পরিকল্পিত রোহিঙ্গা উচ্ছেদ চালিয়েছে মিয়ানমার: জাতিসংঘ

কামরান রেজা চৌধুরী
2017.10.11
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
টেকনাফের খারাংখালী পয়েন্টে ঝুড়িতে সন্তানকে নিয়ে ঢুকছে এক রোহিঙ্গা । টেকনাফের খারাংখালী পয়েন্টে ঝুড়িতে সন্তানকে নিয়ে ঢুকছে এক রোহিঙ্গা । ১১ অক্টোবর ২০১৭।
আবদুর রহমান/বেনারনিউজ

রোহিঙ্গারা যাতে আর কখনই তাঁদের নিজ ঘরে ফিরে যেতে না পারে সেই উদ্দেশ্যেই মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ পরিকল্পনামাফিক উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে বলে বুধবার এক প্রতিবেদনে মন্তব্য করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচআরসি)।

এদিকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত গণহত্যা ও বর্বরতার তদন্তের জন্য একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি নাগরিক তদন্ত কমিশন গঠন করেছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

“রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে রোহিঙ্গাদের ওপর যে আক্রমণ হয়েছে তা পরিকল্পিত, সুসমন্বিত ও সুসংঘটিত,” বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের ৬৫ টি সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ইউএনএইচআরসি এর ওই প্রতিবেদনে বলা হয়।

সাক্ষাৎকারে রাথেডং শহরের ১২ বছরের এক কিশোরী জানায় কীভাবে মিয়ানমারের সেনা এবং রাখাইন বৌদ্ধরা তাদের বাড়িঘর ঘিরে ফেলে এবং গুলি চালাতে শুরু করে।

“আক্রমণের আগে তারা মাইকে ঘোষণা দিচ্ছিল- তোমরা এ দেশের নও। তোমরা বাংলাদেশে চলে যাও। তোমরা যদি না যাও তাহলে আমরা তোমাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেবো এবং তোমাদের মেরে ফেলব,” জানায় ওই কিশোরী।

সে জানায়, “তারা আমার সামনেই আমার সাত বছরের বোনকে গুলি করে। আমি তাকে রক্ষার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমাদের কাছে কোনো ওষুধ ছিল না। অনেক রক্ত পড়েছিল। ফলে একদিন পর সে মারা যায়।”

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, “বিশ্বাসযোগ্য তথ্যসমূহ এটাই নির্দেশ করে যে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী ‍উদ্দেশ্যমূলকভাবে রোহিঙ্গাদের সম্পদ ধ্বংস করেছে। তাদের বাড়ি, ফসলের খেত, খাদ্যের মজুত, শস্য, গবাদিপশু এবং গাছপালাও ধ্বংস করেছে। এ রকম করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে সেখানে ফিরে গিয়ে স্বাভাবিক জীবন ও জীবিকা শুরু করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।”

“নিরাপত্তা বাহিনী বাড়িঘরসহ ‍পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, যৌন সন্ত্রাস ও উপাসনালয়ে হামলা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বিস্ফোরণ, গুলি এবং অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়েছে, যেগুলো ছিল পরিকল্পিত,” বলা হয় ওই প্রতিবেদনে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়ের একটি দল কক্সবাজারে সেপ্টেম্বরের ১৪ থেকে ২৪ তারিখ পর্যন্ত নতুন আসা রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। সাক্ষাৎকারে তারা বলেছে, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী এবং সশস্ত্র রাখাইন বৌদ্ধরা একযোগে তাদের ওপর হামলা করেছে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযান শুরুর পর থেকে সহিংসতার মুখে সেখান থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে সাড়ে ৫ লাখ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

রাখাইনে এখনও সহিংসতা চলছে জানিয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, সেখানে আটকে পড়া হাজারো রোহিঙ্গার নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে জাতিসংঘ গভীর উদ্বিগ্ন।

এই মুহূর্ত থেকে আক্রান্ত অঞ্চলে মানবাধিকার কর্মীদের বাধাহীন প্রবেশ নিশ্চিত করার জন্য সংস্থাটি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

এর আগে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এমন অভিযানকে ‘জাতিগত নিধনের আদর্শ উদাহরণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের প্রধান জেইদ রাদ আল-হুসেইন। তিনি অবিলম্বে এ রকম নৃশংস অভিযান বন্ধ করার জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

নাগরিক তদন্ত কমিশন

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত গণহত্যা ও বর্বরতার তদন্তের জন্য একটি নাগরিক কমিশন গঠন করেছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামছুল হুদা কমিশনের চেয়ারম্যান এবং অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির এ ঘোষণা দেন।

তিনি বলেন, “রাখাইনে কোনো জাতিগত গণহত্যা সংগঠিত হয়েছে কিনা, সেখানে কোনো জঙ্গি গোষ্ঠীর অস্তিত্ব আছে কিনা এবং থাকলে তা কতটা শক্তিশালী সে ব্যাপারে তদন্ত করবে নাগরিক কমিশন।”

শাহরিয়ার কবির বলেন, “তদন্তের অংশ হিসেবে কমিশনের পক্ষ থেকে কক্সবাজারে একটি গণশুনানির আয়োজন করা হবে। এক মাসের মধ্যে রিপোর্ট প্রকাশের লক্ষ্য নিয়ে শিগগিরই তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা হবে,” তিনি জানান।

গত মাসে মালয়েশিয়ায় একটি গণ তদন্ত কমিশন তাঁদের শুনানি শেষে মিয়ানমারে গণহত্যা সংঘটিত হচ্ছে বলে মতামত দেয়। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে মিয়ানমার সরকার।

ভারত সীমান্তে ১৯ রোহিঙ্গা গ্রেপ্তার

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ১৯ রোহিঙ্গা নারী, শিশু ও পুরুষকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যরা।

“বুধবার ভোর ৭টার দিকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার পদ্মশাকরা এলাকায় ওই ১৯ জনকে আটক করা হয়। আটকদের মধ্যে ১০ শিশু, ছয় নারী ও তিন পুরুষ রয়েছে,” বেনারকে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

তিনি বলেন, “এসব রোহিঙ্গা ২০১২ ও ২০১৪ সালে মিয়ানমার থেকে ভারতে গিয়ে সেখানেই বসবাস করছিল। এখন বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয়, খাদ্য এবং অন্যান্য মানবিক সহায়তা দিচ্ছে খবর পেয়ে তারা বাংলাদেশে চলে এসেছে।”

এদিকে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণের জন্য সম্প্রতি নাফ নদীতে বেশ কিছু নৌকা ভেঙে ফেলার প্রেক্ষিতে এখন রোহিঙ্গারা প্লাস্টিকের জার ধরে ভেসে আসছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “নৌকা ভেঙে ফেলায় প্লাস্টিকের জার ধরে ভেসে ভেসে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢুকছে। রবিবার ১১ জন রোহিঙ্গা এভাবে নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। কোস্টগার্ডের সদস্যরা টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ থেকে তাদের উদ্ধার করেছে।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।