Follow us

রোহিঙ্গা গণহত্যা: তদন্তের প্রস্তুতি নিতে ঢাকায় আইসিসি প্রতিনিধিদল

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-07-16
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
মিয়ানমার সরকারি বাহিনীর নির্যাতনে রাখাইন ছেড়ে কক্সবাজারের নাফনদী পার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে একদল রোহিঙ্গা। ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭।
মিয়ানমার সরকারি বাহিনীর নির্যাতনে রাখাইন ছেড়ে কক্সবাজারের নাফনদী পার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে একদল রোহিঙ্গা। ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭।
[সুনীল বড়ুয়া/বেনারনিউজ]

নির্যাতনের মাধ্যমে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার সময় গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠিত হয়েছে কি না সেব্যাপারে মিয়ানমার জেনারেলদের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করতে পারে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)।

সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে মঙ্গলবার আইসিসি ডেপুটি প্রসিকিউটর জেসম স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসেছেন।

তাঁরা আগামী ২০ ও ২১ জুলাই কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর থেকে তাঁদের ওপর সংগঠিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, বিশেষ করে তাঁদেরকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার ব্যাপারে তথ্য, উপাত্ত ও ঘটনা রেকর্ড করে আইসিসি প্রসিকিউটরদের প্রতিবেদন দেবেন। বেনারকে এসব তথ্য জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

আর ওই প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করছে আইসিসি বিচারকেরা মিয়ানমারে সংগঠিত অপরাধ পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরুর নির্দেশ দেবেন কি না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ অনুবিভাগের মহাপরিচালক নাহিদা সোবহান বেনারকে বলেন, “আইসিসি প্রতিনিধিদলটি আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশে এসেছে। তাদের কাজের সাথে বাংলাদেশ সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তারা স্বাধীনভাবে কাজ করছে। আমরা শুধু তাদের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো দেখছি।”

তিনি বলেন, “আইসিসি প্রতিনিধিদলটি ২০ এবং ২১ জুলাই কক্সবাজার গিয়ে রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলবেন বলে আমাদের জানিয়েছেন।”

আইসিসির ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুসারে, ৪ জুলাই মিয়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর সদস্যদের জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া এবং তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, ধর্ষণ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ তদন্ত শুরু করতে আইসিসি বিচারকদের আহ্বান জানান আইসিসির প্রসিকিউটর ফাতু বেনসুদা।

তার এই আহ্বানের ১২ দিনের মাথায় আইসিসির প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এলো।

আইসিসির প্রসিকিউটরের কার্যালয় গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং আগ্রাসন অপরাধের ব্যাপারে স্বাধীনভাবে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, তদন্ত এবং তার ভিত্তিতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে অভিযোগ আনতে পারে।

এর আগে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধের ব্যাপারে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গত মার্চে আইসিসি’র একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে প্রতিবেদন তৈরি করেন।

সেই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধসমুহ তদন্ত করার অনুমতি প্রার্থনা করেন আইসিসি প্রসিকিউটর ফাতু বেনসুদা।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমদ বেনারকে বলেন, “আইসিসির যে প্রতিনিধি এসেছে তারা এখানে ভিকটিমদের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় তথ্য, উপাত্ত ও প্রমাণাদি সংগ্রহ করে আইসিসি প্রসিকিউটরের কাছে জমা দেবেন।”

তিনি বলেন, “ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইসিসির বিচারকেরা সিদ্ধান্ত দেবেন যে আইসিসির প্রসিকিউটর মিয়ানমারের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে পারবে কি না। যদি তদন্তের অনুমতি মেলে, তবে আইসিসির প্রসিকিউটর দেখবেন মিয়ানমার থেকে জোর করে রোহিঙ্গাদের ঠেলে পাঠানোর সময় যুদ্ধাপরাধসহ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংগঠিত হয়েছে কি না।”

ব্যারিস্টার শফিক বলেন, “প্রসিকিউটরের তদন্ত প্রতিবেদনের পর আদালত মতামত দেবেন যে তারা তদন্ত প্রতিবেদনটি আমলে নিলেন কি না। আমলে নিলে বিচার শুরু হবে।”

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ আইসিসি অনুমোদনকারী দেশ। তবে মিয়ানমার নয়। তারা আইসিসির বিচার বাধাগ্রস্ত করতে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে।”

মার্চে বাংলাদেশে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আইসিসি প্রসিকিউটর অফিসের কর্মকর্তা ফাসিকো মকোচকো সাংবাদিকদের জানান, মিয়ানমার রোম স্ট্যাটিউটে অনুস্বাক্ষরকারী দেশ না হলেও সেখানে সংগঠিত অপরাধ তদন্ত করার ম্যানডেট রয়েছে।

ব্যারিস্টার শফিক বলেন, “আন্তর্জাতিক আদলতে বিচার শুরু করা গেলে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাধ্য হবে। বাংলাদেশের উচিত আইসিসি’র বিষয়টি ভালোভাবে প্রয়োগ করা।”

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারকে বলেন, বাংলাদেশের অবস্থান হলো: আমরা মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি। আর এখন রোহিঙ্গাদের ফিরে যেতে হবে অর্থাৎ পুনর্বাসন হতে হবে। আর সংগঠিত অপরাধের বিচার হতে হবে।

তিনি বলেন, “এই তিনটি বিষয় নিয়ে যারা বাংলাদেশের সহায়তা চাইবে আমরা তাদের সাহায্য করব। আইসিসি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধের বিচারের কথা বলছে। সুতরাং, বাংলাদেশে তাদের নিরাপত্তাসহ অন্যান্য সহযোগিতা করতে প্রস্তত।”

ওই কর্মকর্তা বলেন, “আইসিসি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরুর অনুমতি দিলে মিয়ানমারকে আমরা চাপে রাখতে পারব। তখন তারা রোহিঙ্গাদের নিতে রাজি হবে।”

রোহিঙ্গা নেতা শহীদউল্ল্যাহ বেনারকে বলেন, “গত মার্চে আমাদের সাথে আইসিসি কর্মকর্তারা বৈঠক করেছেন। আমরা তাদের জানিয়েছি, আমাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের নির্যাতন করেছে মিয়ানমার মিলিটারি।”

তিনি বলেন, “যারা আমাদের হত্যা করেছে, মা-বোনদের ধর্ষণ করেছে, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করেছে, গণহত্যা চালিয়েছে সেই মিলিটারিদের বিচার চাই।”

জোর করে রাখাইনে তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি থেকে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আইসিসির প্রাক্‌-বিচারিক শুনানি আদালত গত বছরের সেপ্টেম্বরে তদন্তের সিদ্ধান্ত নেন।

২০১৮ সালের আগস্টে জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান মিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গণহত্যার উদ্দেশ্যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জেনারেলরা রোহিঙ্গাদের রাখাইন থেকে বল প্রয়োগ করে বিতাড়িত করেছে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন