Follow us

রোহিঙ্গা গণহত্যা: মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে গাম্বিয়ার মামলা

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2019-11-11
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কক্সবাজারের উখিয়ার জামতলী শরণার্থী শিবিরের একটি ত্রাণকেন্দ্র থেকে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ফিরছেন রোহিঙ্গারা। ৬ নভেম্বর ২০১৯।
কক্সবাজারের উখিয়ার জামতলী শরণার্থী শিবিরের একটি ত্রাণকেন্দ্র থেকে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ফিরছেন রোহিঙ্গারা। ৬ নভেম্বর ২০১৯।
[সুনীল বড়ুয়া/বেনারনিউজ]

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নৃশংসতার দায়ে এবার জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতে বিচারের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে মিয়ানমার।

রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত গণহত্যা চালানোর অভিযোগ তুলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলা করেছে গাম্বিয়া। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে এই আদালত অবস্থিত।

ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সদস্য দেশগুলোর মতামতের ভিত্তিতেই এই মামলা করা হয়েছে বলে বেনারকে জানিয়েছেন বাংলাদেশে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।

তিনি বেনারকে বলেন, “কিছুদিন আগে সদস্য রাষ্ট্রের মতামতের ভিত্তিতে দায়বদ্ধতা ইস্যুতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ওআইসির একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। ওই কমিটির চেয়ার গাম্বিয়া।”

“এই কমিটির বৈঠকের পর ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক হয়েছে। সেখানে মামলা করার সিদ্ধান্ত হয়। শুধু প্রস্তুতি এবং আইনজীবী নিয়োগ করতে কিছুদিন সময় লাগল।”

গাম্বিয়ার আইনমন্ত্রী আবু বকর তাম্বাদোউ সোমবার দ্য হেগে এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “আইসিজের কাছে এই অভিযোগের উদ্দেশ্য হলো, নিজের জনগণের (রোহিঙ্গা) সঙ্গে মিয়ানমার যে আচরণ করেছে, সেটির জন্য তাদেরই দায়ী করা। আমাদের চোখের সামনে গণহত্যা ঘটে যাওয়ার পরেও আমরা কিছুই করছি না, এটা আমাদের প্রজন্মের জন্য লজ্জাজনক।”

গাম্বিয়ার আবেদনে বলা হয়, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।

মিয়ানমারের নৃসংশতার শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন নিয়ে দেনদরবার করে চলেছে। এমন অবস্থায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতে এই মামলা দায়েরকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আশা করি, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত যথাযথ সময়ের মধ্যে তথ্য প্রমাণসহ এ বিষয়ে শুনবেন। সব প্রক্রিয়া শেষে তারা এমন একটি রায় দেবেন, যাতে রোহিঙ্গা জনগণের দুর্ভোগ কিছুটা হলেও লাঘব হয়।”

তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, মামলার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান হবে না। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে হলে মিয়ানমারে উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করতে হবে।

জাহাঙ্গীরগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান বেনারকে বলেন, “গাম্বিয়ার উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা সংক্রান্ত সকল সমস্যার সমাধান হবে না।”

“মিয়ানমারকে অর্থনৈতিকভাবে চাপ দিতে হবে অথবা দেশটির ওপর অবরোধ সৃষ্টি করতে হবে। যতদিন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দেশটির ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ না করবে ততদিন পর্যন্ত মিয়ানমারকে কোনো কাজে বাধ্য করানো যাবে না,” মনে করেন তিনি।

এই মামলায় গাম্বিয়াকে আইনি সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ফোলে হোয়াগ’। আগামী মাসেই এই মামলার প্রথম শুনানি অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের ওপর বর্বর ও নৃশংস অভিযান শুরু করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। প্রাণে বাঁচতে কয়েক মাসে অন্তত সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। নতুন–পুরানো মিলিয়ে বর্তমানে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার আশ্রয়দাতা বাংলাদেশ।

২০১৮ সালের আগস্টের এক প্রতিবেদনে মিয়ানমারের ওই নৃশংসতাকে জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান মিশন ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করে।

মামলায় যা আছে

আবু বকর তাম্বাদোউ জানান, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা প্রতিরোধ ও এর শাস্তি বিধানে ১৯৪৮ সালে স্বাক্ষরিত কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগ করা হয়েছে। মিয়ানমার আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৫৬ সালে ওই ‘জেনোসাইড কনভেনশনে’ স্বাক্ষর করে। গাম্বিয়াও এই কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ।

এই কনভেনশনের আওতায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলো শুধু গণহত্যা থেকে বিরত থাকবে না, বরং এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করতে এবং শাস্তি বিধানে সহায়তা করবে।

মিয়ানমার ও গাম্বিয়া উভয় দেশই আইসিজেরও সদস্য রাষ্ট্র।

মামলার আবেদনে উল্লেখ করা হয়, আইসিজের নীতিমালা অনুযায়ী কোনো সদস্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে অন্য সদস্য রাষ্ট্র এর প্রতিকার চেয়ে পদক্ষেপ নিতে পারে। মিয়ানমারের ঘটনায় ‘গণহত্যার অপরাধ প্রতিরোধ ও সাজা বিষয়ে ১৯৪৮ সালের সনদ’ লঙ্ঘন করা হয়েছে।

২০১৬ সালের অক্টোবরে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী ‘নির্মূল অভিযান’ শুরু করে বলে গাম্বিয়া আইসিজেতে অভিযোগ করেছে।

এতে বলা হয়, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার ‍উদ্দেশ্যে গণহত্যামূলক তৎপরতা সংঘটন করা হয়। অভিযানে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণসহ নানা সহিংসতা চালানো হয়। একইসাথে পদ্ধতিগত উপায়ে তাদের গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। কখনো কখনো মানুষজনকে বাড়িঘরে আটকে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

জোর করে বাস্তুচ্যুতির পরও মিয়ানমারে থেকে যাওয়া ছয় লাখের মতো রোহিঙ্গা আবারও গণহত্যার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়। রোহিঙ্গাদের ওপর সেনা অভিযানের নৃশংসতার সুনির্দিষ্ট কিছু উদাহরণ তুলে ধরে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছে গাম্বিয়া।

মিয়ানমারকে বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) পরিচালক পরম-প্রিত সিং এক বিবৃতিতে বলেছেন, “গাম্বিয়ার এই আইনি পদক্ষেপের ফলে বিশ্বের সর্বোচ্চ আদালতে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হলো।”

“এখন আদালত রোহিঙ্গাদের নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচাতে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নিতে পারে,” বলেন তিনি।

এ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ ১০টি সংগঠন গাম্বিয়াকে সহায়তা করেছে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন