Follow us

রোহিঙ্গা গণহত্যার দায়ে সামরিক আদালতে তিন মিয়ানমার সেনাসদস্যের সাজা

বিশেষ প্রতিবেদন
2020-07-01
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে নিজের ঘরের সামনে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের গু দার পিয়ান গ্রামের সাবেক বাসিন্দা মোহাম্মদ ইউনুস। ১৪ জানুয়ারি ২০১৮।
কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে নিজের ঘরের সামনে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের গু দার পিয়ান গ্রামের সাবেক বাসিন্দা মোহাম্মদ ইউনুস। ১৪ জানুয়ারি ২০১৮।
[এপি]

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নিপীড়নের অপরাধে তিন সেনাসদস্যকে সামরিক আদালতে সাজা দেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালে রাখাইনের রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে অভিযানের সময় গণহত্যার অভিযোগে ওই তিনজনকে সাজা দেওয়া হয় বলে মঙ্গলবার জানায় দেশটির সেনাবাহিনী।

রোহিঙ্গা নিপীড়নের অভিযোগে মিয়ানমারে সেনা সদস্যদের সাজা দেবার এটি দ্বিতীয় ঘটনা।

রাখাইনের গু দার পিয়ান গ্রামের কাছে গণহত্যার দায়ে এই সাজার ঘটনাটা এমন সময় ঘটল, যখন দেশটি আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত।

রাখাইন রাজ্য ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যায় হাজারের ওপর রোহিঙ্গা নিহত হন। এর জেরে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেন।

শরণার্থীরা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গণহত্যার পাশাপাশি গণধর্ষণ, নির্যাতন ও ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেবার অভিযোগ করেন।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কাছে রোহিঙ্গারা বলেন, তাঁদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নেতৃত্বেই নিপীড়ন চালানো হয়। যার মধ্যে ছিল ২০১৭ সালের ২৭ আগস্টে বুথিডং শহরের পাশের গু দার পিয়ান গ্রামের গণহত্যা।

ওই গ্রামে গণহত্যার পর কয়েকশ লাশকে পাঁচটি গণকবরে পুঁতে ফেলা ছাড়াও এসিড দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিবৃতি অনুযায়ী, সাজাপ্রাপ্ত তিন সেনা সদস্যের মধ্যে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, একজন সেকেন্ড অফিসার ও অন্যজন ইনফেন্ট্রির সৈনিক। তবে এদের কারো নাম বা পদবি প্রকাশ করা হয়নি বিবৃতিতে।

তদন্তের সাক্ষ্যপ্রমাণ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো না হলেও বিবৃতিতে বলা হয়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয় গত বছরের নভেম্বরে।

এ বিষয় মন্তব্যের জন্য মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জ মিন তুনের সাথে বেনারের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রেডিও ফ্রি এশিয়ার পক্ষ থেকে কয়েকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

রোহিঙ্গাদের ওপর ২০১৭ সালের নির্যাতন ও গণহত্যার দায়ে বর্তমানে মিয়ামনার আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) বিচারের মুখোমুখি রয়েছে।

মিয়ানমার সীমান্তরক্ষীদের কয়েকটি ফাড়িতে রোহিঙ্গাদের জঙ্গি সংগঠনের একযোগে হামলার জবাবে রোহিঙ্গাদের ওপর ওই নিপীড়নমূলক অভিযান শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী।

তবে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর কোনো ধরনের গণহত্যার অভিযোগ গত বছর আইসিজে তে অস্বীকার করে মিয়ানমার। একই সাথে অপরাধে যুক্ত সেনাসদস্যদের কোর্ট মার্শালে বিচারের ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে দেশটি জানায়, বাইরের হস্তক্ষেপ ছাড়াই তারা অপরাধীদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে সক্ষম।

তবে মিয়ানমারে সামরিক বিচার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। একইসাথে ওই প্রক্রিয়া রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার দেয়নি বলেও অভিযোগ তাদের।

‘সারা বিশ্ব দেখছে’

সেনা সদস্যদের কোর্ট মার্শাল প্রক্রিয়ায় গ্রামবাসীসহ বাইরের কাউকে প্রবেশাধিকার দেয়া হয়নি বলে জানান বুথিডং এলাকার এক নিম্নকক্ষের সংসদ সদস্য অং থাউঙ শে।

রায়ের দিন তাঁকে আদালতে উপস্থিত হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি সেখানে উপস্থিত হতে পারেননি বলে জানান তিনি।

এদিক ইয়াঙ্গুনে বসবাসকারী মানবাধিকার আইনজীবী কী মিন্ট জানান, ওই বিচারের বিস্তারিত সবার জন্য উন্মুক্ত করা উচিত, কারণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সেনাবাহিনীকে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করতে হবে।

তিনি বলেন, “আইনমতে, স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে বিচার অনুষ্ঠিত হতে হবে।”

“সারা বিশ্ব এই প্রক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। সুতরাং এটি কখনো সামরিক গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে হতে পারে না,” বলেন কী মিন্ট।

এদিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দায়বদ্ধতা নিশ্চিতে সারা বিশ্বের চাপ থাকলেও কোর্ট মার্শালের ওই পুরো প্রক্রিয়াটিতে স্বচ্ছতা নেই বলে মন্তব্য করেছেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ভিত্তিক এনজিও ফর্টিফাই রাইটস এর মিয়ানমারের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিকি ডায়মন্ড।

“কোনো ধরনের স্বচ্ছতা ছাড়াই পুরো প্রক্রিয়াটি অনুষ্ঠিত হয়েছে,” বলেন তিনি।

রোহিঙ্গারা বিচার পায়নি

এদিকে কোর্ট মার্শালের ফলাফল নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন রোহিঙ্গা অধিকার কর্মীরা।

“এই কোর্ট মার্শাল কোনো ন্যায় বিচার নিশ্চিত করেনি,” বলেন কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোর একটিতে বসবাস করা রোহিঙ্গা নেতা খিন মঙ।

তাঁর মতে, সেনাসদস্যদের অবশ্যই বেসামরিক আদালতে বিচার হওয়া উচিত।

“শুধু তখনই বলা যাবে যে বিচার হয়েছে,” বলেন খিন মঙ।

লন্ডন ভিত্তিক রোহিঙ্গাদের সংগঠন বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশনের সভাপতি তুন খিন জানান, সেনাসদস্যদের বিচারের ওপর তাঁর কোনো আস্থা নেই।

“এই সেনা আদালত শুধু আন্তর্জাতিক চাপের মুখে একটা লোক দেখানো পদক্ষেপ। ফলে এই ধরনের কোর্ট মার্শালকে আমরা বিশ্বাস করি না, এমনকি মিয়ানমারের সার্বিক বিচার ব্যবস্থাকেও না,” বলেন তুন খিন।

মিয়ানমারের অভ্যন্তরে আন্তর্জাতিক কোনো তদন্তদল রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধের তদন্ত না করা পর্যন্ত দেশটির সেনাবাহিনীর অপরাধ উন্মোচিত হবে না বলে জানান তিনি।

তবে একেবারে কিছু না হওয়ার থেকে ওই কোর্ট মার্শাল অন্তত কিছুটা ভালো বলে মনে করেন রোহিঙ্গা নেতা আয়ে লিউইন।

“তারা স্বীকার করেছে যে গণহত্যা হয়েছে,” রেডিও ফ্রি এশিয়াকে বলেন আয়ে লিউইন।

“সুতরাং আমাদের এটিকে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করা উচিত, তবে এতে স্বচ্ছতা থাকলে অনেক ভালো হতো,” বলেন রাখাইনে জাতিগত সংঘাত নিরসনে গঠিত সরকারি কমিশনের সাবেক এই সদস্য।

দণ্ডিত হলেও ক্ষমাপ্রাপ্ত

রাখাইন রাজ্যের ইন দিন গ্রামে কয়েকজন রোহিঙ্গাকে হত্যার দায়ে ২০১৮ সালের মার্চের প্রথম কোর্ট মার্শালে চারজন সেনা কর্মকর্তা ও তিনজন সৈনিককে দশ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

ইন দিন গ্রামের গণহত্যার ছবি তোলা ও প্রকাশের দায়ে রয়টার্সের দুজন সাংবাদিককেও গ্রেপ্তার করা হয়।

তবে গ্রেপ্তার হওয়া দুই সাংবাদিকের চেয়েও কম মেয়াদ জেল খাটার পর ইন দিন গ্রামে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত সেনাসদস্যরা সাধারণ ক্ষমায় ছাড়া পেয়ে যান।

এদিকে সরকার নিয়োজিত তদন্ত কমিশনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে মং নু ও চুত পিইন গ্রামের গণহত্যার বিষয়গুলোও তদন্ত করা হবে বলে গত ফেব্রুয়ারিতে এক বিবৃতিতে জানায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী।

ওই দুই গ্রামে সেনাবাহিনীর অভিযানের সময় প্রায় ৩০০ জন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের সময় রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা সংগঠিত হয়েছে—এমন অভিযোগে গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলায় ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) গত জানুয়ারিতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কয়েকটি অন্তর্বতীকালীন আদেশ জারি করে।

আদালতের আদেশের মধ্যে রয়েছে; জাতিসংঘ কনভেনশন অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দিতে হবে, গণহত্যার প্রমাণ ধ্বংস করা যাবে না, সশস্ত্র বাহিনী ফের কোনো গণহত্যা ঘটাতে পারবে না এবং রায়ের তারিখের চার মাসের মধ্যে এ ব্যাপারে মিয়ানমারকে আদালতে প্রতিবেদন দিতে হবে।

পরবর্তীতে বিচারের চূড়ান্ত রায় প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত প্রতি ছয় মাসে একটি করে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন