বেসামরিক ব্যবস্থাপনায় চলবে ভাসানচরের রোহিঙ্গা শিবির

আহম্মদ ফয়েজ
ঢাকা
2021-10-18
Share
বেসামরিক ব্যবস্থাপনায় চলবে ভাসানচরের রোহিঙ্গা শিবির ভাসানচর পৌঁছানোর পর এক রোহিঙ্গা শিশুকে জাহাজ থেকে নামতে সহায়তা করছেন নৌবাহিনী সদস্যরা। ২৯ ডিসেম্বর ২০২০।
[রয়টার্স]

ভাসানচরে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা বিষয়ে বাংলাদেশের সাথে জাতিসংঘের সাক্ষরিত চুক্তি বাস্তবায়ন হলে বেসামরিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আসবেন সেখানে বসবাসরত শরণার্থীরা।

জীবন-জীবিকার জন্য চরে স্বাধীনভাবে চলাফেরারও সুযোগ পাবেন রোহিঙ্গারা।

বাংলাদেশ সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর মধ্যে গত ৯ অক্টোবর সাক্ষর হওয়া সমঝোতা স্মারকটিতে (এমওইউ) এমন তথ্য পাওয়া গেছে। ওই স্মারকের একটি কপি বেনারের হাতে রয়েছে।

চুক্তিতে মোট আঠারোটি ধারা রয়েছে, যেগুলোর অনেকগুলোতেই ‘নিরাপত্তা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে দ্বীপে অবস্থানরতদের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি ব্যাপকভাবে নিশ্চিত হবে বলে মনে করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ।

“এই চুক্তিটি আরো আগেই হওয়া প্রয়োজন ছিল। বিলম্বে হলেও এই চুক্তির ফলে ভাসানচরের মানুষদের মধ্যে আশার সঞ্চার হবে। পাশাপাশি, কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে স্থানান্তর হবার বিষয়ে অনেকে আগ্রহী হবে,” বলেন এই বিশ্লেষক।

চুক্তিতে বলা হয়, “দ্বীপের মানুষদের চলাফেরাসহ অন্য সকল কার্যক্রম পরিচালিত হবে বাংলাদেশ সরকারের বেসামরিক ব্যবস্থাপনায় এবং এই কাজে সরকারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তাদান সংক্রান্ত উদ্যোগগুলো।”

স্থানান্তর স্বেচ্ছায়, বিশেষ প্রয়োজনে ফেরা

চুক্তিতে বলা হয়েছে, “কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রক্রিয়াটি হতে হবে তাঁদের সম্মতি এবং আগ্রহের ভিত্তিতে।”

“প্রয়োজনের ভিত্তিতে ভাসানচর থেকে কেউ যদি কক্সবাজারে যেতে চান অথবা কক্সবাজার থেকে কেউ ভাসানচরে আসতে চান তবে তার পদ্ধতি সরকার ও ইউএন আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারণ করবে,” বলা হয় চুক্তিতে।

তবে এই যাতায়াতের পদ্ধতি কেমন হবে জানতে চাইলে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) শাহ্ রেজওয়ান হায়াত বেনারকে বলেন, “সামগ্রিক বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। এসব বিষয় নিয়ে এখনি মন্তব্য করার সুযোগ নেই।”

তবে অধ্যাপক ইমতিয়াজের মতে, “যারা ভাসানচরে যাচ্ছেন তাঁদের অনেক আত্মীয় কক্সবাজারে আছেন। সুতরাং বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে কখনো কখনো যাতায়াতের প্রয়োজন থাকতে পারে। তাই আমি মনে করি সমন্বয়ের মাধ্যমে বিশেষ ক্ষেত্রে এই সুযোগটি থাকা উচিত, এটিই বলা হয়েছে।”

চুক্তিতে আরো বলা আছে, ভাসানচরে থাকা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের শিক্ষাকার্যক্রম মিয়ানমারের ভাষায় এবং সে দেশের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী পরিচালিত হবে। সেখানকার পাঠ্যক্রম মাথায় রেখে, অর্থাৎ রাখাইনে থাকা অবস্থায় রোহিঙ্গারা যেসব সুবিধা পেতেন সেগুলো নিশ্চিত করা হবে।

“এটা পরিষ্কার যে রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফিরে গিয়ে যাতে সেখানকার শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে সেজন্যই এই বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, এটি খুবই ভালো কাজ হয়েছে,” বলেন অধ্যাপক ইমতিয়াজ।

কবে শুরু হবে চুক্তি বাস্তবায়ন

গত ৯ অক্টোবর স্বাক্ষর হওয়া এই চুক্তিটিতে লেখা আছে, “স্বাক্ষর হওয়ার পর থেকে যে কোনো সময় চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা যাবে।

তবে কবে থেকে চুক্তিটি বাস্তবায়ন শুরু হবে জানতে চাইলে, “আমরা ইতোমধ্যে প্রাথমিক কাজ শুরু করে দিয়েছি,” জানিয়ে আরআরআরসি রেজওয়ান হায়াত বেনারকে বলেন, “এখন দাপ্তরিক কাজগুলো চলছে। খুব দ্রুত মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু হবে।”

“এই প্রক্রিয়ায় কোনোভাবেই সময়ক্ষেপণ করা হবে না,” বলেন তিনি।

চুক্তি বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে প্রায় একই ধরনের উত্তর দেন ইউএনএইচসিআর-এর মুখপাত্র রেজিনা দে লা পোর্টিলা।

“এখন আমাদের পরিকল্পনা পর্যায়ের কাজ চলছে, এটা শেষ হলেই মূল কাজ শুরু হবে,” সোমবার এক মেইলের জবাবে বেনারকে বলেন তিনি।

চরে শরণার্থীদের আশ্রয়, খাদ্য, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, পানি, পয়নিষ্কাশন এবং স্বাস্থ্যবিধি, সুরক্ষা, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং জীবিকার সুযোগসহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদা তাঁদের প্রয়োজনের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হবে জানিয়ে পোর্টিলা বলেন, “সরকার এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ এগুচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন এনজিও ইতিমধ্যে যুক্ত হয়েছে।”

বর্তমানে ভাসানচরের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। চুক্তি অনুযায়ী কবে দ্বীপটি বেসামরিক প্রশাসনের হাতে আসবে সে বিষয়েও এখনই মন্তব্য করার সুযোগ নেই বলে জানান আরআরআরসি।

কমেছে পালানোর প্রবণতা

ভাসানচর দ্বীপ, যেটিকে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে মাঝ সমুদ্রে কারাদ্বীপ হিসেবে উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, সেখান থেকে প্রায় নিয়মিত রোহিঙ্গাদের পালানোর খবর আসলেও এই চুক্তিটি স্বাক্ষরের পর থেকে সেই প্রবণতা কমেছে এবং দ্বীপের মানুষদের মধ্যে আশা সঞ্চার হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেখানে বসবাসকারী রোহিঙ্গা নেতারা।

“এখানে জাতিসংঘ যুক্ত হওয়ায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে আনন্দ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গারা বাইরে আসা-যাওয়ার সুযোগ পেলে ভাসানচর থেকে লোকজন পালাবে না,” বেনারকে বলেন ভাসানচরের এক রোহিঙ্গা মাঝি (সমন্বয়ক) মো. ইয়াছিন।

“গত কয়েক দিনে এখান থেকে লোকজন পালানোর খবর পাইনি। কিন্তু এর আগে প্রতিদিনই লোকজন ভাসানচর থেকে পালানোর সময় আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ত,” যোগ করেন তিনি।

ভাসানচরের আশ্রয়ণ প্রকল্পের অপর এক রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার মোহাম্মদ সোহেল জানান, “আমাদের এখানে গুটিকয়েকজনকে পুকুরে মাছ ধরার সুযোগ দিলেও চলাফেরার বিষয়ে কঠোর কড়াকড়ি রয়েছে। ইতিমধ্যে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এখানে এসেছে, তাঁরা আমাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা বলছেন।”

“এই প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, এখন থেকে আমরা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার সুযোগ পাব, যা এতদিন পাওয়া যায়নি” বলেন এই রোহিঙ্গা নেতা।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিরোধিতার পরও কিছু রোহিঙ্গা উন্নত জীবনের আশায় ভাসানচরে যেতে রাজি হয়। গত বছর ডিসেম্বর মাস থেকে কয়েক দফায় ১৯ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে স্বেচ্ছায় ভাসানচরে স্থানান্তর করে সরকার।

কক্সবাজার থেকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন আবদুর রহমান।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন