Follow us

রোহিঙ্গা সংকট: তিনটি বড় উদ্যোগের পর দৃষ্টি এবার জাতিসংঘের দিকে

কামরান রেজা চৌধুরী ও শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2018-09-21
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
খাবার পানি নিয়ে ঘরে ফিরছেন টেকনাফের মৌচানি ক্যাম্পের বাসিন্দা নূর বেগম। ২৬ আগস্ট ২০১৮।
খাবার পানি নিয়ে ঘরে ফিরছেন টেকনাফের মৌচানি ক্যাম্পের বাসিন্দা নূর বেগম। ২৬ আগস্ট ২০১৮।
শরীফ খিয়াম/বেনারনিউজ

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) তদন্ত শুরুর ঘোষণা, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নিন্দা এবং কানাডার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে গণহত্যার দায়ে প্রস্তাব গ্রহণ—পরপর এই তিনটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ মিয়ানমারকে নতুন করে চাপের মুখে ফেলেছে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ​ই পরিস্থিতির মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘে নতুন প্রস্তাবনা উত্থাপন করতে ও বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সাথে এই সংকট নিয়ে আলোচনার জন্য শুক্রবার নিউইয়র্কের পথে ঢাকা ছেড়েছেন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা বিষয়ক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সহসভাপতি হুমায়ূন কবির বেনারকে বলেন, “দেখুন, কানাডার পার্লামেন্টে শুক্রবার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে মর্মে প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক।”

তিনি বলেন, “এর আগে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে মানবতার চরম লঙ্ঘন হয়েছে উল্লেখ করে গত ১৪ জুন নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্ট। গত ৬ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এক রায়ের মাধ্যমে মিয়ানমার কর্তৃক রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা তদন্তের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।”

হুমায়ূন কবির বলেন, “সুতরাং, মিয়ানমার সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। এই চাপ অব্যাহত রাখতে চাইবে বাংলাদেশ। একইসাথে কূটনৈতিকভাবে মিয়ানমারের সাথে যুক্ত থাকতে হবে বাংলাদেশকে।”

সাবেক এই কূটনীতিকের মতে, আইসিসি যদি মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়ায় চলে যায় সেক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়া হবে দীর্ঘ। এতে বাংলাদেশের সমর্থন লাগবে এবং আমরা এই প্রক্রিয়ায় যাব কি না—সে বিষয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দরকার।”

গত বছর আগস্টের শেষ দিকে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মির (আরসা) আক্রমণের পর উত্তর রাখাইন রাজ্যে নিরাপরাধ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী। ২৫ আগস্ট থেকে দলে দলে রোহিঙ্গারা সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

মানবিক কারণে প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানকে আশ্রয় দেওয়া হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে, এদের মধ্যে প্রায় চার লাখ আগে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে এসেছে।

এখনো রোহিঙ্গারা আসছে

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অব্যাহত নির্যাতনের মুখে দেশটির রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে এখনো রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসছে।

জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনে ৫৩১ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এদের বেশির ভাগই টেকনাফের সাবরাং ও এর আশপাশের এলাকা থেকে এ দেশে প্রবেশ করেছে বলে দাবি শরণার্থী সংস্থাটির।

নতুন রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশের বিষয়টি স্বীকার করে সাবরাং সীমান্তে দায়িত্বরত বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) টেকনাফ-২ ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর শরীফুল ইসলাম জোমাদ্দার বেনারকে বলেন, “রোহিঙ্গারা এখনো বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।”

তবে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রবিউল হাসান বেনারকে বলেন, “নতুন কোনো রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঢুকতে দেওয়া হবে না। সীমান্ত এলাকায় কড়া নজরদারি রাখা হয়েছে।”

ইউএনএইচসিআর এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭১১ পরিবারের মোট ১৩ হাজার ৭৬৪ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে।

এর মধ্যে আগস্টে এসেছে ২৫৬ জন এবং জুলাইয়ে ৪১৩ জন। এর আগে গত ২০ মে থেকে ২২ জুলাইয়ের মধ্যে নতুন তিন হাজার রোহিঙ্গার সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছিল আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) প্রতিবেদন।

মিয়ানমারের বুশিডং (বুথিডং) এলাকার বড়িয়ং গ্রামের আবুল হাই (৩৬) গত সপ্তাহে সপরিবারে টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন।

“বার্মিজ সেনারা সেখানে থেকে যাওয়া রোহিঙ্গাদের অবরুদ্ধ করে নির্যাতন চালাচ্ছে। তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করা হচ্ছে,” বেনারকে জানান হাই।

নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে স্ত্রী-সন্তানসহ এপারে পালিয়ে আসার কথা উল্লেখ করে হাই জানান, পাঁচ দিন আগে নৌকার মাঝিকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে ৩ পরিবারের ১২ জন উনচিপ্রাংয়ের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন।

স্বামীহারা হুমাইরা বেগমও (২৪) তার দুই ও চার বছর বয়সী দুটি কন্যা সন্তান নিয়ে বাংলাদেশে আসেন।

টেকনাফের শালবাগান শিবিরে আশ্রয় নেওয়া এই রোহিঙ্গা নারী জানান, কষ্ট সহ্য করতে না পেরে নিজ গ্রামের আরেকটি পরিবারের সঙ্গে শাহপরীর দ্বীপ দিয়ে পাঁচদিন আগে এদেশে প্রবেশ করেন।

বান্দরবানের তুমব্রু সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকে থাকা রোহিঙ্গাদের নেতা দিল মোহাম্মদ (৫২) বেনারকে জানান, “ওপারে থাকা রোহিঙ্গাদের সাথে তাঁদের নিয়মিত যোগাযোগ হয়। ওপারে এখনো যেসব রোহিঙ্গা আছে, তারা ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। চাপের মধ্যে আছে।”

রোহিঙ্গা নেতারা দাবি করেন, রাখাইনের যেসব রোহিঙ্গা এখনো বাংলাদেশে আসতে পারেনি, তাদের আসলে আটকে রাখা হয়েছে। তারা নিজেদের পাড়ায় অবরুদ্ধ হয়ে আছে; স্থানীয় হাটবাজারেও যেতে পারছে না। যে কারণে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ইউএনএইচসিআর মুখপাত্র জোসেফ সূর্য ত্রিপুরা বেনারকে বলেন, “নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের তদারকির আওতায় আনতে সীমান্ত ও রোহিঙ্গা শিবিরগুলোয় আমাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো তৎপর রয়েছে।”

“নতুন রোহিঙ্গারা অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় বাংলাদেশে পৌঁছাচ্ছে। তাঁদের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি খেয়াল রাখা হচ্ছে,” জানান ওই মুখপাত্র।

মিয়ানমারের আগ্রহ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্ন

জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, চুক্তি করেও রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমার আগ্রহ কম দেখাচ্ছে। যদিও বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ মেয়াদে থাকার কোনো সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাধ্য হবে।

গত বুধবার জাতীয় পার্টির নুরুল ইসলাম মিলনের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। তিনি বলেন, “রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারের ওপর অন্যান্য দেশের পাশাপাশি চীন, রাশিয়া ও ভারতেরও চাপ আছে। কেউ প্রত্যক্ষভাবে, কেউ পরোক্ষভাবে মিয়ানমারের ওপর চাপ দিয়ে যাচ্ছে।”

আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভায় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরার কথা জাতীয় সংসদকে জানান প্রধানমন্ত্রী।

শুক্রবার সকাল দশটায় বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে করে লন্ডন হয়ে নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রীর সহকারি প্রেস সচিব আসিফ কবির বেনারকে বলেন, “শুক্রবার সকাল ১০টায় লন্ডন হয়ে নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছেড়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। তিনি ২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেবেন।

“প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে রোহিঙ্গা সমস্যা ও এর সমাধানে তাঁর বক্তব্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছেন,” জানান আসিফ।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন কক্সবাজার থেকে আবদুর রহমান।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন