Follow us

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হতে পারে নভেম্বরে

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2018-10-30
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
মঙ্গলবার ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন মেঘনায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার যৌথ কর্ম গ্রুপের তৃতীয় সভা। ৩০ অক্টোবর ২০১৮।
মঙ্গলবার ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন মেঘনায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার যৌথ কর্ম গ্রুপের তৃতীয় সভা। ৩০ অক্টোবর ২০১৮।
বেনারনিউজ

নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হবে বলে যৌথভাবে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা।

মঙ্গলবার ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন মেঘনায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার যৌথ কর্ম গ্রুপের তৃতীয় সভায় পর্যালোচনার পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর সম্ভাব্য সময় নিয়ে এই ঘোষণা দেওয়া হয়।

বৈঠকের পরে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক বলেন, “নভেম্বরের মাঝামাঝি আমরা প্রথম ব্যাচের রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করতে পারব।”

এসময় মিয়ানমার স্থায়ী সচিব উ মিন্ট থু তাঁর বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেন।

প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের কাছে ৪৮৫ পরিবারের ২,২৬০ জন রোহিঙ্গার একটি তালিকা হস্তান্তর করেছে বাংলাদেশ। যাচাই-বাছাই করে এই সকল রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সম্মতি দিয়েছে মিয়ানমার।

রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর নির্যাতন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা সাত লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে ‘স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সাথে’ ফেরাতে গত বছর ২৩ নভেম্বর প্রত্যাবাসন চুক্তি স্বাক্ষর করে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ।

চুক্তি অনুসারে ২২ জানুয়ারির মধ্যে প্রত্যাবাসন শুরুর কথা থাকলেও গত প্রায় এক বছরে একজন রোহিঙ্গাও রাখাইনে ফিরে যায়নি।

সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে শহীদুল হক বলেন, “খুব গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। এখানে যে সকল রোহিঙ্গা আছে তাঁদের ফিরে যাওয়ার বিষয়টি বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছে।”

তিনি বলেন, “প্রত্যাবাসন সব সময় একটা জটিল প্রক্রিয়া। কিন্তু সবার যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে তাহলে একটা ফলপ্রসূ সমাপ্তি সম্ভব। আজকের আলোচনার মধ্য দিয়ে আমাদের সেটাই মনে হয়েছে যে, দুপক্ষেরই রাজনৈতিক সদিচ্ছা রয়েছে।”

প্রত্যাবাসনের বিষয়ে তাঁর দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নমনীয়তা ও আগ্রহ রয়েছে জানিয়ে মিন্ট থু সাংবাদিকদের বলেন, “আজ আমরা খোলামেলা ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা করেছি। আমরা প্রত্যাবাসন শুরুর ব্যাপারে আলোচনা করেছি।”

প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ জোর করে কোনো রোহিঙ্গাকে সেদেশে ফেরাতে পারবে না। প্রত্যাবাসন হবে ‘স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সাথে’।

রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলবেন কর্মকর্তারা

রাখাইনে ফিরে যেতে উৎসাহ দিতে আগামীকাল বুধবার কর্ম গ্রুপের বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের সদস্যরা উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রসচিব শহিদুল হক। সেখানে তাঁরা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসীদের সাথে কথা বলবেন বলে জানান তিনি।

যৌথ কর্ম গ্রুপের মঙ্গলবারের সভায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাঁচ হাজারের অধিক পরিবারের মোট ২২,৪০০ রোহিঙ্গার তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে বেনারকে জানিয়েছেন বৈঠকে উপস্থিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা।

গত বছর আগস্টে শুরু হওয়া সামরিক অভিযানের ১৪ মাস পার হওয়ার পরও রাখাইনে রোহিঙ্গা নির্যাতন ও নিষ্পেষণ বন্ধ হয়নি। সেখানে তাঁদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, সম্পদ লুট করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থার তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফিরে গেলে সেখানে রোহিঙ্গাদের বন্দী করে রাখা হবে এমন আশঙ্কা করছেন রোহিঙ্গাও।

কক্সবাজার থেকে রোহিঙ্গা নেতা মো. আফজাল বেনারকে বলেন, “মিয়ানমার আন্তর্জাতিক চাপে আছে। তারা দায়সারাভাবে কিছু রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেবে। আমাদের নিজ নিজ গ্রামে যেতে দেওয়া হবে না। তারা তারকাঁটা দিয়ে ঘেরা খুপরি ঘরে আটকে রাখবে।”

তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ভুল বোঝাতে মিয়ানমার আমাদের ফিরে নিতে চায়। কিন্তু আমরা এভাবে যেতে চাই না। আমাদের চলাচলের স্বাধীনতা দিতে হবে, নাগরিকত্ব দিতে হবে। আমাদের ওপর চালানো জুলুমের বিচার করতে হবে। এরপর আমরা ফিরে যাব।”

রাখাইনে ফিরে গেলে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও চলাচলের ব্যাপারে মিয়ানমার সরকার কী ধরনের ব্যবস্থা নেবে; বেনারের এমন প্রশ্নের জবাবে মিয়ানমারের স্থায়ী সচিব থু বলেন, “প্রত্যাবাসীদের ফিরে যাওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে আমরা স্থানীয় অনেক আদেশ-নির্দেশ জারি করেছি।”

তিনি বলেন, “আমরা রাখাইনে জনগণকে সম্পৃক্ত করে পুলিশি কার্যক্রমকে উৎসাহিত করছি। যেমন সেখানে পুলিশ ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করবে।”

থু বলেন, “প্রত্যাবাসীরা যাতে বিচার পায় ও তাদের জীবন-জীবিকা বা অন্য কোনো বিষয়ে সমস্যার সৃষ্টি হলে তারা যেন নালিশ করতে পারে সেব্যাপারে আমরা সবার মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করছি।”

তিনি বলেন, “উত্তর রাখাইন রাজ্যের মানুষেরা যাতে বৈষম্যের শিকার না হয় সে ব্যাপারে সরকারি কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য আমরা বেশ কয়েকটি কর্মশালার আয়োজন করছি।”

“সুতরাং, ফিরে যাওয়ার পর তারা যাতে রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশে বসবাস করতে পারে তা নিশ্চিত করতে আমরা বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি,” যোগ করেন তিনি।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পররাষ্ট্রসচিবদের নেতৃত্বে সমান সংখ্যক সদস্য নিয়ে ৩০ সদস্যদের যৌথ কর্ম গ্রুপ গঠিত।

প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একটি তালিকা মিয়ানমারকে হস্তান্তর করবে। মিয়ানমার সরকার তাঁদের নাম ও গ্রামের নামসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করার পরই কেবল প্রত্যাবাসন শুরু হতে পারে। নাম যাচাইয়ের পর সেই সকল প্রত্যাবাসীরা যেতে রাজি হলেই বাংলাদেশ তাঁদের ফেরত পাঠাতে পারবে।

এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে নাম-ঠিকানা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মিয়ানমার সরকারের কাছে ৮,০৩২ জন রোহিঙ্গার তালিকা হস্তান্তর করে বাংলাদেশ।

শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও ত্রাণ কমিশনার আবুল কালাম বেনারকে বলেন, “ওই তালিকা থেকে মিয়ানমার ১৯ দফা যাচাই-বাছাই করে এ পর্যন্ত ৪,৬০০ জন রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার জন্য রাজি হয়েছে।”

তিনি বলেন, “রোহিঙ্গারা ফিরে গেলে সেখানে তাঁদের নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা থাকবে কি না সে ব্যাপারে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছে।”

“ফেরার পর তারা যদি নিজেদের বাড়ি ঘরে ফিরতে না পারে, জীবিকা নির্বাহ করার সুযোগ না পায় তাহলে তারা ফিরে যাবে না। আবারও পালিয়ে আসবে,” বলেন তিনি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন