Follow us

শর্ত ছাড়াই মিয়ানমার ফিরতে চান হিন্দু রোহিঙ্গারা

বিশেষ প্রতিবেদন
2019-09-13
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে নবজাতক সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে আছেন একজন হিন্দু রোহিঙ্গা নারী। ১৫ নভেম্বর ২০১৮।
কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে নবজাতক সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে আছেন একজন হিন্দু রোহিঙ্গা নারী। ১৫ নভেম্বর ২০১৮।
[এএফপি]

মিয়ানমারের রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া হিন্দু রোহিঙ্গারা স্বদেশে ফিরে যেতে চান। মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সুচির কাছে তাঁরা ফেরার আকুতি জানিয়েছেন এমন একটি ভিডিও বেনারনিউজের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রেডিও ফ্রি এশিয়ার হাতে এসেছে।

২০১৭ সালের আগস্ট মাসে জঙ্গি সংগঠন আরাকান সলভেশন আর্মি (আরসা) মিয়ানমারের সীমান্ত চৌকিতে হামলা করলে দেশটির সেনাবাহিনী রাখাইনে নিষ্ঠুর অভিযান শুরু করে। এসময় সাড়ে সাত লাখের মতো মুসলিম রোহিঙ্গার সাথে কয়েকশ’ হিন্দু রোহিঙ্গাও বাংলাদেশে আশ্রয় নেন।

বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার বাস্তুচ্যুত এই জনগোষ্ঠীকে রাখাইনে প্রত্যবাসনের জন্য চুক্তি করলেও গত দুই বছরে একজনকেও ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।

মিয়ানমার সরকার তাঁদের পূর্ণাঙ্গ নাগরিকত্ব ও জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি, মৌলিক অধিকার এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না দেওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গারা স্বদেশে ফিরতে রাজি নন।

রোহিঙ্গারা শতবর্ষ ধরে মিয়ানমারে বৈধ নাগরিক হিসেবে বসবাস করে আসলেও ১৯৮২ সালে একটি আইন করে মিয়ানমার তাঁদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়।

জাতিসংঘে গঠিত রোহিঙ্গা বিষয়ক আনান কমিশনের সদস্য আয়ে লিইউইন বলেছেন, “রোহিঙ্গারা শনাক্তকরণ কার্ড ছাড়াই মিয়ানমারের জাতীয় সংখ্যালঘু জাতিসত্ত্বা হিসেবে স্বীকৃতি চায়। নাগরিকত্ব মেনে নেওয়া এবং জাতীয় সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে স্বীকৃতির মধ্যে বিস্তর তফাৎ আছে।”

“তাঁদের এই দাবিটির কারণে সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এ কারণে আমরা তাঁদের এই দাবিটি পরবর্তীতে উত্থাপনের পরামর্শ দিয়েছিলাম,” বলেছেন আয়ে।

‘আমাদের কোনো দাবি নেই

বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে থাকা হিন্দু রোহিঙ্গারা বেনারকে জানান, তাঁরা মিয়ানমারে ফিরে যেতে ইচ্ছুক। মিয়ানমার সরকার তাঁদেরকেও বিদেশি হিসেবে আখ্যায়িত করে জাতীয় শনাক্তকরণ কার্ড দেবার প্রস্তাব দিয়েছে। তারপরও তারা প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে মুসলিম রোহিঙ্গাদের মতো নাগরিকত্বের শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন না।

কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী শিশু শীল (৩২) বেনারকে বলেন, তাঁর মতো কয়েকশ’ হিন্দু রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে যেতে প্রস্তুত।

“আমাদের ফিরিয়ে নিলে আমরা যাব। কারণ, মিয়ানমার সরকার আমাদের কোনো হয়রানি করেনি। বাংলাদেশ সরকারও আমাদের হয়রানি করছে না,” বলেন শিশু শীল।

তিনি বলেন, “আমরা ভিনদেশে থাকতে চাই না। আমাদের কোনো দাবি নেই। শুধু এতটুকু আশ্বাস চাই যে মিয়ানমারে গেলে আরসা বাহিনী আমাদের ক্ষতি করবে না।”

একান্ন বছর বয়সী মিন্টু রুদ্রও জানান, তিনি মিয়ানমারে ফিরতে চান।

“মিয়ানমার সরকার আমাদের উপর অত্যাচার করেনি। বরং কালো মুখোশ পরা (আরসা জঙ্গিরা) লোকজন অত্যাচার করেছে,” বলেন মিন্টু রুদ্র।

তিনি বলেন, “আমাদের কোনো দাবি নেই। মিয়ানমার সরকার আমাদের যে জায়গায় রাখতে চায় সেখানেই আমরা যাব। সবাই না গেলেও আমাদের (হিন্দু) চার-পাঁচশ লোক যাবে,” বলেন তিনি।

একই শিবিরে মেয়েকে নিয়ে থাকেন ৫৭ বছরের সোনাবালা। তিনি ও তাঁর মেয়ে দু’জনই মিয়ানমারে ফিরতে চান বলে জানান। রাখাইনের সহিংসতায় এ পর্যন্ত তিনি তিনবার বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হয়েছেন জানিয়ে সোনাবালা বলেন, “কতবার আমরা এভাবে আসা-যাওয়া করব?”

এদিকে মিয়ানমার সরকারের মন্ত্রী মিন থু বলেছেন, তাঁরা হিন্দুদের প্রত্যাবাসনের জন্য অপেক্ষায় আছেন।

“আমরাও তাঁদের (রোহিঙ্গাদের), বিশেষ করে হিন্দুদের, প্রত্যাবাসন চাই। এনিয়ে আমরা বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাব,” বলেন তিনি।

 

 

‘আমরা হিন্দু-মুসলমান আলাদা করি না’

যেদিন আরসা জঙ্গিরা মিয়ানমারের নিরাপত্তা চৌকিতে আক্রমণ করেছিল সেদিনই তাদের একটি দল রাখাইনে হিন্দু গ্রামগুলোতে প্রায় একশ হিন্দু নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে। এমনকি তারা কিছু হিন্দু নারীকে অপহরণ করে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে নিয়ে বলপূর্বক ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করে।

মিয়ানমার সরকারের তথ্য অনুযায়ী, সন্ত্রাসী হামলা এবং পরবর্তী সেনা অভিযানের প্রেক্ষিতে প্রায় ৩০ হাজার হিন্দু ও অন্যান্য অমুসলিম জনগোষ্ঠি উত্তর মিয়ানমার থেকে দক্ষিণের মারুক ইউ, সিত্তিউ, কাউতাও এবং মিনবিয়া অঞ্চলে আশ্রয় নেয়। কয়েকশ হিন্দু বাংলাদেশেও চলে যায়।

২০১৮’র জানুয়ারিতে মিয়ানমার সরকার শনাক্তকরণ ছাড়াই বাংলাদেশ থেকে ৪৪৪ জন হিন্দু এবং ৭৮০ জন মুসলিম রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার তাতে সম্মতি দেয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার এম শামিম আহমেদ বেনারকে বলেছেন, “বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের হিন্দু বা মুসলিম হিসেবে আলাদা করে দেখে না।”

“কে হিন্দু, কে মুসলিম, কে খ্রিস্টান আমরা এভাবে আলাদা করে দেখি না। তারা সবাই রোহিঙ্গা। তাঁদের প্রত্যাবাসনের একটা প্রক্রিয়া আছে,” বলেন তিনি।

২০১৭ সালের চুক্তি অনুযায়ী কয়েক হাজার রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন বিষয়ে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সম্মত হলেও কোনো রোহিঙ্গা ফিরে যেতে চায়নি।

মিয়ানমার সরকারের উপর রোহিঙ্গাদের আস্থা নেই। কারণ সরকার তাদের স্বীকৃতি দেয়নি এবং হত্যা, গণধর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগের মতো অপরাধের পরও সেনা সদস্যদের বিচার করেনি। জাতিসংঘের তদন্ত কমিটি মিয়ানমারের শীর্ষস্থানীয় সেনা কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের আহ্বান জানিয়েছে।

জাতিসংঘে মিয়ানমারের স্থায়ী প্রতিনিধি হাও দো সুয়ান বলেছেন, “রোহিঙ্গারা একই সঙ্গে পূর্ণ নাগরিকত্ব এবং জাতীয় জনজাতি হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জানাচ্ছে, যা অযৌক্তিক।”

তিনি বলেন, “জাতীয় জনজাতিসমূহ আগে থেকেই স্বীকৃত। সেটা পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে অসম্ভব করে তুলবে।”

“কিন্তু হিন্দু শরণার্থীরা কোনো দাবি জানায়নি। ফিরে আসার পর আমরা তাদের যেরকমভাবে স্বীকৃতি দেবো, তাতেই তারা রাজি। এটাই বাস্তবায়নযোগ্য,” বলেন হাও দো।

তাঁদের ঘরে ফেরার অধিকার আছে

হিন্দু রোহিঙ্গারা বেনারের কাছে তাঁদের ফিরে যাওয়ার আগ্রহের কথা জানালেও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইএনএইচসিআর বলছে কোনো শরণার্থীই স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে চান এমন ইঙ্গিত দেননি।

ব্যাংককে ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র ক্যারোলিন গ্লুক গত ৬ সেপ্টেম্বর রেডিও ফ্রি এশিয়াকে বলেছেন, “শরণার্থীরা ফিরে যেতে চাইলে তাঁদের অধিকার আছে। এটা আমরা সব সময় বলেছি। কিন্তু আমার জানামতে হিন্দু বা মুসলিম কোনো শরণার্থীর কাছ থেকেই বর্তমান পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ আমাদের কার্যালয়ে আসেনি।”

বাস্তুচ্যুত কিছু হিন্দু বলছেন, তাঁরা তাঁদের আগের বাড়িঘরে ফিরতে রাজি নন। মিয়ানমারের প্রাণিসম্পদ, মৎস্য ও গ্রাম উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের কাছে যৌথ স্বাক্ষরে কয়েক ডজন হিন্দু ২১ জানুয়ারি পাঠানো তাঁদের আবেদনে বলেছেন, আরসার আক্রমণে তাঁদের পুরো গ্রাম ধ্বংস হয়ে গেছে। তাই তাঁদের যেন আবার সেখানে না পাঠানো হয়।

রাখাইনের রাজধানী সিত্তের একটি মন্দিরে আশ্রয় নেয়া ৭০ জন হিন্দু গ্রামে ফেরার ক্ষেত্রে তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।

বাংলাদেশে হিন্দু রোহিঙ্গাদের অবস্থানকালেই রাখাইনে তাঁদের জন্য নতুন রকমের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কম মাত্রায় হলেও সেখানে মিয়ানমার সেনা এবং আরসার মধ্যে ২০১৯ সাল জুড়েই যুদ্ধ চলছে।

প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে রেডিও ফ্রি এশিয়া, কক্সবাজার থেকে তথ্য দিয়েছেন সুনীল বড়ুয়া।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন