Follow us

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রোহিঙ্গা শিবিরে জনবল বাড়ানো হচ্ছে

সুনীল বড়ুয়া
কক্সবাজার
2019-07-10
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
উখিয়ার মধুরছড়া রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির। ৯ জুলাই ২০১৯।
উখিয়ার মধুরছড়া রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির। ৯ জুলাই ২০১৯।
[সুনীল বড়ুয়া/বেনারনিউজ]

অপরাধ প্রবণতা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন পুলিশ, র‌্যাব এবং বিজিবির তিন প্রধান কর্মকর্তা।

“উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর যে জনবল রয়েছে তা পর্যাপ্ত নয়,” মঙ্গলবার উখিয়ার শরণার্থী শিবির পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী।

“শুধুমাত্র শরণার্থী শিবিরের জন্য দুটি পূর্ণাঙ্গ আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়ান গঠনের পাশাপাশি র‌্যাপিড অ্যাকশান ব্যাটালিয়ান (র‌্যাব), পুলিশ এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) জনবল আরও বাড়ানোর চিন্তা ভাবনা চলছে,” বলেন তিনি।

এ সময় তাঁর সাথে বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলাম, র‌্যাবের মহাপরিচালক ড. বেনজীর আহমদ, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রধান ও পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মীর শহীদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে তিন বাহিনী প্রধানের ক্যাম্প পরিদর্শনের কয়েক ঘণ্টা পরেই মঙ্গলবার দিবাগত রাতে টেকনাফের পশ্চিম লেদার শিয়াইল্যাঘোনা এলাকা থেকে অস্ত্রসহ তিন রোহিঙ্গা যুবককে আটক করেছে বিজিবি।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, রোহিঙ্গাদের অবস্থানের সময় বাড়ার সাথে সাথে তাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতাও বাড়ছে। হত্যা, মাদক ব্যবসা, অপহরণ, মানবপাচারসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে তারা, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বড় ধরনের হুমকি।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত ক্যাম্প এলাকায় রোহিঙ্গাদের হাতে ৩৪ জন খুন হয়েছেন। এ ছাড়াও এই সময়ে মাদক চোরাচালান, মানব পাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে কক্সবাজার জেলায় ১২৭জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে এক নারীসহ ২৬জন রোহিঙ্গা।

ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানবপাচারসহ নানা ধরনের অপরাধের অভিযোগে ৫৬৬জন দালালকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ক্যাম্প ছেড়ে পালানোর সময় এ পর্যন্ত কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় ৫৯ হাজার রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এ প্রতিবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করে কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. ইকবাল হোসাইন বেনারকে বলেন, “নানা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে রোহিঙ্গা এটা ঠিক। তবে পরিস্থিতি এখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নানা ধরনের অপরাধ আরও কঠোরভাবে দমন করা হবে।”

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমার সেনা অভিযান থেকে প্রাণে বাঁচতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা দেশটির রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়।

বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফে ৩৪টি আশ্রয় শিবিরে নতুন পুরোনো মিলে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে জনবল স্বল্পতা

আইজিপি বলেন, শুধুমাত্র রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্যই এই এলাকায় দুটি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ান বাড়ানোর আবেদন করেছিলাম সরকারের কাছে। এখন পর্যন্ত তার অনুমোদন পাওয়া যায়নি। একটা পাওয়া গেছে, তাও আংশিক।”

“এ অবস্থায় বিভিন্ন জেলা থেকে এডহক ভিত্তিতে ফোর্সগুলো আমরা নিয়ে আসছি। কিছুদিন পর পর আবার পরিবর্তন করতে হচ্ছে। যত দিন পর্যন্ত ব্যাটালিয়ান বাড়াতে না পারি, তত দিন এখানে আমাদের জনবল স্বল্পতা থেকেই যাবে,” বলেন তিনি।

জাবেদ পাটোয়ারী জানান, “পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি ও র‌্যাবেরও জনবল স্বল্পতা আছে। র‌্যাব সম্প্রতি এই এলাকায় একটি ব্যাটালিয়ান বাড়ালেও এখনো পর্যন্ত পর্যাপ্ত জনবল পায়নি। আমরা ব্যাটালিয়ান না হওয়া পর্যন্ত এখানকার জন্য কিছু জনবল নিয়োগ করা যায় কিনা চিন্তা করছি।”

রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তিন প্রধান কক্সবাজার শরণার্থীশিবিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনীর কর্মকর্তা এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

আইজিপি বলেন, “এখানে কী ধরনের নিরাপত্তাজনিত হুমকি আছে তা দেখেছি। এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বেনারকে বলেন, “রোহিঙ্গারা চাইলেই বিভিন্ন পাহাড়ি পথ ও ঝিরি-ছড়া দিয়ে ক্যাম্প থেকে বাইরে চলে আসতে পারে। এ জন্য কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের ওপর ৯টি চেকপোস্ট বসানোর পরেও রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প ছেড়ে বাইরে পালানো পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না।”

“ক্যাম্পে কাঁটাতারের বেড়া বা সীমানা প্রাচীর নির্মাণের প্রস্তাব জেলা পুলিশ আগেই পাঠিয়েছে। ক্যাম্পের সার্বিক পরিস্থিতি এখন তিন বাহিনী প্রধান পর্যবেক্ষণ করেছেন। আমরা আশা করছি পরিস্থিতি বিবেচনা করে কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হবে,” বলেন তিনি।

স্থানীয়দের উদ্বেগ বাড়ছে

রোহিঙ্গাদের মাঝে দিন দিন অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে।

উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আদিল চৌধুরী বেনারকে বলেন, “রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বর্তমানে স্থানীয়রা অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। এমন কোনো অপরাধ নেই যা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংগঠিত হচ্ছে না। আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।”

কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আবু তাহের চৌধুরী বেনারকে বলেন, “রোহিঙ্গারা কক্সবাজার শহরসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। যা কক্সবাজারের স্থানীয়দের এবং পর্যটন শিল্পের জন্য বিরাট হুমকি।”

“জরুরি ভিত্তিতে এবং কঠোরভাবে এসব নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটবে,” বলেন তিনি।

তিন রোহিঙ্গা আটক

মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে কক্সবাজারের টেকনাফের পশ্চিম লেদার শিয়াইল্যাঘোনা এলাকা থেকে দেশীয় অস্ত্র এবং খেলনা পিস্তলসহ তিন রোহিঙ্গা যুবককে আটক করা হয়েছে।

আটককৃতরা হলেন, হ্নীলার নয়াপাড়া শরণার্থী শিবিরের সি -ব্লকের আব্দুর রহমানের ছেলে মো. সোলতান রহমান (১৮), মোহাম্মদ আলমের ছেলে মো. আয়াছ (২০) ও মো. জোবাইরের ছেলে নুর কামাল (২০)।

নয়াপাড়া বিজিবির বিওপি ক্যাম্পের কমান্ডার সুবেদার আব্দুল কাদের বেনারকে জানান, স্থানীয়দের সহায়তায় অবৈধ অস্ত্রসহ তিন রোহিঙ্গা যুবককে আটক করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনজনই বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে জানা গেছে।

থানায় হস্তান্তর করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন