রামের ওপর স্টাডি করেছে। আসিয়ানের নামে স্টাডিটা করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে সেখানে অবস্থা খুব ভালো। ওই দুটো গ্রাম ‍শোকেস গ্রাম।”

তিনি বলেন, রাখাইনে প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব ছিল মিয়ানমারের। কিন্তু সে ব্যাপারে তারা কোনো কাজ করেনি।

মিয়ানমার বারবার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবার প্রতিশ্রুতি দিলেও একজনকেও এখন পর্যন্ত ফেরত নেয়নি জানিয়ে মোমেন বলেন, “এমনকি যারা নো-ম্যানস ল্যান্ডে আছে, আমাদের দেশে না, তাদের দেশে ওখান থেকেও একজনও ফেরত যায়নি।”

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “তারা (মিয়ানমার) একটি ডিসইনফরমেশন ক্যাম্পেইন ‍শুরু করেছে। তারা আরও বলছে মাত্র পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা এসেছে। আর আমরা বায়োমেট্রিক করে প্রথম কিস্তিতে সাত লাখ চল্লিশ হাজার পেয়েছি। আর এখন ১১ লাখ।”

তিনি বলেন, “আমরা আমাদের পজিশনটি সবাইকে জানিয়েছি এবং তারা একবাক্যে বলেছেন, ‘আমরা আপনাদের সাথে আছি’। মিয়ানমার বিভিন্ন লোক দিয়ে যে রিপোর্টগুলো তৈরি করছে, সেগুলো সবগুলো ডাহা মিথ্যা। আর এগুলো পৃথিবীর কেউ বিশ্বাস করে না।”

তিনি বলেন, “আমরা তাদের বলেছি আপনারা মিয়ানমারের কাছে যান। রাখাইনে যান। অনুকূল পরিবেশ তারা যাতে তৈরি করে সে জন্য তাদের ওপর আরও চাপ বৃদ্ধি করেন। মোটামুটিভাবে সবাই তারা রাজি।”

সভা শেষে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত রেনসে তিরিঙ্ক সাংবাদিকদের বলেন, “ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে যা বলেছি তা হলো আমরা বাংলাদেশের পক্ষে আছি। এবং রোহিঙ্গা বিষয়ে বাংলাদেশকে সমর্থন করে যাব।”

মিয়ানমারের ওপর তারা কোনো চাপ সৃষ্টি করবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে তা করছি।

কুতুপালং ক্যাম্প-২ এর ক্যাম্প ইনচার্জের কার্যালয়ে রোহিঙ্গাদের সাথে বৈঠকের পর বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ঝ্যাং ঝু। ১১ জুন ২০১৯। [সুনীল বড়ুয়া/বেনারনিউজ]
কুতুপালং ক্যাম্প-২ এর ক্যাম্প ইনচার্জের কার্যালয়ে রোহিঙ্গাদের সাথে বৈঠকের পর বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ঝ্যাং ঝু। ১১ জুন ২০১৯। [সুনীল বড়ুয়া/বেনারনিউজ]

রোহিঙ্গা শিবিরে চীনা রাষ্ট্রদূত

মঙ্গলবার কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের একটি প্রতিনিধিদলের সাথে সাক্ষাত করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ঝু ঝ্যাং।

চীনা রাষ্ট্রদূতের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন এবং রোহিঙ্গাদের সাথে বৈঠকের কথা স্বীকার করে কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম বেনারকে বলেন, “আমার সঙ্গেও তাঁর বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে প্রত্যাবাসনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। এছাড়াও তারা (চীন) আবারও বলেছে প্রত্যাবাসন বিষয়ে চীন বাংলাদেশের পক্ষে আছে, থাকবে।”

বৈঠকে রোহিঙ্গা নেতারাও চীনা রাষ্ট্রদূতের কাছে বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন বলে জানিয়েছেন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউম্যান রাইটস এর চেয়ারম্যান মুহিব উল্লাহ।

মঙ্গলবার বিকালে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ডি-৫ শরণার্থীশিবিরে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠকে বিভিন্ন ক্যাম্পের প্রায় ১৪ রোহিঙ্গা নেতা ও দুজন ক্যাম্প ইনচার্জ উপস্থিত ছিলেন।

মুহিব উল্লাহ বেনারকে বলেন, “রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরতে চান কিনা আমাদের কাছে তা জানতে চান চীনা রাষ্ট্রদূত। আমরা তাকে বলেছি, আমরা এখনই চলে যেতে রাজি আছি। এটি আমাদের দেশ নয়। আমাদের সব দাবি-দাওয়া মিয়ানমার মেনে নিলে আমরা এখানে থাকব না। আমরা নিজের দেশে স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই। নিজেদের বাড়ি ভিটায় থাকতে চাই।”

মুহিব উল্লাহ জানান, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের উদ্ধৃতি টেনে চীনা রাষ্ট্রদূত আমাদের বলেছেন, আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখে আসছি রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি নন, এ বিষয়টি কি ঠিক? আমরা তাঁকে সাফ জানিয়ে দিয়েছি এটা আমাদের কথা নয়।

তিনি বলেন, “মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর ধারাবাহিকভাবে নির্যাতন চালিয়ে আসছে। এরা যা বলে তা রক্ষা করে না। তাই আমরা এখন তাদের আর বিশ্বাস করতে পারি না।”

মহিবুল্লাহ বলেন, “তবে চীনা সরকার যদি আন্তরিকভাবে প্রত্যাবাসনের জন্য চেষ্টা করে তাহলে মিয়ানমার আমাদের দাবি মেনে নিতে পারে। তিনি আমাদের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন এবং বলেছেন, চীন রোহিঙ্গাদের ভালোবাসে।”

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিশেষ প্রতিনিধির সফর

দুদিনের বাংলাদেশ সফরে এসেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবাধিকার বিশেষ প্রতিনিধি ইমন গিলমোর।

তিনি মঙ্গলবার বিভিন্ন সরকারী কর্মকর্তাদের সাথে সভা করেছেন।

এক ‍বিবৃতিতে গিলমোর বলেন, “ঢাকায় আমি বাংলাদেশের যেসব ক্ষেত্রে উন্নয়ন প্রয়োজন যেমন মানবাধিকার ও শ্রম মান নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সভা করেছি।”

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্কে শ্রম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন কক্সবাজার থেকে সুনীল বড়ুয়া

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন