ভাসানচর থেকে পালানোর পথে নৌকাডুবি, নিখোঁজ ২৬ রোহিঙ্গা

আবদুর রহমান
কক্সবাজার
2021-08-15
Share
ভাসানচর থেকে পালানোর পথে নৌকাডুবি, নিখোঁজ ২৬ রোহিঙ্গা ভাসানচরে যাবার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর জাহাজে উঠতে যাচ্ছেন রোহিঙ্গারা। ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১।
[এপি]

নোয়াখালীর ভাসানচর দ্বীপ ছেড়ে পালানোর সময় বঙ্গোপসাগরের চট্টগ্রাম অংশে ট্রলার ডুবিতে শিশুসহ অন্তত ২৬ জন নিখোঁজ হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছেন কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার এডমিরাল এম আশরাফুল হক। 

তিনি জানান, এর মধ্যে বারোজন রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে স্থানীয় জেলেরা ভাসানচর পৌঁছে দিয়েছেন। নিখোঁজ বাকিদের উদ্ধারে কোস্ট গার্ড, নৌ বাহিনী এবং পুলিশ সদস্যরা রোববার বিকেল চারটা পর্যন্ত সাগরে অভিযান অব্যাহত রাখেন, তবে এখন পর্যন্ত অন্য কাউকে পাওয়া যায়নি। 

“ভাসানচর থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় রোহিঙ্গাদের নিয়ে একটি ট্রলার সমুদ্রের চট্টগ্রাম অংশে ডুবে গেছে। তাঁদের কয়েকজনকে উদ্ধার করে নিজ নিজ ক্যাম্পে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে,” শনিবার ভোরে ঘটা এই ট্রলার ডুবি প্রসঙ্গে রোববার দুপুরে বেনারকে জানান ভাসানচরে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) প্রতিনিধি ও ক্যাম্প ইনচার্জ (সিআইসি) সুঞ্জিত কুমার চন্দ। 

ভাসানচরের রোহিঙ্গা নেতাদের কাছ থেকে ট্রলারে থাকা নিখোঁজদের একটি তালিকা পাওয়া গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, “সেটি যাচাই-বাচাই চলছে। অন্যদিকে নৌ বাহিনী সমুদ্রে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।” 

কোস্টগার্ড জানায়, শনিবার ভোর রাতে রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু বোঝাই একটি ট্রলার ভাসানচর থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেয়। চর ছেড়ে দুই থেকে আড়াইঘণ্টা চলার পর ট্রলারটি সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়ার কারণে উল্টে গিয়ে ডুবে যায়। 

ঘটনাস্থলের কাছাকাছি মাছ ধরা ট্রলারের জেলেরা ডুবন্ত কয়েকজনকে উদ্ধার করে ভাসানচরে পৌঁছে দেন। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী নিখোঁজদের সন্ধানে সাগরে নামে কোস্টগার্ড। 

চট্টগ্রামের কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট এম আব্দুর রউফ বেনারকে বলেন, “নিখোঁজদের সন্ধানে কোস্টগার্ডের দুটি জাহাজ বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধান অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভাসানচর থেকে ১৫ থেকে ২০ নটিক্যাল মাইল দূরে দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরে এ ঘটনা ঘটেছে।” 

তবে রোববার বিকেল পর্যন্ত “জীবিত বা মৃত কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি,” জানান তিনি। 

ভাসানচরের আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি গুচ্ছগ্রামের ‘ফোকাল’ (সমন্বয়ক) রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ জুবাইর বেনারকে জানান, ‘নিখোঁজদের দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব না হলে তাঁদের প্রাণহানির শঙ্কা রয়েছে।” 

তিনি বলেন, গত কয়েক মাস ধরে ভাসানচর থেকে রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ পালানোর চেষ্টা করছে। এদের কেউ কেউ পালানোর সময় বিভিন্ন জায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ছে। 

এদিকে ভাসানচর থেকে পালানোর চেষ্টাকালে সাগরে রোহিঙ্গা নৌকাডুবির ঘটনায় খুবই ‘মর্মাহত’ বলে রোববার এক বিবৃতিতে জানায় জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। 

ঘটনার বিষয়ে আরো তথ্যের জন্য সংস্থাটি সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে জানিয়ে জীবিতদের উদ্ধার করার জন্য স্থানীয় জেলেদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায় সংস্থাটি। 

ভাসানচর থেকে কেন পালাচ্ছে

শুক্রবার সন্ধ্যায় ভাসানচর থেকে বের হয়ে রাত ১২ টার দিকে ট্রলারে ওঠেন বশির আহম্মদ (২২)। মা-বাবা, স্ত্রী ও সন্তানসহ পরিবারের এগারো সদস্য নিয়ে কক্সবাজার রোহিঙ্গা শিবিরের উদ্দেশে রওনা দেয়ার পথে সমুদ্রে ট্রলার ডুবির ঘটনায় বেঁচে যান বশির। 

রোববার দুপুরে ভাসানচর থেকে মুঠোফোনে বশির বেনারকে জানান, “ভাসানচরে দুই স্ত্রীসহ পরিবারের ৬ সদস্য নিয়ে বসবাস করে আসছিলাম। কিছু দিন যেতেই সেখানে খাবার এবং চিকিৎসা নিয়ে বিপদে পড়ি। যে খাবার পাই, তাতে আমার পরিবারের সদস্যদের চাহিদা পূরণ হতো না।” 

“একই রকম খাবার খেয়ে সবাই বিরক্ত। আবার উপার্জনেরও সুযোগ নেই,” জানিয়ে বশির বলেন, “শুক্রবার সন্ধ্যায় ভাসানচর থেকে বের হয়ে জঙ্গলের ভেতরে প্রায় ছয় ঘণ্টা হেঁটে ট্রলারে উঠি। সেখানে পৌঁছে দেখি শিশুসহ আরো অনেক লোক। আমরা পরিবারের ১১ জন সদস্য ছিলাম।”

“এখান থেকে প্রত্যেকের ভাড়া ৭ হাজার টাকা। এর বিনিময়ে চট্টগ্রামে পৌঁছে দেবার কথা ছিল,” জানান তিনি। 

ট্রলারটি ছাড়ার দেড় ঘণ্টা পরে ঝড়ো হাওয়ায় উল্টে যায় জানিয়ে বশির বলেন, “আমার মেয়ের একটি জামা ছাড়া আর সব কিছু সব হারিয়ে ফেলেছি। পরিবারের ৬ জন বেঁচে গেছে, বাকিদের খোঁজ পাইনি।” 

গত ডিসেম্বরে রোহিঙ্গাদের কক্সবাজার থেকে ভাসানচর স্থানান্তর শুরু হওয়ার পর এপ্রিল পর্যন্ত কয়েক দফায় আঠারো হাজারের বেশি রোহিঙ্গা সেখানে পৌঁছান। এদের মধ্য গত কয়েক মাসে প্রায় তিন’শ মানুষ দ্বীপ ছেড়ে পালিয়েছেন বলে জানিয়েছেন সেখানকার শরণার্থী নেতারা, তবে পুলিশের মতে সংখ্যাটি আরো কম এবং পালাতে গিয়ে ধরাও পড়েছেন কয়েকজন। 

সর্বশেষ শুক্রবার বিকেলে ভাসানচর থেকে পালানোর সময় সুবর্ণচর থেকে পাঁচ শিশুসহ আট রোহিঙ্গাকে আটক করার কথা বেনারকে জানিয়েছেন চরজব্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিয়াউল হক। 

তিনি বলেন, “ভাসানচর থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের শনিবার সকালে ভাসানচরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আটক রোহিঙ্গারা দালালের মাধ্যমে ভাসানচর থেকে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে যাচ্ছিল।” 

তবে এখন পর্যন্ত ভাসানচর থেকে “কতজন পালিয়ে গেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই,” বলে বেনারকে জানান ভাসানচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন