Follow us

রোহিঙ্গা সংকট: দীর্ঘ মেয়াদে পাশে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র

কামরান রেজা চৌধুরী ও সুনীল বড়ুয়া
ঢাকা ও কক্সবাজার
2019-11-07
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কক্সবাজারে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ে বৈঠক শেষে বের হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যালিস জি. ওয়েলস (বামে)। ৭ নভেম্বর ২০১৯।
কক্সবাজারে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ে বৈঠক শেষে বের হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যালিস জি. ওয়েলস (বামে)। ৭ নভেম্বর ২০১৯।
[সুনীল বড়ুয়া/বেনারনিউজ]

রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে তিন দিনের বাংলাদেশ সফর শেষে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যালিস জি. ওয়েলস বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি দীর্ঘ মেয়াদের চ্যালেঞ্জ। আর এই সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের সাথে কাজ করবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় জনগণের জন্য বৃহস্পতিবার উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নেওয়ার ঘোষণা দেন ওয়েলস। এর কারণ হিসেবে তিনি কক্সবাজারের স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে তাঁরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এই ঘোষণায় উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় জনগণ সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মার্কিন এই সহায়তা কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে যে অসন্তোষ রয়েছে, তা কিছুটা হলেও কমাতে সহয়তা করবে।

অ্যালিসের শরণার্থী ক্যাম্প সফর

বুধবার ঢাকা এসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার সকালে কক্সবাজার পৌঁছান অ্যালিস ওয়েলস।

তিনি টেকনাফের শামলাপুর শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শন করেন এবং সেখান থেকে ফিরে কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন অ্যালিস ওয়েলস।

তিনি বলেন, “রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি দীর্ঘ মেয়াদের চ্যালেঞ্জ। আমরা এই চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশকে সমর্থন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

অ্যালিস ওয়েলস বলেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে বড় মানবিক সাহায্য প্রদানকারী দেশ। যেহেতু আমরা এটিকে দীর্ঘ মেয়াদী চ্যালেঞ্জ মনে করি সেহেতু আমি এই বার্তা দিতে চাই, আমরাও এখানে দীর্ঘ মেয়াদে অবস্থান করব।”

তিনি বলেন, স্থানীয় জনগণ কীভাবে দশ লাখের বেশি রোহিঙ্গার সাথে অবস্থান করছে তা তিনি জানতে আগ্রহী।

অ্যালিস বলেন, “আমরা ইউএসআইডি’র মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য অতিরিক্ত সহায়তা দেয়ার পরিকল্পনা করছি। এই সাহায্য শিক্ষা সহায়তা, চাকুরির সুযোগ সৃষ্টি অথবা কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচি হতে পারে।”

তিনি বলেন, “তাদের উদারতা ও আতিথেয়তার জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না।”

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন কার্যক্রম শুরু করে মিয়ানমার সরকার। প্রাণভয়ে সেখান থেকে দলে দলে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে।

বর্তমানে নতুন পুরাতন মিলিয়ে, কক্সবাজারে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। তাঁদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমার চুক্তি স্বাক্ষর করলেও একজন রোহিঙ্গাকেও তারা ফেরত নেয়নি।

রোহিঙ্গাদের সহায়তায় অর্থ প্রদানকারী দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত সেপ্টেম্বরে রোহিঙ্গাদের জন্য ১২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তার ঘোষণা দেয় দেশটি। এর আগে ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা শুরু হবার পর থেকে রোহিঙ্গাদের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র ৬৬৯ মিলিয়ন ডলারের মানবিক সহায়তা দিয়েছে।

অ্যালিস জি. ওয়েলস বৃহস্পতিবার ঢাকা ছেড়েছেন। ফ্লাইট জটিলতার কারণে তিনি বৃহস্পতিবার বিকেলে পূর্বনির্ধারিত সংবাদ সম্মেলন বাতিল করেন এবং এ জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে ঢাকাস্থ মার্কির দূতাবাস।

রোহিঙ্গা নিয়ে স্থানীয়দের অসন্তোষ

সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের উখিয়া উপজেলার সভাপতি নূর মোহাম্মদ সিকদার বেনারকে জানান, “শুরুর দিকে মানবতা দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের জন্য স্থানীয়রা অনেক কিছুই করেছে। নিজে না খেয়ে রোহিঙ্গাদের খাবার দিয়েছে।”

তিনি বলেন, “কিন্তু রোহিঙ্গারা অবস্থানের দুই বছরের মধ্যে পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ বিপরীত। এখন তারা স্থানীয়দের জন্য হুমকি বলে মনে করা হচ্ছে।”

নূর মোহাম্মদ অভিযোগ করেন, “সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় রোহিঙ্গারা ইয়াবা পাচারসহ নানা অপরাধে জড়াচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আমরা উদ্বিগ্ন।”

উখিয়া প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “রোহিঙ্গাদের কারণে বর্তমানে স্থানীয়দের উদ্বাস্তু হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আইনশৃংখলা পরিস্থিতিতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে স্থানীয়রা।”

তিনি বলেন, “স্থানীয়দের চেয়ে রোহিঙ্গারা অনেক ভালো আছে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কী অবস্থা হবে, আমরা আদৌ এখানে থাকতে পারব কিনা, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছি। আমরা স্থানীয়দের এই উদ্বেগের অবসান চাই।”

তিনি বলেন, “স্থানীয়দের সহায়তার জন্য মার্কিন সরকারের এই ঘোষণায় আমরা আনন্দিত।”

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ এর চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রদূত মুনশি ফায়েজ আহমাদ বলেন, এলিস ওয়েলসের বক্তব্য বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক।

তিনি বেনারকে বলেন, “দেখে মনে হচ্ছে রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘ মেয়াদী হবে। আর রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সাথে দীর্ঘ মেয়াদে থাকবে, এটি আমাদের জন্য সুখবর।”

মুনশি ফায়েজ বলেন, “সাধারণত দেখা যায় কোনও আন্তর্জাতিক সমস্যা লম্বা সময় ধরে চললে সেই সমস্যার প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর কমে আসে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আমাদের সাথে দীর্ঘ মেয়াদে থাকবে এটি সুখবর।”

তিনি বলেন, “আরও ভালো খবর হলো, সকল দেশ ও দাতাদের নজর রোহিঙ্গাদের প্রতি। আর সেকারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোহিঙ্গাদের নিয়ে তীব্র অসন্তোষ আছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীদের জন্য প্রকল্প নেয়া হলে এই অসন্তোষ কমে আসবে।”

মুনশি ফায়েজ বলেন, অন্য দাতাদেরও উচিত রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়ন প্রকল্প নেয়া। কারণ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে এই মানুষগুলো অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অ্যালিস ওয়েলসের সফরের আগে কক্সবাজার পৌঁছান উপ-প্রশাসক বনি গ্লিকের নেতৃত্বে ইউএসএআইডি’র একটি প্রতিনিধিদল।

যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের এই প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় জনগণের পাশাপাশি সরকারি ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সাথেও কথা বলেন।

বনি গ্লিক কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মানোন্নয়নে ইউএসএআইডি পরিচালিত বেশ কয়েকটি প্রকল্প পরিদর্শন করেন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন