Follow us

রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সরকার কঠোর অবস্থানে

কামরান রেজা চৌধুরী ও সুনীল বড়ুয়া
ঢাকা ও কক্সবাজার
2019-09-06
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কক্সবাজারের উখিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা। ২৯ জুলাই ২০১৯।
কক্সবাজারের উখিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা। ২৯ জুলাই ২০১৯।
[সুনীল বড়ুয়া/বেনারনিউজ]

দুই দফা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ার পর গত ২৫ আগস্ট অনুষ্ঠিত বিশাল সমাবেশ থেকে নাগরিকত্ব ছাড়া মিয়ানমারে ফিরে না যাওয়ার ঘোষণা দেন রোহিঙ্গা নেতারা। ওই সমাবেশের পর রোহিঙ্গা​দের ওপর কঠোর হতে শুরু করেছে সরকার।

২৮ আগস্ট রোহিঙ্গা বিষয়ক জাতীয় টাস্ক ফোর্সের সভায় ওই সমাবেশ নিয়ে আলোচনা হয়। কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় সেদিন (২৫ আগস্ট) রাজনৈতিক কর্মসূচির মতো প্রতিবাদ সমাবেশ করায় রোহিঙ্গাদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত নেয় টাস্কফোর্স।

ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বেনারকে বলেন, রোহিঙ্গাদের বিশাল সমাবেশের কারণে সরকার বিব্রত। তিনি বলেন, টাস্ক ফোর্সের সভায় রোহিঙ্গাদের ওই সমাবেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

ডা. এনাম বলেন, “রোহিঙ্গাদের সমাবেশের ব্যাপারে শরণার্থী ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিশনার জানতেন। কিন্তু এ ব্যাপারে ত্রাণ, স্বরাষ্ট্র বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়নি। তারা এতো বড় সমাবেশ করল আর সরকার বিষয়টি জানল না, এমন ঘটনায় সরকার বিব্রত।”

তিনি বলেন, “তাঁদের ও স্থানীয়দের নিরাপত্তার জন্য আমরা শিবিরের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

সর্বশেষ বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় বলা হয়, রোহিঙ্গাদের অবস্থান দীর্ঘায়িত হলে তা দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প থেকে পালানো রোধ করতে ক্যাম্পের চারিদিকে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের সুপারিশ করা হয়।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি কর্ণেল (অব.) ফারুক খান বেনারকে বলেন, “রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের দুবছর পার হয়ে গেছে। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অবস্থান দীর্ঘায়িত হলে তা হবে বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। আমরা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পুনরায় দ্রুত শুরু করার জন্য সরকারকে সুপারিশ করেছি।”

তিনি বলেন, “রোহিঙ্গাদের অনেকে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। তাদের পালানো বন্ধ করতে ক্যাম্পের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের সুপারিশ করেছি।”

ফারুক খান বলেন, “মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু তারা এখন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সমাবেশ করছে। এগুলোকে সিরিয়াসলি নিতে হবে।”

শরণার্থী কমিশনার বদলি

রোহিঙ্গাদের সমাবেশের তথ্য সরকারকে অবহিত না করায় শরণার্থী ত্রাণ ও পূনর্বাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালামসহ আরও তিন কর্মকর্তাকে কক্সবাজার থেকে অন্যত্র বদলি করেছে, এমন গুঞ্জন রয়েছে। তবে সরকার বলছে, তিন বছর সরকারি দায়িত্ব পালন করার পর এটা সাধারণ বদলি।

রোহিঙ্গাদের সমাবেশের কয়েক দিনের মাথায় শরণার্থী কমিশনার আবুল কালামকে বদলি করা হয়। গত বৃহস্পতিবার তিনি সর্বশেষ অফিস করেছেন।

যুগ্ম সচিব মো. মাহবুব আলম তালুকদারকে নতুন শরণার্থী ত্রাণ ও পূনর্বাসন কমিশনার পদে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।

বদলির বিষয়ে আবুল কালাম বেনারকে বলেন, “সরকার যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো কর্মকর্তাকে বদলি করতে পারে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।”

নজরদারি মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটে

ইতিমধ্যে রোহিঙ্গাদের কাছে মোবাইল সিমকার্ড বিক্রি নিষিদ্ধ করার বিষয়টি কার্যকর করার চেষ্টা শুরু হয়েছে। এ ছাড়া রাতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করতে মোবাইল কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন—বিটিআরসি।

কমিশনের চেয়ারম্যান জহুরুল হক বেনারকে বলেন, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের নাগরিক নয় বিধায় তারা বাংলাদেশি মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবে না। তিনি বলেন, তারা অবৈধভাবে নয় লাখ বাংলাদেশি সিম কার্ড ব্যবহার করছে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

চাপের মুখে বেসরকারি সংস্থা

প্রত্যাবাসন বিরোধী ভূমিকা রাখার জন্য ৪১টি বেসরকারি সংস্থাকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গত ৩১ আগস্ট সাংবাদিকদের এ কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “রোহিঙ্গা সমস্যা সৃষ্টির পর ১৩৯টি এনজিও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছিল। এদের মধ্যে অপকর্মে জড়িত থাকায় ৪১টি এনজিওকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।”

এদিকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনবিরোধী উস্কানি এবং সমাবেশ আয়োজনে গোপন সহায়তার অভিযোগে কক্সবাজারে আল মারকাজুল ইসলাম ও এডিআরএ নামে দুটি এনজিও’র কার্যক্রম গত ৪ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধের কথা জানিয়েছে এনজিওবিষয়ক ব্যুরো।

ফারুক হত্যার পর স্থানীয়দের ক্ষোভ

গত ২২ আগস্ট টেকনাফে রোহিঙ্গাদের হাতে যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ ওমর ফারুক হত্যার পর স্থানীয় জনগণের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ওই ঘটনায় কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ এ পর্যন্ত পৃথক তিনটি ঘটনায় চারজন নিহত হয়েছেন, যাদের সবাই রোহিঙ্গা।

কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল বেনারকে বলেন, রোহিঙ্গাদের হাতে যুবলীগ নেতা ফারুক হত্যার পর তাদের ব্যাপারে জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন থেকে প্রাণ বাঁচাতে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে চলে আসেন। নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে বর্তমানে ১২ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে বিভিন্ন শিবিরে অবস্থান করছেন।

পুলিশ-প্রশাসন কী বলছে

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসেন বেনারকে বলেন, রোহিঙ্গাদের আগমনের পর জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এ জন্য আইনশৃংখলা বাহিনীর তৎপরতা আরও বাড়ানো হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে উখিয়ায় ছয়টি এবং টেকনাফে একটি পুলিশ ক্যাম্প রয়েছে। টেকনাফে আরও দুটি পুলিশ ক্যাম্প করা হবে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা শিবিরে বিভিন্ন বাহিনীর যৌথ টহল জোরদার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দুটি আর্মড ফোর্স ব্যাটালিয়ানের মধ্যে একটির কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আশরাফুল আবসার বেনারকে জানান, রোহিঙ্গা পরিস্থিতি সামাল দিতে সম্প্রতি কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মন্ত্রী পরিষদ সচিব বরাবর বিভিন্ন সুপারিশ পাঠানো হয়েছে।

“সুপারিশে ক্যাম্পগুলোতে কাঁটা তারের বেড়া স্থাপন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ২৪ ঘন্টা ক্যাম্পে অবস্থান, ক্যাম্পের ভেতরে গড়ে ওঠা হাট–বাজার ও দোকান-পাট সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণে আনা, রোহিঙ্গাদের নগদ টাকা ও নন ফুড আইটেম বিতরণ বন্ধ করা, রোহিঙ্গাদের চাকরি না নেওয়াসহ ১৫ দফা প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে,” জানান আশরাফুল।

আলোচনায় আরসা, প্রমাণ নেই

আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউম্যান রাইটস এর চেয়ারম্যান মুহিব উল্লাহ বেনারকে বলেন, “আরসা নামে সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যরা সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন করে, মাঝে মাঝে আমাদের কাছে এ রকম কিছু খবর আসে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছেও অনেকে অভিযোগ দিয়েছে। অনেকবার অভিযানও চালানো হয়েছে। তবে আমাদের কাছে তাদের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।”

পুলিশ কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন বলেন, কক্সবাজারে আরসা বা অন্য কোনও সন্ত্রাসী সংগঠন সক্রিয়—এমন তথ্য পুলিশের কাছে নেই।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন