রোহিঙ্গাদের অন্তত ৬২ জনের এইচআইভি/এইডস শনাক্ত

রোহিত ওয়াধওয়ানি ও তুষার তুহিন
2017.11.13
কক্সবাজার
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
কক্সবাজার সদর হাসপাতালে রোহিঙ্গা রোগীরা। কক্সবাজার সদর হাসপাতালে রোহিঙ্গা রোগীরা। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭।
AFP

বাংলাদেশের ডাক্তাররা তাঁর রক্তে এইচআইভি-এইডস এর জীবাণু শনাক্ত করার আগ পর্যন্ত মাস খানেক আগে স্বামীর সাথে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া গর্ভবতী রোহিঙ্গা নারী সেনোয়ারা খাতুনের এই ঘাতক রোগটি সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না।

সেনোয়ারার (২৪) রক্তে যখন এই রোগটি শনাক্ত হয় তখন তাঁর গর্ভের ৩১ সপ্তাহ চলছে। সময়টি গর্ভপাতের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বলে সেনোয়ারা ও তাঁর স্বামীকে জানান ডাক্তাররা। এর দুই সপ্তাহ পর সেনোয়ারার প্রথম সন্তান রেনুর জন্ম হয়। সেনোয়ারা ও তাঁর স্বামীর আশঙ্কা, সদ্যজাত কন্যা শিশুটিও হয়ত এইচআইভি বাহক।

“এখানে আসার পর তাঁর গর্ভ সংক্রান্ত সব কিছু ঠিকঠাক আছে কি না তা জানতে আমরা সাধারণ পরীক্ষা করতে গিয়েছিলাম। দুইদিন পর ডাক্তার জানালেন যে তাঁর এই রোগটি আছে, যেটা শিশুর মধ্যেও সংক্রমিত হতে পারে,” বেনারকে বলেন সেনোয়ারার স্বামী মোহাম্মদ শাহজাহান (৩৩)।

নতুন আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে এইচআইভি ভাইরাস বহনকারী ৬২ জনের দুইজন সেনোয়ারা ও তাঁর কন্যাশিশু। এই রোগীদের মধ্যে ১১টি শিশু ছাড়াও বেশিরভাগই নারী বলে বেনারকে জানিয়েছেন কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শাহীন চৌধুরী। কক্সবাজার সদর হাসপাতালেই এইসব রোগীদের চিকিৎসা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এই ৬২ জনের মধ্যে এক নারী মারা গেছেন। ডাক্তার ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ধারণা, শরণার্থীদের মধ্যে এইডস রোগের জন্য দায়ী এইচআইভি ভাইরাস বহনকারীর সংখ্যা আরো কয়েক হাজার হতে পারে। তবে এখনও সবাইকে পরীক্ষার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।

“এই সমস্যাটার সঠিক মাত্রা ভাবতে গেলে তা বেশ ভয়ানকই,” বেনারকে বলেন ডা. শাহীন, যিনি শরণার্থী এইচআইভি রোগীদের চিকিৎসা করছেন।

যে দেশ থেকে ২৫ আগস্টের পর এখন পর্যন্ত ৬ লাখ ১৫ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন, সেই মিয়ানমার থাইল্যান্ডের পর এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এইচআইভি উপদ্রুত দেশ। ইউএনএইডস এর হিসাব অনুযায়ী ২০১৬ সালে দেশটির মোট ৫ কোটি দশ লাখ মানুষের মধ্যে এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার।

যে ৩৫টি দেশে পৃথিবীর ৯০ ভাগ এইডস রোগি বসবাস করেন, মিয়ানমার সেসবের মধ্যে একটি।

“আমাদের হিসাবে ২৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের মধ্যে অন্তত ৫ হাজার এইচআইভি পজিটিভ,” বলেন ডা. শাহীন।

গত আগস্টের শেষ দিকে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েকটি চৌকিতে রোহিঙ্গাদের বিদ্রোহী গোষ্ঠী একযোগে আক্রমণ চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় দেশটির সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে ব্যাপক নিপীড়নমূলক অভিযান শুরু করে। এর ফলে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে।

নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে বাংলাদেশে এখন রোহিঙ্গাদের মোট সংখ্যা দশ লাখের কাছাকাছি। যারা কক্সবাজার জেলার ১৫টি শরণার্থী শিবিরে বসবাস করেন।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালে রোহিঙ্গাদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ ওয়ার্ড।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালে রোহিঙ্গাদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ ওয়ার্ড।
তুষার তুহিন/বেনারনিউজ

আছে কুসংস্কার

কক্সবাজারের ১৫টি শরণার্থী শিবিরে এইচআইভি রোগী চিহ্নিত করার জন্য দু হাজারের বেশি ডাক্তার ও স্বাস্থ্য কর্মীরা কাজ করছেন বলে বেনারকে জানান কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম।

“হয় অংসখ্য রোহিঙ্গা জানেই না যে তাঁরা এইচআইভি পজিটিভ, অথবা এই রোগটার সাথে সম্পর্কিত কুসংস্কার ও লোকলজ্জার ভয়ে তাঁরা বিষয়টা চেপে যায়,” বেনারকে বলেন ডা. সালাম।

“তবে চিহ্নিত রোগীদের মধ্যে সেনোয়ারাসহ মাত্র ৫ জন জানত না যে তাঁরা এইচআইভি ভাইরাস বাহক,” বেনারকে বলেন ডা. শাহীন।

তিনি বলেন, “এর বাইরে ৫৬টি ঘটনাই আগে মিয়ানমারে শনাক্ত হয়। এবং যখন এই বাহকরা বাংলাদেশে প্রবেশ করে তখন তারা জানত যে তারা এইচআইভি পজিটিভ।”

“মনে হয় একবার ব্যবহার উপযোগী সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তির শরীরে ব্যবহার এই সংক্রমণের কারণ,” বলেন তিনি।

“হতে পারে যে হাসপাতালে মিয়ানমারের লোকজন রোহিঙ্গাদের ক্ষতি করার জন্য এটা ইচ্ছাকৃতভাবে করেছে, আমি ঠিক জানি না। কারণ বিষয়টা যাচাই করার কোনো উপায় নেই,” বলেন ডা. শাহীন।

প্রসঙ্গত, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের দেশটির নাগারিক হিসেবে স্বীকার করে না। বরং অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে কয়েক দশক ধরে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যা, ধর্ষণ, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়াসহ সমন্বিত নির্যাতনকে জাতিগত উচ্ছেদের আদর্শ উদাহরণ বলে চিহ্নিত করেছে জাতিসংঘ।

‘এইচআইভ কী আমরা জানতাম না’

শাহজাহান জানান, সেনোয়ারা গত তিন বছর ধরেই ঘন ঘন অসুস্থ হতেন। যদিও প্রতিবেশীরা তাঁকে এইচআইভি পজিটিভ জানলে এড়িয়ে চলবে এই ভয়ে সেনোয়ারা বেনারের সাথে কথা বলতে রাজি হননি।

“যতবারই সেখানে (রাখাইনে) তাঁকে হাসপাতাল নিয়ে গেছি, তারা তাকে কয়েকটা ইনজেকশন দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু কোনোদিনও তার অবস্থার উন্নতি হয়নি,” বলেন শাহজাহান।

তিনি জানান, “বাংলাদেশে আসার আগে এইচআইভ কী জিনিস তাও আমরা জানতাম না।”

ডা. শাহীনের মতে, এইচআইভ পজিটিভ রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৫জন ‘স্টেজ থ্রি’তে রয়েছেন। এর অর্থ হলো এঁদের আর বেশিদিন বাঁচার সম্ভাবনা নেই।

তিনি বলেন, “স্টেজ থ্রিতে থাকা রোগীসহ সকল এইচআইভি পজিটিভ রোগী হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে শিবিরে ফিরে যান।”

“হাসপাতালের কর্মীরা রোগী ও তাঁদের অভিভাবকদেরকে ইতিবাচকভাবে বিষয়টিকে দেখার জন্য কাউন্সেলিংও করে থাকেন,” যোগ করেন তিনি।

কাউন্সেলিং এর জন্য শাহজাহান শরণার্থী শিবির থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে প্রতি সপ্তায় যাতায়াত করেন।

তিনি বলেন, “এখানকার কাউন্সেলররা আমাকে এইচআইভি সম্পর্কে বিস্তারিত বলেন। একই সাথে সংক্রমণ থাকার পরেও আমার স্ত্রী আর শিশুর স্বাভাবিক জীবন যাপনে কীভাবে সাহায্য করতে পারি সে সম্পর্কে পরামর্শ দেন।”

“আমার একটাই লক্ষ্য, যতদূর সম্ভব আমার স্ত্রী আর বাচ্চাটাকে বাঁচিয়ে রাখা,” বেনারকে বলেন শাহজাহান।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।