Follow us

ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের নির্যাতন করছে মিয়ানমার: এইচআরডব্লিউ

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2018-08-21
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
রাখাইনের মংডুতে বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্যরেখায় কাঁটাতারের বেড়ার বাইরে মিয়ানমার বর্ডার গার্ডের পাহারা। ২৯ জুন ২০১৮।
রাখাইনের মংডুতে বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্যরেখায় কাঁটাতারের বেড়ার বাইরে মিয়ানমার বর্ডার গার্ডের পাহারা। ২৯ জুন ২০১৮।
এপি

প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর জীবিকার তাগিদে পুনরায় রাখাইনে ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনী নির্যাতন করছে বলে অভিযোগ করেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডিব্লিউ)।

মঙ্গলবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংগঠনটির এশিয়া অণুবিভাগের উপ-পরিচালক ফিল রবার্ট এই অভিযোগ করেন।

সংগঠনটির মতে, প্রত্যাবাসিত হলে রাখাইনে শরণার্থীদের নিরাপত্তা দেয়া হবে বলে মিয়ানমার যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের মাধ্যমে সেই নিশ্চয়তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে বলা যেতে পারে।

সে কারণেই প্রত্যাবাসনের আগে জাতিসংঘের তত্বাবধানে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আন্তর্জাতিক সুরক্ষা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন ফিল রবার্ট।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরাও মনে করেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের আগে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতি অনুযায়ী, ২০১৭ সালে রাখাইন থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর ছয়জন রোহিঙ্গা জীবিকার তাগিদে পুনরায় রাখাইনে প্রবেশ করে। তবে তাঁদের ধরে ফেলে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী।

ওই ছয়জনকে নির্যাতনের মাধ্যমে জঙ্গি গোষ্ঠী আরসার সাথে তাঁদের সম্পর্ক রয়েছে তা স্বীকার করাতে চেষ্টা চালায় মিয়ানামার নিরাপত্তা বাহিনী।

তাঁরা সেব্যাপারে রাজি না হওয়ায় সংক্ষিপ্ত বিচারের মাধ্যমে তাঁদেরকে চার বছরের জেল দেয়া হয়।

এর কিছুদিন পর তাঁদের জানানো হয়, মিয়ানমারের রাষ্ট্রপতি যে কয়জন রোহিঙ্গার সাজা মওকুফ করেছেন তাঁদের মধ্যে তাঁরাও আছেন। ছেড়ে দেয়ার পর তাঁদেরকে বিতর্কিত জাতীয় যাচাই কার্ড (এনভিসি) নিতে বলা হয়।

ওই ছয় রোহিঙ্গা কার্ড নিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁদের পুনরায় গ্রেপ্তারের ভয় দেখানো হয়।

এমনকি, কিছু বিদেশির সামনে মিয়ানমার সরকারের পক্ষে সাফাই গাইতে তাঁদের দিয়ে বিবৃতি পড়ানো হয়। তাঁরা সেই ‍বিবৃতি ভিন্নভাবে দেয়ার চেষ্টা করলে তাঁদের সরিয়ে নেয়া হয়।

পরে ওই ছয় রোহিঙ্গা পুরনায় বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। চলতি বছরের জুলাই মাসে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কক্সবাজারে তাঁদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে বলে বেনারকে জানান ফিল রবার্ট।

তবে বেনারনিউজের পক্ষ থেকে চেষ্টা করেও এই প্রতিবেদন সম্পর্কে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের কোনো মন্তব্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জতিক বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউট এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হুমায়ূন কবির বেনারকে বলেন, “দেখুন রাখাইনে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ যে সৃষ্টি হয়নি সে ব্যাপারে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।”

তিনি বলেন, ফিরে যাওয়া মানুষদের নির্যাতনের ঘটনা খুবই দুঃখজনক।

হুমায়ূন কবির বলেন, আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর প্রতিবেদন যে ভুল নয় মিয়ানমার তার কার্যক্রমের মাধ্যমে তা বুঝিয়ে দিচ্ছে। তাদের কাছে রোহিঙ্গারা যে নিরাপদ নয় সেকথা বলা যায়।

রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবির বলেন, “এখানে দুটি পক্ষ রয়েছে। একটি হলো রোহিঙ্গারা আর অন্যপক্ষ হলো মিয়ানমার সরকার। আমরা বাংলাদেশ যতই চেষ্টা করি রোহিঙ্গারা নিজেরা যদি রাখাইন ফিরে যেতে নিরাপদ বোধ না করে তাহলে তারা যাবে না।”

তাঁর মতে, “এখন রোহিঙ্গাদের মধ্যে নিরাপত্তার বোধ সৃষ্টির দায়িত্ব মিয়ানমারের। তাদের এমন কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে শরণার্থীরা রাখাইন ফেরা নিরাপদ মনে করে।”

তিনি বলেন, “যেহেতু মিয়ানমার এখনো সেই নিরাপদ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারেনি, সেহেতু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের মাধ্যমে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চিন্তা করা যেতে পারে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বেনারকে বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাসাবনের ব্যাপারে গত এক বছর ধরে মিয়ানমার বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ‘মিষ্টি’ কথা বলে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তব কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

তিনি বলেন, প্রত্যাবাসন সম্পর্কে মিয়ানমারের পদক্ষেপ খুবই ‘প্রতিকী’।

তাঁর মতে, “যেমন মিয়ানমার রাখাইনে প্রত্যাবাসিতদের জন্য একটি ট্রানজিট ক্যাম্প তৈরি করেছে যেখানে মাত্র ত্রিশ হাজার মানুষ থাকতে পারবে। সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলদেশের যে প্রতিনিধিদল রাখাইন সফর করে ফিরেছে তারাও বলেছে রাখাইনের পরিস্থিতি খুব ভালো নয়।”

অধ্যাপক দেলোয়ার বলেন, “আসলে মিয়ানমারের এ ধরনের প্রতিকী ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যাতে মিয়ানমারের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ।”

তিনি বলেন, “রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারকে বাধ্য করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত প্রতিকী পদক্ষেপের পরিবর্তে দেশটির ওপর কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন