আবারো বেড়েছে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ, একদিনে এসেছে এগারো হাজার

প্রাপ্তি রহমান ও তুষার তুহিন
2017.10.10
ঢাকা ও কক্সবাজার
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
নাফ নদী পাড়ি দিয়ে টেকনাফের হোয়াইক্যং দিয়ে ঢুকছে শত শত রোহিঙ্গা। নাফ নদী পাড়ি দিয়ে টেকনাফের হোয়াইক্যং দিয়ে ঢুকছে শত শত রোহিঙ্গা। ১০ অক্টোবর ২০১৭।
আবদুর রহমান/বেনারনিউজ

মিয়ানমার বাংলাদেশে থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও কমার পরিবর্তে হঠাৎ করে আবার বেড়ে গেছে রোহিঙ্গাদের ঢল। শুধু সোমবারেই এগোরো হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর।

মঙ্গলবারেও ব্যাপকভাবে অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের স্থানীয়রা।

এদিকে মঙ্গলবার থেকে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের কলেরা রোগের টিকা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি নতুন রোহিঙ্গাদের মধ্যে ১৬ জন এইডস রোগী পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

“বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ইউএনএইচসিআরকে জানিয়েছে, গত সোমবার ৯ই অক্টোবর স্থল সীমান্তের বেশ কয়েকটি পয়েন্ট পাড়ি দিয়ে ১১ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে,” মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায় ইউএনএইচসিআরের ঢাকা কার্যালয়।

এদিকে গত ২৫ আগস্টের পর থেকে সোমবার পর্যন্ত ৫ লাখ ২১ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন বলে জানিয়েছে ত্রাণ সংস্থাগুলোর জোট আইএসসিজি।

“আরো অনেক লোক পালিয়ে আসার অপেক্ষায় রয়েছে বলে পালিয়ে আসা জনগোষ্ঠীর কাছে জানতে পেরেছি,” বেনারকে বলেন কক্সবাজারের জেলা প্রসাসক মো.আলী হোসেন।

মঙ্গলবারও উখিয়া সীমান্তের আঞ্জুমানপাড়া ও রহমতের বিল হয়ে অংসখ্য রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশে করেছে বলে বেনারকে জানিয়েছেন সেখানকার ওয়ার্ডের মেম্বার কামাল উদ্দিন ও মোজাফফর আহমদ।

কলেরার টিকা পাবে নয় লাখ রোহিঙ্গা

শরণার্থী ৯ লাখ রোহিঙ্গাকে কলেরা রোগের টিকা দেওয়ার কার্যক্রম মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে। প্রথম রাউন্ডে ৬ লাখ ৫০ হাজার জনগোষ্ঠীকে এ টিকা দেয়া হবে।

১০ থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম রাউন্ডে ১৬২টি কেন্দ্রে এ টিকা দেওয়া হবে। মঙ্গলবার দুপুরে উখিয়ার বাগঘোনা এলাকায় টিকা কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

“নতুন পুরাতন সব মিয়ানমার নাগরিক এ টিকা পাবে,” বেনারকে বলেন কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. আবদুস সালাম।

তিনি বলেন “পাঁচ বছর ও তার নিচের শিশুদের দুই ডোজ এবং এর ঊর্ধ্ব বয়সীদের এক ডোজ করে কলেরা প্রতিষেধক টিকা দেয়া হচ্ছে।”

রোহিঙ্গাদের রোগ বালাই, আছে এইডসও

রোহিঙ্গা শিবিরে ১৬ জন এইডস রোগী শনাক্ত করা হয়েছে বলে বেনারকে জানিয়েছেন ডা. আবদুস সালাম।
তিনি বলেন, “রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মাঝে ১৬ জনের এইডস রোগ শনাক্ত করা গেছে। তারা সবাই নতুন এসেছেন।”

ওই সব রোগীদের কোথায় রাখা হয়েছে, তাদের বয়স কত, কয়জন নারী-পুরুষের এইডস শনাক্ত হয়েছে এসব প্রশ্নের জবাব তিনি এড়িয়ে যান।

“মিয়ানমারে বাংলাদেশের চেয়ে এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। পাশাপাশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে অরক্ষিত যৌনাচার রয়েছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা নারীদের অনেকে যৌন হয়রানির শিকার। এই জনগোষ্ঠী চিকিৎসা সেবা থেকেও বঞ্চিত,” বেনারকে বলেন কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. পূচ নূ।

তবে “এতে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই” মন্তব্য করে এইসব রোগীদের আলাদাভাবে রাখা হয়েছে বলে জানান ডা. সালাম।

প্রসঙ্গত, এর আগে চিকিৎসকেরা গত ১৫ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো একজন রোহিঙ্গা এইডস রোগীকে শনাক্ত করেছিলেন।

এদিকে বিভিন্ন শিবির ঘুরে দেখা যায়, শরণার্থীদের বেশিরভাগই অপুষ্টি, চর্মরোগ, যক্ষ্মা, হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সিসহ নানা সংক্রামক রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে।

“নতুন আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ইতিমধ্যে ১৮ হাজার ৪৯২ জন ডায়রিয়া ও অতি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। ৬ হাজার ৬২৬ জন আমাশয়ে ভুগছে। এখন পর্যন্ত কলেরা রোগী পাওয়া না গেলেও প্রায় ২৫ হাজার রোহিঙ্গা ঝুঁকিপূর্ণ ডায়রিয়া-আমাশয়ে ভুগছে,” বেনারকে জানান ডা. সালাম।

রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবায় নিবিড় নজরদারি চলছে বলেও জানান তিনি।

আরও ১৫ লাশ উদ্ধার

গত রোববার বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকালে রোহিঙ্গা বোঝাই একটি নৌকা ডুবির ঘটনায় আরও ১৫ জনের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর আগের দিন ১৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

“এ নিয়ে গত দুই দিনে ২৯ রোহিঙ্গার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে,” বেনারকে জানান টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাইন উদ্দিন খান।

গত রোববার ৬০ জন রোহিঙ্গার একটি দল নৌকায় করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছিলেন, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুই ছিল বেশি। রাত সাড়ে ১০টার দিকে শাহপরীর দ্বীপে নাফ নদীর ঘোলারচর পয়েন্টে নৌকাটি ডুবে যায়।

বিজিবি ওই নৌকা ডুবিতে নিখোঁজদের উদ্ধারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে বেনারকে জানান টেকনাফ ২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম আরিফুল ইসলাম।

দৃষ্টি ঘোরানোর চেষ্টা করছে মিয়ানমার

রোহিঙ্গা সংকট থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি সরাতে ও বিভিন্ন দেশকে বাংলাদেশের বিপক্ষে দাঁড় করানোর জন্য মিয়ানমার সেনাবাহিনী দেশটিতে ‘হিন্দু গণকবর আবিষ্কারের’ গল্প ছড়াচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

মঙ্গলবার ঢাকায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এই অভিযোগ করেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মহাপরিচালক (গোয়েন্দা) মনিরুল ইসলাম আকন্দ।

তিনি বলেন, “মিয়ানমার সেনাবাহিনী বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অন্য দেশগুলোকে দাঁড় করানোর জন্য হিন্দু গণকবর আবিষ্কারের গল্প প্রচার করে।”

“মিয়ানমার দৃষ্টি ঘোরানোর আরও চেষ্টা করেছে। তারা আকাশ সীমা লঙ্ঘন করেছে। তারা চাইছিল, বাংলাদেশ যেন জবাব দেয়। যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে রোহিঙ্গা ইস্যু থেকে অন্যদের নজর সরিয়ে নেওয়া যাবে,” মনিরুল বলেন।

এদিকে ১৬ অক্টোবর ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আসন্ন বৈঠকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ বা নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে ওই গোলটেবিল বৈঠকে জানান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী।

তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন কক্সবাজার থেকে আবদুর রহমান।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।